খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়.

পহেলা কার্তিক। আজ কুষ্টিয়ায় বসছে সাধুর হাট। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়, তারে ধরতে পারলে মনবেড়ী দিতাম তাহার পায়…।’ এমন অসংখ্য মরমী গানের স্রষ্টা, আধ্যাত্মিক সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ’র ১২৭তম তিরোধান বা মৃত্যু দিবস আজ। তবে সাধু-গুরু, লালন ভক্ত-অনুরাগীরা লালনের মৃত্যুবার্ষিকীকে ‘উফাত দিবস’ হিসেবে পালন করেন। গভীর শ্রদ্ধাভরে দিনটি স্মরণ উপলক্ষে প্রথমদিন সোমবার বিকেলের মধ্যেই সাধু-গুরু (খেলাফতধারী) তাদের সেবাদাসী এবং লালন ভক্ত-অনুসারীকে সঙ্গে নিয়ে সাঁইজীর পুণ্যভূমি ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে নিজ নিজ পাটে (আসনে) বসবেন। একমাত্র খেলাফতধারী সাধু-গুরু ছাড়া ভক্ত-অনুসারীর কেউ ‘আসনে’ বসার যোগ্যতা রাখেন না। ভক্ত-অনুসারীরা বসবে সাধু-গুরুর আশপাশে।

আসনে বসা সাধু-গুরুদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভক্তি-শ্রদ্ধার বিষয়। এই আসনে বা পাটে বসার সুনির্দিষ্ট কোন নিয়ম নেই। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ সাদা বা রঙিন কাপড়ের টুকরোর ওপর, কিংবা শীতলপাতার মাদুর, এমনকি গামছা বিছিয়েও বসতে পারেন। সাধুসঙ্গের নিয়ম অনুযায়ী লগ্ন আসে সন্ধ্যার পর। পাটে বসে সন্ধ্যা লগ্নে ‘রাখাল সেবা’ গ্রহণের পর থেকে ২৪ ঘণ্টার অষ্টপ্রহর সাধুসঙ্গের আগ পর্যন্ত সাধু-গুরু তাদের ভক্ত-শিষ্যদের নিয়ে ধ্যানে বসে তব-জব করেন। ‘কে তোমার আর যাবে সাথে’ লালনের অমর এ বাণীকে স্মরণ করে দিনটি পালন উপলক্ষে এবারও লালন একাডেমি কুষ্টিয়া আয়োজন করেছে ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতা ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের আয়োজনে প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে অনুষ্ঠানে থাকছে লালন মেলা, লালনের জীবনাদর্শন ও স্মৃতিচারণ করে আলোচনা সভা ও লালন সঙ্গীতানুষ্ঠান। তবে লালন একাডেমির অনুষ্ঠান তিনদিন হলেও সাধুদের মূল অনুষ্ঠান দেড়দিনেই শেষ হয়ে যায়। তখন সাঁঈজীর পুণ্যভূমি ছেড়ে নিজ নিজ আশ্রমের দিকে চলে যেতে শুরু করেন সাধুরা। আখড়াবাড়িতে আসতে সাধুদের যেমন কোন চিঠিপত্র লাগে না তেমনি যেতেও কারো কোন নির্দেশনার প্রয়োজন পড়ে না।

এদিকে লালনের ১২৭তম মৃত্যুবার্ষিকীকে ঘিরে ছেঁউড়িয়া এখন উৎসবমুখর। সাধু-গুরু, বাউল-বাউলানী, ভক্ত-অনুসারী ও দর্শক-শ্রোতার পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে লালনের আখড়াবড়ি। বসেছে সাধুদের মিলনমেলা। ছোট ছোট কাপড়ের টুকরোর ওপর, শীতলপাতার মাদুর, এমনকি মাটিতে গামছা বিছিয়ে বসেছে খ- খ- গানের আসর। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে একতারায় লালনের গানের সুর তুলছেন শিল্পী-ভক্তরা। প্রথমদিন পহেলা কার্তিক সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া লালন একাডেমির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক জহির রায়হানের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি থাকছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, এমপি।

অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক থাকছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. সরোয়ার মুর্শেদ। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখবেন কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুজ্জামান। আলোচনা পর্ব শেষে রাতে বসবে মনোজ্ঞ লালন সঙ্গীতের আসর। বাউল ফকির বলাই শাহ বলেন, সাধু-গুরুদের নিয়ম অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টায় সেবা ৪টি। এগুলো হচ্ছে: রাখাল সেবা, অধিবাসর সেবা, বাল্যসেবা এবং পুণ্যসেবা। সাধুসঙ্গের লগ্ন আসে সন্ধ্যায় পর। পাটে বসে সন্ধ্যা লগ্নে রাখাল সেবা গ্রহণের পর থেকে ২৪ ঘণ্টার অষ্টপ্রহর সাধুসঙ্গের আগ পর্যন্ত সাধু-গুরু তাদের ভক্ত-শিষ্যদের নিয়ে ধ্যানে বসে তব-জব করেন। রাতদিন ২৪ ঘণ্টায় ৮টি প্রহর। এই ৮ প্রহরে তারা একই স্থানে বসে উপাসনা, সাধনা-আরাধনা করেন।

