গাইবান্ধার ‘পাখার গ্রাম’

হাতপাখার ক্যারৎ কুরুৎ শব্দ আর এলাকার রহিম বাউলের পাখা নিয়ে বাঁধা গানের সুরে চলে বুনন প্রতিযোগিতা। এক শরও বেশি পরিবার বাঁশের চটার ভেতরে নানা রঙের সুতো দিয়ে তৈরি করে হাতপাখা। এই হস্তশিল্পের সুবাদে প্রত্যন্ত গ্রামটি পরিচিতি পেয়েছে ‘পাখার গ্রাম’ নামে।
এই চিত্র গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরের আরাজি ছান্দিয়াপুর গ্রামের। পুরুষরা বাঁশের কাজে সহযোগিতা করলেও মূল কাজটি করে নারীরা। ফাতেমা বুবু, নাছরিন খালা, রেবেকা আপা, আনজেরা ভাবির মতো অনেকেই জর্দা-পান মুখে দিয়ে পাখা বোনে অবিরাম। কোনো প্রশিক্ষণ নেই, স্রেফ নিজে নিজে শেখা এ শিল্পকর্ম নিয়ে রীতিমতো তারা প্রতিযোগিতা চালায়। সঙ্গে গল্পের ঝাঁপি খুলে বসে কেউ কেউ।

এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামের ৪০০ পরিবারের মধ্যে শতাধিক পরিবার জড়িয়ে আছে পাখা বুননের হস্তশিল্পে।

প্রতিবছরের মতো এবারও বৈশাখের প্রথম দিন থেকেই বাড়ছে পাখার চাহিদা। ছান্দিয়াপুরের পাখা গাইবান্ধা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী, জয়পুরহাট, জামালপুর, ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্তে। গ্রামীণ মেলাগুলোতে যেমন সবাই পাখা কিনছে, তেমনি বিদ্যুতের ভেলকিবাজিতে অতিষ্ঠ শহুরে মানুষও দোকানপাটে খুঁজছে হাতপাখা। আর সেই চাহিদার অনেকটাই পূরণ করছে ওই পাখার গ্রাম।
পাখার কারিগর সালমা বেগম জানান, চার বছর ধরে পাখা তৈরির কাজ করেন তিনি। সংসারে সচ্ছলতা আনতে অন্য প্রাত্যহিক কাজের পাশাপাশি আপন মনে পাখা বোনেন সালমা। বাড়ির পুরুষরা বাইরের কাজে চলে যায়। সে জন্য অন্য মজুর দিয়ে বাঁশ কেটে পাখার উপযোগী করে নিতে হয়। পাশের উপজেলা গোবিন্দগঞ্জ থেকে ২০০ টাকা কেজিতে আনতে হয় সুতা। এক কেজি সুতা দিয়ে ৩০ থেকে ৩৫টি পাখা বানানো যায়। এর মধ্যে ২৫-৩০ টাকার পাখা যেমন আছে, তেমনি আছে ৬০-৬৫ টাকার পাখাও। একেকজন নারী দিনে তিনটি করে পাখা বুনতে পারে। পাইকাররা এসে বাড়ি থেকেই পাখা কিনে নিয়ে যায়। বাজারের চেয়ে দাম কম পেলেও মাস শেষে লাভের অঙ্ক একেবারে মন্দ নয়। বছরের আট মাস চলে পাখা তৈরির কাজ। এ টাকায় ছেলেমেয়েদের লেখাপড়াসহ সংসারের নানা প্রয়োজন মেটে।

ওই গ্রামে পাখা তৈরির পাইওনিয়ার মরিয়ম বেগম (৫৬) জানান, পাখা তৈরির উপকরণ যেমন কাপড়, বাঁশ, সুতাসহ সব জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। ঋণ নিয়ে কাজ করতে হয়। তারপর পাখা বিক্রি হলে সেই ঋণ সুদে-আসলে শোধ করতে হয়। সরকারিভাবে বিনা শর্তে ঋণ পাওয়া গেলে লাভ একটু বেশি পাওয়া যেত।

পাখার কারিগরদের জন্য গান বেঁধেছেন পাশের গ্রামের বাউল রহিম মিয়া। তিনি বলেন, ‘বেটি ছোলেরা পাখা বানায় আর হামি ওমার জন্য পাখার গান বান্দি। সোগলে মজা পায়। আনন্দে হাতও চলে তাড়াতাড়ি। হামার লাভ হলো বুবুর ঘরের কাছে দু কণা পানতো খাওয়া যায়!’

ছান্দিয়াপুরের নারীদের তৈরি পাখা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রির ব্যবস্থা করেছে সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এসডিএফ)। এসডিএফ জেলা কর্মকর্তা মো. শরিফুল আজাদ বললেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে মূলত ঋণ নিয়ে পাখা তৈরির কাজে বিনিয়োগ করে নারীরা। তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য এই সব হাতপাখা বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন জায়গায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। ’ এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থার (বিসিক) গাইবান্ধা অঞ্চলের সহকারী মহাব্যবস্থাপক এ কে এম মুশফিকুল ইসলাম জানালেন, পাখার গ্রামের কারিগরদের বিসিকের পক্ষ থেকে উন্নত প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর বিধি মেনে ঋণদানে কোনো বাধা নেই।

রসুলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল করিম বলেন, ‘গ্রামের নারীদের হাতের নকশায় মোড়া বর্ণিল এসব পাখার উৎপাদন বাড়াতে ও প্রকৃত দাম পেতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন। ’