ছয় বছরে কোটি মানুষের দারিদ্র্য বিমোচন

ছয় বছর ধরে বাংলাদেশের মোট দেশজ আয়ে (জিডিপি) ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ সময়ের গড় প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। আয় বৃদ্ধির ধারবাহিকতায় এ সময়ে দেশের ১ কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করেছে। এর ফলে দারিদ্র্যের হার নেমে এসেছে ২৪ দশমিক ৩০ শতাংশে। অবশ্য আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় মানুষের জীবনযাত্রার মানে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বেড়েছে আয়ের বৈষম্য। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। মঙ্গলবার রাজধানীর পরিসংখ্যান ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘খানা আয়ব্যয় জরিপ-২০১৬’ প্রতিবেদনের খসড়া প্রকাশ করা হয়।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এর আগে ২০১০ সালে খানা আয়ব্যয় জরিপ তৈরি করা হয়েছিল। ওই সময় দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। মোট জনসংখ্যার হিসাবে ২০১০ সালে দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান ছিল প্রায় ৫ কোটি মানুষের। এ হিসাবে ছয় বছরে দারিদ্র্যের হার কমেছে ৭ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট। আর দরিদ্র মানুষের সংখ্যা নেমে এসেছে ৩ কোটি ৮৮ লাখে। এ হিসাবে ৬ বছরে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ মানুষ। এ সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ১৭ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ১২ দশমিক ৯০ শতাংশে। প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল। পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব কে এম মোজাম্মেল হকের সভাপতিত্বে প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিশ্বব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর রাজশ্রী পারালকার, চিফ ইকনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন, বিবিএস মহাপরিচালক মোঃ আমীর হোসেন। অনুষ্ঠানে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক ড. দীপঙ্কর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে দেশে দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে। গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ ও শহরে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। গ্রামের তুলনায় শহরে দারিদ্র্যের হার বেশি। এর আগে ২০১০ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০০৫ সালে ছিল ৪০ শতাংশ এবং ২০০০ সালে ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে অতিদারিদ্র্য কমে ২০১৬ সালে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশে। এ হার গ্রামাঞ্চলে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং শহরে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। জাতীয়ভাবে অতিদারিদ্র্য ২০১০ সালে ছিল ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০০৫ সালে ছিল ২৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০০০ সালে ছিল ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ। আন্তর্জাতিকভাবে অতিদারিদ্র্যের হার হচ্ছে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে অতিদারিদ্র্য থাকবে না। দেশকে ক্ষুধামুক্ত এবং দারিদ্র্যমুক্ত করা সরকারের লক্ষ্য। তিনি বলেন, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হচ্ছে। মানুষ ভাত কম খাচ্ছেন। আগে একজন মানুষ প্রতিদিন ৪১৬ গ্রাম ভাত খেতেন। এখন সেটি কমে ৩৬৭ গ্রামে চলে এসেছে।
রাজশ্রী পারালকার বলেন, মৌসুমভিত্তিক দারিদ্র্য কিছুটা ওঠানামা করলেও গড় দারিদ্র্য কমছে। বাংলাদেশের এ অগ্রগতি থেকে বিশ্বের অন্য দেশ শিক্ষা নিতে পারে। তিনি বলেন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর সক্ষমতা বাড়ায় এখন ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে এবং জেলা পর্যায় পর্যন্ত দারিদ্র্য ম্যাপ প্রকাশ করা হচ্ছে, যা নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সামগ্রিকভাবে দেশের দারিদ্র্য কমলেও এ কমার হার আগের তুলনায় কমেছে। তাছাড়া আয়বৈষম্য বেড়েছে। এ বিষয়টিতে নজর দিতে হবে।
