মাল্টি-কালচারাল ফোরামে অত্যুজ্জ্বল বাংলাদেশ, শ্রম ঘাম ভালবাসার গল্প

মোরসালিন মিজান, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ফিরে ॥ উৎসবটি সম্পর্কে আগে তেমন কিছু জানা ছিল না। ফলে কী হয়, কতদূর হয়, দেখি। দেখার অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। এবং অতঃপর যে অভিজ্ঞতা, সত্যি মনে রাখার মতো। মাইগ্র্যান্ট আড়িরাং মাল্টি-কালচারাল ফেস্টিভ্যাল (মাম) ভীষণ মুগ্ধ করেছে। অভিভূত করেছে। বহুজাতিক সাংস্কৃতিক উৎসব। মাল্টি-কালচারাল ফোরাম। এই ফোরামে ১২টি দেশ তাদের নিজ নিজ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার চেষ্টা করে। দক্ষিণ কোরিয়ার চমৎকার প্ল্যাটফর্মে ছিল বাংলাদেশও। হ্যাঁ, প্রতি বছর থাকে। তবে এবার শুধু থাকা নয় আলো ছড়িয়েছে। উৎসবে প্রথমবারের মতো গেস্ট অব অনার করে বাংলাদেশকে সম্মান জানায় আয়োজক গিয়ংনাম মাইগ্র্যান্ট লেবার এ্যান্ড ওয়েলফেয়ার সেন্টার। সংগঠনের নাম থেকেই অনুমান করা যায়, এটি বিভিন্ন দেশ থেকে কোরিয়ায় আসা অভিবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করে। পাশাপাশি খেটে খাওয়া মানুষগুলোর যে নিজের দেশ আছে, সংস্কৃতি আছে; সে কথাটি বড় পরিসরে জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করে। এরই অংশ হিসেবে মাম ফেস্টিভ্যালের আয়োজন। এবারের ফেস্টিভ্যালে নিজেদের সংস্কৃতি উপস্থাপন করার জন্য সবচেয়ে বেশি সময় ও সুযোগ পায় বাঙালীরা। অন্যান্য পরিবেশনার পাশাপাশি মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনের মাধ্যমে উৎসবের সেরা নির্বাচিত হয় বাংলাদেশ। বিদেশের মাটিতে এমন অর্জন চোখ ভিজিয়ে দেয়। ভেতরটা কেমন যেন নরম হয়ে যায়।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার গিয়ংনাম প্রদেশে আয়োজন করা হয় মাম ফেস্টিভ্যালের। এ উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অভিবাসীরা সমবেত হয়েছিলেন ছাংওউন শহরে। এ শহরেই তিনদিন ধরে চলে বর্ণাঢ্য-বর্ণিল উৎসব। বহুজাতিক অভিবাসী সাংস্কৃতিক উৎসবে বাংলাদেশ ছাড়াও অংশগ্রহণ করে শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মঙ্গোলিয়া, উজবেকিস্তান, থাইল্যান্ড, চীন ও ফিলিপিন্স। জাপানসহ আরও কিছু দেশ উৎসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সব মিলিয়ে পরিসরটি অনেক বড়। এখানে প্রতিটি দেশ সাধ্যমতো নিজের সংস্কৃতিকে মেলে ধরার চেষ্টা করে। এর পরও অর্জনের দিক থেকে স্পষ্টত এগিয়ে বাংলাদেশ। বাঙালীর সংস্কৃতি সবচেয়ে বেশি দ্যুতি ছড়ায় উৎসবে।

বিদেশের মাটি। নানা সীমাবদ্ধতা। এর পরও কী করে নিজেদের এতটা তুলে ধরা সম্ভব হলো? উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায় বাঙালীর দেশপ্রেমের গল্পটি। জীবন সংগ্রামে ক্লান্ত শ্রান্ত সবাই। কাজ আর কাজ নিয়ে থাকতে হয় শুধু। দম ফেলার ফুসরত মেলে না। এর পরও ১২ বছর ধরে চলা মাম ফেস্টিভ্যালের প্রতিটি আসরে নিজ দেশকে যথাযথভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছিলেন তারা। প্রথমদিকে রাজধানী সিউলে আয়োজন করা হতো উৎসবটি। গত কয়েক বছর ধরে আয়োজন করা হচ্ছে গিয়ংনামে। গিয়ংনাম বাংলাদেশ কমিউনিটি বিশেষ সক্রিয়। নিজ দেশের শ্রমিকদের কল্যাণে নানা কর্মকা- পরিচালনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফোরামে বাঙালী সংস্কৃতিকে তুলে ধরার ব্যাপারে যতœশীল। আর তাই মাম ফেস্টিভ্যাল ঘিরে আগে থেকেই নানা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন তারা। ‘গিয়ংনাম বাংলাদেশ কমিউনিটি ইন কোরিয়া’র সদস্যরা কাজ করছিলেন গত কয়েক মাস ধরে। বাংলাদেশকে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরতে প্রচেষ্টার অন্ত ছিল না তাদের। কমিউনিটির সভাপতি পারভেজ হাসানের কথাই যদি ধরা যায়, এইটুকুন দেখতে মানুষটি। অথচ বড় বড় কাজ নিয়ে ছিলেন। উৎসবের দিনগুলোতে স্থির হয়ে কোথাও তাকে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। প্রতিদিনের কর্মসূচী সমন্বয় করা, শিল্পীদের পরিবেশনা নিশ্চিত ও নির্বিঘœ করাসহ নানা কাজে ব্যস্ত থেকেছেন। কথা বলেছেন সামান্যই। অথচ মাম ফেস্টিভ্যালের সমাপনী দিনে বাংলাদেশের শোভাযাত্রাটিকে সেরা ঘোষণা করা হলে কথা নয় শুধু, আনন্দে নেচে ওঠেন তিনি। সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের উপস্থিতিতে তার হাতে সনদ তুলে দেন আয়োজকরা। মঞ্চ থেকে নামার পর লাজুক হেসে পারভেজ হাসান বলেন, পরের দেশে থাকি। কারও কারও আচরণে মনে হয় আমাদের কোন দেশ নেই। উৎসবের মাধ্যমে দেশটাকে সবার সামনে তুলে ধরতে পেরেছি। এটা কী কম কথা?

