পরিবেশবান্ধব মেশিনারিজ ও শিল্প স্থাপনে এ সুবিধা দেয়া হবে

পাটশিল্পের উদ্যোক্তারা এখন পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা পাবেন, যা আগে টেক্সটাইল ও চামড়া শিল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। পাটশিল্পের জন্য পরিবেশবান্ধব মেশিনারিজ ও শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে এ ঋণ সুবিধা দেয়া হবে। এমনকি কোনো পাট কারখানায় যদি নতুন যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হয়, আর তা যদি পরিবেশবান্ধব হয়, তাহলেও মিলবে এ ঋণ সুবিধা। বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএমএ) সদস্য মিলগুলোর জন্য সম্প্রতি এ সংক্রান্ত এক সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে নতুন ও আধুনিক পাটশিল্প স্থাপনে উৎসাহিত হবেন উদ্যোক্তারা, যা পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে সম্প্রতি পাটের উন্নয়নের জন্য সরকারের যেসব উদ্যোগ রয়েছে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হলে সোনালি আঁশের সোনালি দিন ফিরবে শিগগিরই। সম্প্রতি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে পাটবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সভায় এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। পাটশিল্পকে গ্রিন ফান্ডিংয়ের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি বলেন, পাটশিল্পের জন্য গ্রিন ফান্ডিংয়ের স্থানীয় মুদ্রার তহবিল থেকে ঋণ দেয়ার বিষয়ে এ বছরের ১৬ মার্চ এসএফডি সার্কুলার নম্বর ০৩-এর মাধ্যমে সব তফসিলি ব্যাংককে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ সময় বিজেএমএ’র পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রিন ফান্ডিংয়ে পাটশিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করে যে সার্কুলার জারি করেছে, তা শুধু স্থানীয় মুদ্রার তহবিল। বৈদেশিক মুদ্রার একটি তহবিল আছে, যেখান থেকে স্বল্প সুদে অন্য সেক্টরের শিল্পগুলো ঋণ নিতে পারে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম বলেন, গ্রিন ফান্ডিংয়ের স্থানীয় মুদ্রার তহবিল ব্যবহারের মতো বৈদেশিক মুদ্রার তহবিলও যেন পাটশিল্পগুলো ব্যবহারের সুযোগ পায়, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ জানানো হবে। এরপর অ্যাসোসিয়েশনের পাটবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সভায় অন্যান্য শিল্প খাতের মতো পাটশিল্পকেও যেন বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল থেকে স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা দেয়া হয়, সেই দাবি জানানো হয়। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক ৯ অক্টোবর এক সার্কুলারের মাধ্যমে পাটশিল্পকে টেক্সটাইল ও চামড়া শিল্পের মতো বাংলাদেশ গ্রিন ফান্ডের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল ব্যবহারের সুযোগ প্রদান করে।
বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএমএ) সচিব আবদুল বারিক খান আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, বিজেএমএতে বর্তমানে প্রায় ১২৯টি সদস্য মিল রয়েছে। এ ঋণ সুবিধার ফলে বিজেএমএ সদস্য মিলগুলো এ তহবিল ব্যবহার করতে পারবে এবং এ তহবিল থেকে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে। বর্তমান সরকার যে পাটশিল্পের প্রতি আন্তরিক, তা এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। এ ঋণ নিয়ে সদস্য মিলগুলো পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনে ব্যয় করতে পারবে। একই সঙ্গে এটি রিফাইন্যান্সিং তহবিল হওয়ায় যেসব মিল এ তহবিল থেকে ঋণ নেবে, তারা সেই ঋণ ফেরত দিয়ে আবারও নতুন করে ঋণ নিতে পারবে। মিলের কোনো যন্ত্রাংশ আমদানি করার ক্ষেত্রে সেটি পরিবেশবান্ধব হলে এটি আমদানিতেও ঋণ সুবিধা পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও এখন পর্যন্ত সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন হলে পাট হবে অর্থনীতির চালিকাশক্তি। এর আগে পাটশিল্পের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিলসহ সরকারি পাটকলগুলোর উদ্বৃত্ত জমিতে নতুন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়।
সরকারি মিলগুলোর উদ্বৃত্ত জমি ব্যবহার সম্পর্কে বিজেএমসি সূত্রে জানা যায়, পাটকল আধুনিকায়নের উদ্দেশ্যে চীনসহ বুয়েটের একটি প্রতিনিধি দল পাটকলগুলো পরিদর্শন করেছে। বুয়েট থেকে যে প্রতিবেদন পাওয়া যাবে, সেটি মূল্যায়ন করে পাটকলগুলো আধুনিকায়ন করা হবে। সেখান থেকেই মোট কত টাকা প্রয়োজন হবে, সেটির ধারণা পাওয়া যাবে। বিজেএমসির নিজস্ব অর্থায়নে তিনটি মিল আধুনিকায়ন করা হবে। এগুলো হচ্ছে ইউএমসি জুট মিলস, জাতীয় জুট মিলস এবং গলফ্রা হাবিব জুট মিলস (নন-জুট)।
পাটকলের অভ্যন্তরে উদ্বৃত্ত জমিতে নতুন শিল্প স্থাপনের লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করে বিজেএমসি। গত বছর ডিসেম্বরে কমিটি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। যেখানে বলা হয়, পাটকলের অভ্যন্তরে যে খালি জায়গা আছে, সেখানে পাট প্রক্রিয়াজাত পণ্যের নতুন শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এজন্যই চিহ্নিত করা হয়েছে নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলের ১৪ একর জায়গা, রাজশাহী জুট মিলের ৬ একর জায়গা এবং কেএমটি জুট মিলের ৫ একর জায়গা। বিজেএমসি সূত্রে জানা গেছে, এ ২৫ একর জায়গা ৫ বছরের জন্য বেসরকারি খাতে লিজ প্রদান করা হবে এবং পাটসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এসব জায়গায় অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এর আগের ম্যান্ডেটরি জুট প্যাকেজিং অ্যাক্ট-২০১০ এর অধীনে গঠিত ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার বিধিমালা-২০১৩’ এর তফসিলে দ্বিতীয় পর্যায়ে ১১টি পণ্য যুক্ত করা হয়। ২১ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত গেজেট জারি করা হয়েছে। এর আগে প্রথম পর্যায়ে ৬টি পণ্যে পাটের মোড়কীকরণে বাধ্যবাধকতা ছিল। ফলে বর্তমানে মোট ১৭টি পণ্য এ আইনের আওতায় আনা হয়। পাটের মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার, চিনি, মরিচ, হলুদ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, ধনিয়া, আলু, আটা, ময়দা ও তুষ-খুদ-কুঁড়া। বর্তমানে সিমেন্ট প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রেও পাটের বস্তা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়েছে।