প্রতিবেদনে পরিবারের আয়ব্যয় সম্পর্কে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে একটি পরিবারের মাসিক আয় ছিল ১৫ হাজার ৯৪৫ টাকা। কিন্তু ২০১০ সালের জরিপে এ আয়ের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৫৬৫ টাকা। সে হিসাবে পরিবারের আয় বেড়েছে। অন্যদিকে ২০১৬ সালে পরিবারের মাসিক ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৯১৫ টাকায়, যা ২০১০ সালে ছিল ১১ হাজার ২০০ টাকা। প্রতিবেদনে জীবনমানের কয়েকটি সূচক তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে পরিবারের ইটের বাড়ির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ, যা এর আগের জরিপে ছিল ২৫ দশমিক ১২ শতাংশ। টিন এবং কাঠের বাড়ির হার বেড়ে হয়েছে ৪৯ দশমিক ১২ শতাংশ, যা এর আগের জরিপে ছিল ৩৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ। এছাড়া এখন ৯৭ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করে, যা আগের জরিপে ছিল ৯৬ শতাংশ। স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহার করে ৬১ দশমিক ৩৭ শতাংশ মানুষ। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ সংযোগ আছে ৭৫ দশমিক ৯২ শতাংশ পরিবারে। সাক্ষরতার হার (৭ বছরের ঊর্ধ্বে) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশে। ২০১০ সালের জরিপের তুলনায় বর্তমান জরিপে নারী শিক্ষার হার বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্য গ্রহণের হার কিছুটা কমেছে। ২০১০ সালের তুলনায় চাল ও আটা গ্রহণের পরিমাণ ২০১৬ সালে কমেছে। বেড়েছে ডাল, শাকসবজি, গোশত ও ডিম খাওয়ার পরিমাণ। তবে খাদ্য ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ কমেছে। ২০১০ সালের জরিপে ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ ছিল দৈনিক ২ হাজার ৩১৮ দশমিক ৩ কিলোক্যালরি, যা ২০১৬ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২১০ দশমিক ৪ কিলোক্যালরি। তবে কমেছে প্রোটিন গ্রহণের হারও। ২০১৬ সালে প্রোটিন গ্রহণের হার দাঁড়িয়েছে ৬৩ দশমিক ৮০ গ্রাম, যা ২০১০ সালে ছিল ৬৬ দশমিক ২৬ গ্রাম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথমবারের মতো খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় খাদ্যের তুলনায় কমেছে। এটি উন্নয়নের অন্যতম একটি দিকনির্দেশক। ২০১৬ সালে খাদ্য ছাড়া অন্য খাতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং খাদ্য ব্যয় ৪৭ দশমিক ৭০ শতাংশ। ২০১০ সালে ছিল খাদ্য বহির্ভূত ব্যয় ৪৫ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং খাদ্য ব্যয় ৫৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিতে উপকারভোগীদের হার বেড়েছে। অক্ষম লোকের হার কমেছে। এছাড়া কমেছে ঋণ গ্রহণের হারও। দুর্যোগ আক্রান্ত পরিবারের সংখ্যা ২০১০ সালের তুলনায় বেড়েছে।
আয় ও ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে বৈষম্যের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, শহর অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার ছয় বছরে ২১ দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশে নেমে এসেছে। আর পল্লী অঞ্চলে দারিদ্র্য হার ৩৫ দশমিক ২০ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ২৬ দশমিক ৪০ শতাংশে। বিভাগ ও জেলাওয়ারি দারিদ্র্যের হারেও বেশ তারতম্য রয়েছে। ৩৬ জেলায় দারিদ্র্যের হার গড় হারের চেয়ে বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের হিসাবে দেশে আয়বৈষম্যের গিনি সূচক দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৪৮৩। এর মধ্যে গ্রামে শূন্য দশমিক ৪৫৪ এবং শহরে শূন্য দশমিক ৪৯৮। ২০১০ সালের জরিপে এ হার ছিল জাতীয়ভাবে গিনি সূচক শূন্য দশমিক ৪৫৮। এর মধ্যে গ্রামে ছিল শূন্য দশমিক ৪৩০ এবং শহরে শূন্য দশমিক ৪৫২। গিনি সূচকের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে আয়বৈষম্য বেড়ে যায় বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। অন্যদিকে ভোগের ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে এই সূচক দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৩২৪।