দক্ষিণ কোরিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসও বেশ অবাক করেছে। সচরাচর যেমন হয় দূতাবাসগুলো, এটি তার থেকে মনে হলো আলাদা। কর্মকর্তাদের কয়েকজনকে তো শিল্পী হিসেবেই পাওয়া হয় প্রথমে। পরে জানা যায় তারা দূতাবাসে কাজ করেন! অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও সংস্কৃতিমনা। আয়োজকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। বহুবিধ কাজের পাশাপাশি মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনে বড় ভূমিকা ছিল দূতাবাসের। বাংলাদেশ থেকে নিজের কাজে কোরিয়ায় যাওয়া শিল্পী রবিকে মঙ্গল শোভাযাত্রার স্ট্রাকচারাল ফর্ম তৈরির কাজ দেয় দূতাবাস। এই শিল্পী অন্যদের সঙ্গে নিয়ে তৈরি করেন শোভাযাত্রার আকর্ষণীয় উপকরণগুলো। বাঘের বিশাল মুখোশ, মস্ত বড় প্যাঁচা, ৬ মিটার দীর্ঘ ইলিশ মাছ দেখে সকলের চোখ ছানাবড়া! ঢাকা থেকে বয়ে নিয়ে যাওয়া একটি রিক্সাও গড়ে নেয়া হয়। এভাবে পনেরো দিন ধরে চলে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। সমাপনী দিন রবিবার অন্য দেশগুলোর পাশাপাশি শোভাযাত্রা বের করে বাংলাদেশ। দূতাবাসের কর্মকর্তারা এতে যোগ দেন ষোলআনা বাঙালী হয়ে। ফার্স্ট সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম ভূইয়া তো সুন্দর একতারা বাজাতে বাজাতে হেঁটে চলেন। সব মিলিয়ে এক হাজার বাঙালীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। এই স্বতঃস্ফূর্ততাই নাকি বাংলাদেশের সেরা নির্বাচিত হওয়ার প্রধান কারণ!

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত জুলফিকার রহমান বলেন, আমরা বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশকে সব সময়ই ভালভাবে উপস্থাপন করতে চাই। এবার সুযোগটা বেশি ছিল। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। বাকিটা বাঙালী তাদের নিজস্ব জীবনী শক্তি দিয়ে সম্পূর্ণ করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দূরে থেকেও উৎসবের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হয়েছিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা করে মন্ত্রণালয়ই উৎসবকে এগিয়ে নিয়ে যায়। উৎসবের পরিকল্পনা, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান, নিজস্ব সংস্কৃতি তুলে ধরার উপায় ইত্যাদি নিয়ে দীর্ঘ দিন কাজ করে মন্ত্রণালয়। এমনকি উৎসবে উপস্থিত হয়েছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। তার উপস্থিতিকে দক্ষিণ কোরিয়ার আয়োজকরা বিশেষভাবে স্বাগত জানান। মঙ্গল শোভাযাত্রায় তিনিসহ বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দায়িত্ব নিয়ে যাওয়া কর্মকর্তারা অংশ নেন। ভিন্ন পরিবেশে বাঙালীত্বের প্রকাশ দেখে দারুণ উৎফুল্ল ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী। শোভাযাত্রা মোটামুটি মাতিয়ে রেখেছিলেন তিনি। উৎসবের অর্জন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। হাজার বছরের পুরনো সংস্কৃতি আমাদের। তবে এই সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ে না। বর্তমান সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে মাম ফেস্টিভ্যালে গেস্ট অব অনার হয়ে যোগ দেয়া। উৎসবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে চিরায়ত বাঙালী সংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এতে করে নতুন এক বাংলাদেশকে চিনেছে দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্য দেশগুলো। এমন অর্জন ধরে রাখতে দেশে বিদেশে সকলকে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান মন্ত্রী।