রবি ফসলের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা

বাংলাদেশে প্রায় এক মিলিয়ন হেক্টর চরে ৫-১০ মিলিয়ন মানুষের বসবাস, যারা মূলত কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের এই চর এলাকা তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।

দেশের উত্তরাঞ্চলের চরের মাটি মূলত বালুকণা, মধ্যাঞ্চলের চরের মাটি পলিকণা এবং দক্ষিণাঞ্চলের চরের মাটি কাদামাটিকণাপ্রধান হয়ে থাকে। বালুকণাপ্রধান উত্তরাঞ্চলের চরের মাটির পানি ধারণক্ষমতা খুবই কম; কিন্তু দক্ষিণাঞ্চলের চরের মাটি কাদামাটিকণাপ্রধান হওয়ায় জমির পানি সহজে শুকাতে চায় না। কাজেই অঞ্চলভেদে কৃষির সমস্যাদি ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।
এ বছর পর পর দুইবার বন্যা হওয়ায় উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের চরের আমন ধান প্রায় বিনষ্ট হয়ে গেছে। বন্যার ব্যাপকতা ও স্থায়িত্ব অন্যান্য বছরের সচরাচর বন্যার চেয়ে বেশি ছিল। অনেক এলাকায় বন্যার স্থায়িত্ব ছিল সেপ্টেম্বর মাসের শেষ পর্যন্ত। ফলে যারা সময়মতো অর্থাৎ জুলাই-আগস্ট মাসে আমন ধানের চারা রোপণ করেছিল তারা তাদের প্রায় সম্পূর্ণ ফসলই হারিয়েছে। আবার বন্যার স্থায়িত্ব সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত হওয়ায় নতুন করে কৃষক আর আমন ধানের চাষ করতে পারেনি; যদিও কিছু কৃষক আমন ধানকে প্রধান ফসল চিন্তা করে সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি বা তারও পরে চাষ করেছে, তাদের পক্ষে ওই একই জমিতে সঠিক সময়ে রবি ফসল চাষ করা সম্ভব হবে না। তা ছাড়া বিলম্বে আমন ধান চাষ করার কারণে ধানের বীজ পুষ্ট হওয়ার সময়, উত্তরাঞ্চলের চরের মাটির পানি ধারণক্ষমতা কম হওয়ায়, পানির অভাবে বৃষ্টিনির্ভর আমন ধানের ফলন মারাত্মকভাবে কমে যাবে।

অন্যদিকে খরিফ-১ কৃষি মৌসুমে (মার্চ-জুন) চরের মাটিতে সাধারণত রস খুবই কম থাকে। যদি কোনো বছর মার্চ মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টি না হয়, তাহলে খরিফ-১ মৌসুমের ফসল, যেমন—তিল, মুগডাল বা আউশ ধানের চাষ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কাজেই উত্তরাঞ্চলের চরের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান অবলম্বনই হলো রবি মৌসুমের ফসল। এ মৌসুমেই কৃষকরা বোরো ধান, গম, ডাল ও তৈলবীজজাতীয় ফসল ইত্যাদির চাষ করে থাকে। এ বছর যেসব জমির আমন ধান নষ্ট হয়ে গেছে, সেসব জমিতে অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বর মাসের প্রথমেই রবি ফসলের আবাদ করা যাবে। এতে রবি ফসল দীর্ঘদিন মাটির ভেতরে বর্ষা মৌসুমের জমানো পানি গ্রহণ করতে পারবে। তা ছাড়া মৌসুমের শুরুতেই বীজ বপন করতে পারলে গাছের শারীরিক বৃদ্ধির জন্য যথেষ্ট সময় পাওয়া পাবে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, যে বছর বড় বন্যা হয়, তার পরবর্তী রবি ফসলের বাম্পার ফলন হয়ে থাকে। এর প্রধান কারণই হলো, বন্যায় আমন ধান বিনষ্ট হলেও পরবর্তী রবি মৌসুমে কৃষকরা সঠিক সময়ে মৌসুমের শুরুতেই রবি ফসলের চাষ করতে পারে।

এ বছর বন্যায় বেশির ভাগ কৃষকের রবি ফসলের বীজ নষ্ট হয়ে গেছে। তারা সারসহ অন্যান্য উপকরণ কেনার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলেছে। যদি কৃষকরা সঠিক সময়ে বীজসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণ জোগাড় করতে না পারে, তাহলে তারা রবি মৌসুমের শুরুতেই ফসল চাষ করার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। মনে রাখতে হবে, রবি ফসল চাষ করতে যত বিলম্ব হবে ফসলের ফলনও আনুপাতিক হারে ততই কমে যাবে। কাজেই চরের কৃষকদের হাতে যাতে যথাসময়ে কৃষি উপকরণ পৌঁছায় তার দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তা ছাড়া অর্থাভাবে ফসলের পরিচর্যার জন্য চরের কৃষক যেন অসুবিধার সম্মুখীন না হয় সে ব্যাপারেও লক্ষ রাখতে হবে। দ্রুত বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্পসুদে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

এবার বন্যায় আমন ধান বিনষ্টের পর রবি ফসলের ফলন ভালো না হলে চরের মানুষের আর উপায় থাকবে না। কাজেই কৃষি বিভাগের মাধ্যমে চরের রবি ফসলের বাম্পার ফলনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এখনই গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এক মিলিয়ন হেক্টর চরের কৃষি উৎপাদনের ওপর শুধু চরের মানুষ নয়, সারা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভরশীল।