আনন্দে কেঁদেছি – প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের পথে ॥

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের ভূমিকার কারণেই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সঙ্কট বিশ্ববাসীর মনোযোগ কেড়েছে, বিশ্বব্যাপী নানা আলোচনা চলছে। মানবিক দিক বিবেচনা করেই আমরা রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। আন্তর্জাতিক চাপে বা যেভাবেই হোক মিয়ানমার সরকার এগিয়ে এসেছে, আলোচনা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপের পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সঙ্কট ধীরে ধীরে সমাধান করতে পারব ইনশাল্লাহ।

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আনীত তথাকথিত দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগের তার সরকার সমুচিত জবাব দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করছি। যারা আমাদের এই পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে মিথ্যা অপবাদ এবং বাংলাদেশের সামর্থ্যকে হেয় করার চেষ্টা করেছিল আমরা তাদের সমুচিত জবাব দিয়েছি। নিজস্ব অর্থায়নে মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে আবারও বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।

জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে ২০ দিনের সফর শেষে দেশে ফেরার পর শনিবার সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি টার্মিনালের লাউঞ্জে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা সঙ্কট অবসানের জন্য পাঁচ প্রস্তাব তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বিশ্বনেতাদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছেন তিনি। মিয়ানমারের নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর সাহসী সিদ্ধান্ত এবং এই সঙ্কটের প্রতি বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণের জন্য দেশে ফিরে বিমানবন্দর থেকে গণভবন পর্যন্ত লাখো মানুষের বিপুল সংবর্ধনায় সিক্ত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিমানবন্দরেও আওয়ামী লীগ, ১৪ দলসহ দেশের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রধানমন্ত্রীকে ‘বিপন্ন মানবতার বাতিঘর’ অভিহিত করেন।

বিমানবন্দরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, জাতীয় কর্তব্য হিসেবে মিয়ানমারের এই মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। শরণার্থী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করার বিষয়ে সরকারী উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রয়োজনে এক বেলা খাব, আরেক বেলা তাদের ভাগ করে দেব। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত হওয়ার কথা স্বীকার করে নিয়ে তা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বোন শেখ রেহানার ভূমিকার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, প্রথমে আমরা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম, খোঁজ নিয়ে দেখলাম যে সেখানে অমানবিক অত্যাচার হয়েছে, মেয়েদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে। তাই তাদেরকে আশ্রয় দিতে হলো। পৃথিবীতে এরকম বহু ঘটনা ঘটে। অনেকে দরজা বন্ধ করে রাখে। শেখ রেহানা বলল, ১৬ কোটি লোককে খাওয়াচ্ছ, আর ৫-৭ লাখ লোককে খাওয়াতে পারবে না? আমি সেখানে গেলাম, সবাইকে ডেকে বললাম, আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। এ মানুষগুলোকে আশ্রয় দেয়া ও খাওয়াতে হবে।

রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ মানুষের জন্য, বিপন্ন মানুষকে আশ্রয় দেয়া মানুষের কর্তব্য। বাংলাদেশের মানুষ মানবতা দেখিয়েছে। আমরা কারও সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করিনি। তবে যারা সহযোগিতা করেছেন, তাদের ধন্যবাদ। প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং বাংলাদেশের মানুষের রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে বলেই আমরা এই চ্যালেঞ্জটা নিয়েছি।

মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার আগে তাদের নোয়াখালীর ভাসানচরে পুনর্বাসনের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন তারা যেভাবে আছে, সেভাবে থাকতে পারে না। আমি যাওয়ার আগেই নেভিকে টাকা দিয়ে গিয়েছিলাম। ভাসানচরে দুটি সাইক্লোন সেন্টার ও আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। তিনি বলেন, নোয়াখালীর লোকজন বলে ঠেঙ্গারচর, আর চিটাগাংয়ে বলে ভাসানচর। যেহেতু এরা (রোহিঙ্গা) ভাসমান, তাই আমি বললাম ভাসানচর নামটাই থাকুক। সেখানেই তাদের অস্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা হবে।

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিকভাবে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির সফলতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। তারা (রোহিঙ্গা) যেন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারে, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। শরণার্থীদের ফেরত নিতে মিয়ানমারের ঘোষণা এবং আলোচনার জন্য আউং সান সুচির দফতরের মন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকে অগ্রগতি মনে করছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মিয়ানমারের একজন এসেছে। এটা একটা বিশেষ দিক।

যেন যুদ্ধ বেধেই যাবে এমন ভাব ॥ রোহিঙ্গা সঙ্কটের মধ্যে মিয়ানমারের প্ররোচনায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কতগুলো ঘটনা ছিল যেটা এখন বিস্তারিত বলব না। যেমন আমাদের একেবারে প্রতিবেশী (মিয়ানমার), একটা পর্যায়ে এমন একটা ভাব দেখাল যেন আমাদের সঙ্গে যুদ্ধই বেধে যাবে। আমি আমাদের সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, পুলিশ-র‌্যাবসহ সকলকে সতর্ক করলাম কোনভাবেই যাতে তারা কোন রকম উস্কানিতে বিভ্রান্ত না হয়, যতক্ষণ আমি নির্দেশ না দেব।

তিনি বলেন, এ রকম একটা ঘটনা ঘটাতে চাইবে, অনেকে আছে এখানে নানারকম উস্কানি দেবে। এমন একটা অবস্থা তৈরি করতে চাইবে যেটা হয়ত তখন অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরাবে। মূল পরিস্থিতি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে ওই সময় তারা নানাভাবে উস্কানি দিয়েছে। তবে সেদিকে আমরা খুবই সতর্ক ছিলাম। সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড, পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও দলের নেতাকর্মীদের এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয় এবং যা যা প্রয়োজন তার আগাম ব্যবস্থা আমি করে দিয়েছিলাম। আন্তর্জাতিক চাপে, যেভাবেই হোক মিয়ানমার সরকার এগিয়ে এসেছে, আলোচনা শুরু হয়েছে। ইনশাল্লাহ এ সঙ্কটের সমাধানও করা যাবে।

পদ্মা সেতুর স্প্যান বসানোর ছবি দেখে কেঁদেছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা ॥ পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করতে পেরে দুর্নীতির কথা বলে যে অপমান করা হয়েছে, তার জবাব দিতে পেরেছি। বিশ্বব্যাংক আগে অপপ্রচার করেছে, কিন্তু তারা কোন প্রমাণ দিতে পারেনি। এখন তাদের দুর্নীতি অনুসন্ধানের তদন্ত দলের প্রধান ব্যক্তির বিরুদ্ধে হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথি বেরচ্ছে। সত্যের জয় তাৎক্ষণিক হয় না। মিথ্যার জয় তাৎক্ষণিক। একপর্যায়ে গিয়ে সত্যের জয় হয়। আমাদের জয় হয়েছে। বাংলাদেশকে হেয় করতে চেয়েছিল। পারেনি। দুর্নীতির কথা বলে ওই সময় বিশ্বব্যাংকের তদন্তের নামে মানসিক অত্যাচার করেছে। আমাদের বিশ্বাস ছিল দুর্নীতি হয়নি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মার মতো খরস্রোতা নদীতে সুপারস্ট্রাকচার করা বিরাট চ্যালেঞ্জ। অনেকেই সন্দিহান ছিল। আমাদের কেবিনেটের অনেকের মধ্যেও সন্দেহ ছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমরা করেছি। ওবায়দুল কাদের স্প্যান বসানোর উদ্বোধনে দেরি করতে চেয়েছিল। আমি বলেছি- না। এটা নিয়ে অনেক কিছু হয়েছে। অনেক মানুষকে অপমানিত হতে হয়েছিল। এক সেকেন্ডও দেরি করব না। আমেরিকান সময় ৩টার দিকে মেসেজ পেলাম সুপারস্ট্রাকচার বসেছে। আমি ছবি চাইলাম। ওই ছবি দেখে আমরা দুই বোন কেঁদেছি। অনেক অপমানের জবাব দিতে পারলাম। তিনি আরও বলেন, মানুষের বিশ্বাস, আস্থা অর্জনের চেয়ে রাজনীতিকের জীবনে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হয় না। ওবায়দুল কাদের বারবার মেসেজ পাঠাচ্ছে, ফোনে কথা হচ্ছে, বলছে, ‘আপনার জন্য দেরি করব’। আমি বললাম, না । দেরি করবা না।’

সুস্বাস্থ্যের জন্য দোয়া চাইলেন প্রধানমন্ত্রী ॥ যুক্তরাষ্ট্রে পিত্তথলির অস্ত্রোপচারের পর দেশে ফিরে আগের মতো পূর্ণোদ্যমে কাজ করার জন্য দেশবাসীর দোয়া চাইলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি জানান, চিকিৎসকরা ছয় সপ্তাহ সাবধানে চলাফেরা করার পরামর্শ দিয়েছেন।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকদিক থেকেই গলব্লাডারের স্টোন (পাথর) নিয়ে ভুগছিলাম। কাজ করতে করতে যখন একটু শরীর খারাপ লাগল সঙ্গে সঙ্গে জয়ের (সজীব ওয়াজেদ জয়) বাসায় গেলাম। ডাক্তাররা সব রেডি করেছিল। এর মধ্যে শেখ রেহানা চলে এসেছিল। অস্ত্রোপচারের পর সব সময় আমার সঙ্গে ছিল, খাওয়ানোসহ সবই সে করেছে।

সফল অস্ত্রোপচারের পর এখন অনেক ভাল আছেন জানিয়ে চিকিৎসকদের নানা পরামর্শের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, চিকিৎসকরা বলেছেন ছয় সপ্তাহ একটু সাবধানে থাকতে। ছয় মাস খুব সাবধানে চলাফেরা করতে। নিজের বয়সের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বৃদ্ধ বয়সে একটু সময় তো লাগবেই। ৭১ বছর বয়স হয়েছে। কাজেই সময় একটু লাগবে। সবার কাছে দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, সবার কাছে দোয়া চাই, সুস্থ হয়ে সবার সঙ্গে আবার যেন পূর্ণোদ্যমে কাজ করতে পারি। এখনও করে যাচ্ছি। দোয়া চাই যেন আরও কাজ করে যেতে পারি।