ঝরেপড়া চুলে কোটি টাকার কারবার

নারীদের মাথা থেকে ঝরেপড়া চুল বেচাকেনার হাট গড়ে উঠেছে রাজশাহীর তানোর উপজেলার চৌবাড়িয়ায়। মঙ্গলবার বাদ দিয়ে সপ্তাহে ছয় দিন এখানে চুলের বিকিকিনি চলে। এ হাটে চুল সরবরাহ করতে পাশের তিনটি গ্রামে গড়ে উঠেছে প্রায় ১৫টি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র। পুরুষদের পাশাপাশি সেখানে কাজ করছেন নারীরাও। সব মিলিয়ে মাসে প্রায় কোটি টাকার কারবার হয়।
চুল ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মাথা আঁচড়ানোর সময় নারীদের মাথা থেকে যেসব চুল ঝরে পড়ে, তা অনেক নারীই সংরক্ষণ করেন। পরে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ফেরিওয়ালারা সেসব চুল সংগ্রহ করেন। কখনও চকলেট, কখনও বাদাম, কখনও নামমাত্র টাকায় কেনা হয় সেসব চুল। এরপর এসব চুল নেয়া হয় প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে। সেখানে চুল পরিষ্কার করে বাছাই করা হয়।
প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র থেকে বাছাই করা চুল নেয়া হয় চৌবাড়িয়া হাটে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাইকাররা সেখান থেকে চুল নিয়ে যান। সেখানে এক কেজি চুল সর্বোচ্চ ১৮ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। প্রতিদিন প্রায় ২০ কেজি, মানে অন্তত আড়াই লাখ টাকার চুল বিক্রি হয় চৌবাড়িয়া হাটে। বটিচুল, পরচুলাসহ অন্যান্য শৌখিন জিনিস তৈরির জন্য এ চুল কিনে নিয়ে যান পাইকাররা। তারা এ চুল ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, চীন, কোরিয়া ও জাপানেও রফতানি করে থাকেন। চৌবাড়িয়া হাটের সবচেয়ে বড় চুল ব্যবসায়ী সেলিম হোসেন। এখানে তার চুলের দোকানও আছে। পাশের মাদারীপুর গ্রামের ১১টি বাড়িতে গড়ে ওঠা প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র থেকে চুল যায় তার দোকানে। এছাড়া হরিপুর গ্রামের আরও একটি এবং বিহারল গ্রামের দুইটি বাড়িতেও গড়ে উঠেছে প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র। এসব বাড়ির পুরুষরা হাটে চুল বিক্রি করেন। তারা জানান, সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বাড়িতে চুল প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ চলে। কর্মীদের তালিকায় নারীদের সংখ্যাই বেশি। মূলত চুলের জট ছাড়ানোর কাজ করেন তারা। তিনটি গ্রামের অন্তত ১০০ নারী ও ৫০ পুরুষ চুল প্রক্রিয়াজাত করে থাকেন। ফেরিওয়ালাদের দিয়ে যাওয়া চুল তারা ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুয়ে, শুকিয়ে, জট ছাড়িয়ে বিক্রির উপযোগী করে তোলেন।
চুলের জট ছড়ানোর কাজে নিয়েজিত নারীকর্মী মাদারীপুর গ্রামের কাজলী বেগম জানান, তাদের কাছে আসা চুল থেকে তারা নোংরা ও জটবাঁধা চুল আলাদা করেন। কারখানার পুরুষ কর্মীরা চুলগুলো পরিষ্কার করেন। এরপর রোদে শুকিয়ে তারাই ধাপে ধাপে আলাদা করে বিক্রির উপযোগী করেন। প্রত্যেক নারীকর্মী দৈনিক ১২০ টাকা করে মজুরি পান। এতে সংসারে সচ্ছলতা ফিরছে তাদের।
চৌবাড়িয়া হাটের চুল ব্যবসায়ী সেলিম হোসেন জানান, ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে তারা সাড়ে ৩ হাজার টাকা কেজি দরে চুল কেনেন। তারপর তিনিই প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে চুলগুলো পাঠান। সেখান থেকে ফের ওই চুল আসে তার দোকানে। তখন ১ কেজি কেনা চুলের ওজন হয় ৬৫০ গ্রাম। তিনি সেই চুল প্রতি কেজি সাড়ে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। তবে ১২ ইঞ্চির বেশি লম্বা চুল সর্বোচ্চ ১৮ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।
চৌবাড়িয়া হাটের আরেক চুল ব্যবসায়ী রায়হান আলী জানিয়েছেন, তানোর ছাড়াও পাশের নওগাঁর নিয়ামতপুর ও মান্দা উপজেলায় গড়ে ওঠা প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র থেকেও চুল আসে ওই হাটে। চুল কিনতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে পাইকাররা আসেন। হাটে প্রতিদিন অন্তত ২০ কেজি করে চুল বিক্রি হয়। মাসে এখানে অন্তত কোটি টাকার কারবার হয় চুল নিয়ে। দিন দিন বেচাকেনা জমজমাট হচ্ছে বলেও জানালেন এ চুল ব্যবসায়ী।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শওকাত আলী বলেন, তানোরের চুল ব্যবসা একটি সম্ভাবনাময় খাত। এতে যুক্ত হয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এখনও চুল ব্যবসা আলাদা শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এ খাত অনেকদূর এগিয়ে যাবে।