দ্বিতীয় দিন ২ কার্তিক মঙ্গলবার শুরু হবে বাউলদের অষ্টপ্রহরের সাধুসংঘ। এদিন ভোরে ‘গোষ্ঠ গানে’র মধ্য দিয়ে বাউলদের দ্বিতীয় দিনের আচার-অনুষ্ঠান শুরু হয়। লালন একাডেমি সূত্র জানায়, ভোরে গোষ্ঠ গানের মধ্যদিয়ে তিরোধান দিবস কিংবা স্মরণোৎসবের দ্বিতীয় দিন শুরু হয়। দিনটিকে স্বাগত জানানোই গোষ্ঠ গানের মূল উদ্দেশ্য। এরপর একে একে অনুষ্ঠিত হয় তাদের কার্যকরণ। গুরু-শিষ্যের ভাব আদান-প্রদান, লালন তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা, আর সেই সঙ্গে চলে নিজস্ব ঘরানায় বসে লালনের গান পরিবেশন। গোষ্ঠ গান, ‘লয়ে গো ধন গোষ্ঠের কানন চল গোকুল বিহারী, গোষ্ঠে চলো হরি মুরারি, ওরে ও ভাই কেলে শোনা চরণে নুপূর নেনা। মাথায় মোহন চোরা দেনা ধরা পড়ো বংশীধারী। লয়ে গো ধন গোষ্ঠের কানন চল গোকুল বিহারী’। এ গান পরিবেশন করা হয়। এরপর সকালে শুরু হয় ‘বাল্যসেবা’। সকাল ৮টার মধ্যে এ সেবায় সাধুদের খেতে দেয়া হয় দই, চিড়া, মুড়ি, পায়েস আর পাঁচ রকমের ফল। এতে অনেকেই অংশগ্রহণ করেন। বাল্যসেবা শেষে শুরু হয় গান-বাজনা ও তত্ত্ব আলোচনা। বাউলরা বসেন আপন ঘরানায়। দলবেঁধে বসে বাউল সাধকরা ব্যস্ত থাকেন তত্ত্ব আলোচনায়। সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় লালন সাঁই ও অন্য সাধু-গুরুদের গানের বিশ্লেষণ পর্ব। গাওয়া হয় ‘কোথায় হে দয়াল কা-ারি, এসো হে ওপারের কা-ারি, রাখিলেন সাঁই কূপজল করে আন্ধেলা পুকুরে’ পুণ্যসেবা: দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে সাধুদের খেতে দেয়া হয় মাছ, ভাত, সবজি বা ঘণ্ট, ডাল আর দই। এই আহারকে বলে ‘পুণ্যসেবা’। পুণ্যসেবার এই লগ্নকে বলে অষ্টপ্রহরের ‘সাধুসঙ্গ’। আগেরদিন সন্ধ্যায় ‘রাখাল সেবা’ থেকে শুরু করে পরদিন দুপুরের ‘পুণ্যসেবা’ পর্যন্ত এসব খাবারের আয়োজন লালন একাডেমি কর্তৃপক্ষই করে থাকে। লালন মাজারের প্রধান খাদেম মহম্মদ আলী বলেন, মঙ্গলবার দুপুরে পুণ্যসেবার মধ্য দিয়েই শেষ হবে সাধু-গুরু, শিষ্যদের অষ্টপ্রহরের ‘সাধুসঙ্গ’ এবং লালন উৎসবের সার্বিক আনুষ্ঠানিকতা। এর পরই সাধু-গুরু তাদের সেবাদাসী এবং ভক্ত ও অনুসারী সঙ্গে নিয়ে নিজ নিজ আশ্রমের দিকে চলে যেতে শুরু করবেন। অনেকে আবার থেকে যাবেন শেষদিন পর্যন্ত। এ সময় গভীর রাত অবধি চলে খ্যাতনামা শিল্পীদের পরিবেশনায় লালন সঙ্গীতানুষ্ঠান। লালন শাহ প্রায় এক হাজার অমর সঙ্গীত রচনা করে গেছেন। বাংলা ১২৯৭ সালের ১ কার্তিক লালন শাহ ১১৬ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন। লালন আজ নেই। কিন্তু রয়ে গেছে তার অমর সৃষ্টি। যার মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে আছেন এবং বেঁচে থাকবেন বাঙালীর মরমী মানসপটে।