ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে স্কুল শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি

উন্নয়নের জন্য জ্ঞান এবং শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। উন্নত জাতি গঠনে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রযোজনীয়তা এখন সর্বজন স্বীকৃত। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার ধারণা শুরু হয় সত্তরের দশকে। যার মূল কথা হচ্ছে একটি দেশের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে জ্ঞান এবং তথ্যভিত্তিক করে গড়ে তোলা। জ্ঞান ও যুক্তিভিত্তিক সমাজ গঠনে বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। তথ্য এবং যোগাযোগ প্রযুক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততাই পারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নয়নের ভিত গড়তে।

বুদ্ধিবৃত্তিক বিজ্ঞান মনস্ক সমাজ গঠনে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা পদ্ধতি এবং জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য উপকরণকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমান বিশ্বে সর্বত্র যেখানে বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির জয়জয়কার, সেখানে আমাদের দেশের বিশেষত মফস্বলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ১৯% বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে। বিজ্ঞান পড়া ও জানার প্রতি অনাগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে বিজ্ঞানকে আরো জনপ্রিয় করার জন্য নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি ভীতি লাঘবে বর্তমান সরকার ইউনিয়ন পর্যায়ে বিজ্ঞান ক্লাব, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ উদযাপন, তরুণ বিজ্ঞানীদের উত্সাহ ও প্রণোদনা প্রদানসহ মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব প্রতিষ্ঠা ও ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করে আসছে।

বর্তমান যুগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার যুগ। দেশের চলমান আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অভিযাত্রাকে আরো গতিশীল করতে বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং টেকসই প্রয়োগ অপরিহার্য। দেশের উন্নয়নকে আরো বেগবান করতে চাই জাতিকে বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তোলা এবং বেশি বেশি বিজ্ঞান চর্চা। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলেছে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আমাদের ঈর্ষণীয় অগ্রগতি হলেও বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির অন্যান্য বিভাগে আমাদের অর্জন প্রত্যাশিত মাত্রার নয়। বরঞ্চ বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি বর্তমানে শিক্ষার্থীদের ঝোঁক দিন দিন কমে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মাঝে বিজ্ঞান চর্চার আগ্রহ বাড়ানোর প্রয়োজন উপলব্ধি করে কুলিয়ারচরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বিশ্বের সর্ববৃহত্ বিজ্ঞান ও আইসিটি বিষয়ক ব্যবহারিক ক্লাসের আয়োজন করা হয়।

আয়োজকদের বিশ্বাস দেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত ব্যতিক্রমী এ উদ্যোগের প্রাপ্তি অনেক। যেমন—

আমাদের দেশে স্কুল পর্যায়ে (৫ম-৭ম শ্রেণিতে) বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক ব্যবহারিক ক্লাসের সুযোগ না থাকায় শিক্ষার্থীদের মাঝে বিজ্ঞান ভীতি ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এ কার্যক্রমের ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এটি প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে যে বিজ্ঞান বিষয়টি সহজ ও আনন্দদায়ক। ফলে তাদের মধ্যে বিজ্ঞান ভীতি দূর হয়ে তা উত্সবে পরিণত হয়।

প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় প্রত্যয় আগামী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ; সে লক্ষ্যে তিনি বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে চলছেন। প্রধানমন্ত্রীর বহুমুখী পদক্ষেপগুলোর সঙ্গে সংগতি রেখে ৫ম-৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মাঝে বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তিকে সহজে উপস্থাপনের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝ থেকে বিজ্ঞান ভীতি দূর করে ৯ম শ্রেণিতে যেন অধিক শিক্ষার্থী বিজ্ঞান পড়তে আগ্রহী হয় এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে তারই বর্ণিল আয়োজন ছিল এ উত্সব।

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ থেকেই ভবিষ্যতের স্টিফেন হকিংস ও জাকারবার্গের মতো আরো বহু বিজ্ঞানী ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ তৈরির বীজ বপন করা হয়।

আয়োজনের ফলে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে তথ্য প্রযুক্তি ক্লাসে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছে। তাই এদের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হবে ডিজিটাল বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশ সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক অংশগ্রহণকারী বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য তাদের নিজ নিজ বিদ্যালয়ে মোট ২৬টি ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের ঘোষণা প্রদান করেন— যা এ উপজেলায় তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় ব্যাপক পরিবর্তন বয়ে আনবে।

বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে কী কী করতে হবে সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা এবং সত্যিকারের বিজ্ঞান প্রজন্ম হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তোলার যথেষ্ট উপকরণ পেয়েছে, যা উন্নত জাতি বিনির্মাণে যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে। শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে যদি বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়গুলো দ্বারা সচল রাখা যায় তবে সমাজে বিদ্যমান সমস্যাগুলো যেমন—জঙ্গিবাদ, মাদক ইত্যাদি তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারবে না।

কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান ভীতি দূর করে তথ্য প্রযুক্তির প্রতি আকৃষ্ট করতে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার এ উত্সবটি একটি কার্যকর প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে যা ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিরাট ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি ।