দক্ষিণ কোরিয়ার রাস্তায় মঙ্গল শোভাযাত্রা, অনন্য অর্জন

বাংলাদেশ থেকে বহু দূরের দেশ দক্ষিণ কোরিয়া। দুই দেশের সমাজ সংস্কৃতি একেবারেই আলাদা। গত কয়েকদিন ধরে ছাংওউন শহরে অবস্থান করে সেটি খুব বোঝা যাচ্ছে। নিয়মিত যাতায়াত করার পরও, রাস্তা ঘাটগুলোকে কেমন যেন অচেনা লাগে। গাড়ির চাকা মিনিটে কখন কতবার ঘুরবে, সেটা ঠিক করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। গতি একটু কম বেশি হলেই বিপদ। যখন খুশি রাস্তা পার হবেন? ঢাকায় সম্ভব বটে। এখানে কেউ কল্পনাও করতে পারেন না। কোন ব্যত্যয় ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে তা ক্যামেরায় ধরা পড়বে। মুহূর্তেই পুলিশ! রাস্তায় নামলে তাই মোটামুটি বুক ধুকপুক শুরু হয়ে যায়।

অথচ রবিবার সে রাস্তাই পুরোপুরি বাঙালীর হয়ে গিয়েছিল! গাড়ি থামিয়ে দিয়ে, পথচারীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে প্রধান সড়কে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনের সুযোগ করে দেয় উৎসবের আয়োজ গিয়ংনাম লেবার এ্যান্ড ওয়েলফেয়ার সেন্টার। নাম মাত্র আয়োজন নয়। পহেলা বৈশাখে ঢাকার চারুকলা থেকে যে রঙের যে ঢংয়ের শোভাযাত্রাটি বের করা হয়, তার প্রায় পুরোটাই দেখা যায় এখানে। মাল্টি কালচারাল ফোরামে বাঙালী সংস্কৃতিকে তুলে ধরতেই আশ্বিনে আয়োজন করা হয় বর্ষবরণ উৎসবের। সে কী আনন্দঘন আয়োজন! যেন সত্যি সত্যি বর্ষবরণ উৎসব! যেন পহেলা বৈশাখের বাংলাদেশ!

বহুজাতিক সাংস্কৃতিক উৎসব মাইগ্র্যান্ট আড়িরাং মাল্টি কালচারাল ফেস্টিভ্যালের (মাম) সমাপনী দিনে বর্নিল বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও শোভযাত্রা বের করে ইপিএস ভুক্ত ১২টি দেশ। দেশগুলোর মধ্যে ছিলÑ শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মঙ্গোলিয়া, উজবেকিস্তান, থাইল্যান্ড, চীন ও ফিলিপিন। প্রতিটি দেশ তাদের স্বতন্ত্র উপস্থাপনা নিয়ে পথে নামে। কোন দেশের উপস্থাপনাই দুর্বল ছিল না। তবে বাঙালীর আত্মবিশ্বাস ছিল অনেক বেশি। স্থানীয় সময় বিকেল তিনটার পর বাংলাদেশের নাম ঘোষণা করা হলে শুরু হয় শোভাযাত্রা। যে রাস্তায় পা ফেলতে লাল-সবুজ বাতিগুলো বার বার দেখে নিতে হয় সেখানে একসঙ্গে ১ হাজারের মতো মানুষ নেমে পড়েছিলেন! দেশের বাইরে এত লোক দেখে এমনিতেই অবাক হয়ে যেতে হয়। তদুপরি মঙ্গল শোভাযাত্রার আনন্দঘন আয়োজন দেখে কী যে ভাল লাগছিল! দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ রাস্তা ধরে হাঁটেননি শুধু, নাচেন, গান করেন। এ সময় পুরুষের গায়ে ছিল পাঞ্জাবী। নারীরা সেজেছিলেন শাড়িতে। লাল-সাদা রঙের পোশাকে ফুটে উঠেছিল পহেলা বৈশাখ। অসময়ে বর্ষবরণ যে এত আনন্দের উচ্ছ্বাসের হতে পারে নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা আসলেই কঠিন।

এদিন ইওংজি কালচারাল পার্কে গিয়ে দেখা যায়, সব কটি দেশ প্রস্তুত। চোখ জুড়ানো সুন্দর নিয়ে পথে নামার অপেক্ষা করছে। তবে উৎসবের গেস্ট অব অনার বাংলাদেশের শোভাযাত্রাটি বের হয় সবার আগে। শোভাযাত্রার সামনের অংশে ছিল রিক্সা। ঢাকা থেকে বয়ে নেয়া রিক্সায় চড়ে বসেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। পাঞ্জাবী পরা মন্ত্রীকে মন্ত্রী বলে মনেই হচ্ছিল না। কিশোরের মতো মেতে ছিলেন তিনিও। তার সঙ্গে কলসি কাঁখে বসেছিলেন মডেল ও নৃত্যশিল্পী মৌ। রিক্সা রাস্তায় নামতেই আশপাশের মানুষ চোখ বড় বড় করে তাকান। কোরিয়ার রাস্তায় কোন অযান্ত্রীক যান বাহন নেই। রিক্সা, তাও আবার এত সুন্দর, দেখে অবাক হয়ে যান পথচারীরা। পেছনে ছিল জাতীয় মাছ ইলিশ। বিশাল স্ট্রাকচারাল ফর্ম বয়ে চলেছিলেন তরুণেরা। বর্ষবরণ উৎসবের প্রধানতম অনুষঙ্গ প্যাঁচাও দেখা যায়। বিশালাকার প্যাঁচা শোভাযাত্রার সঙ্গে এগিয়ে চলে। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের কারও হাতে একতারা। কেউ গলায় ঝুলিয়ে নিয়েছিলেন ঢোল। সব দেখে দেখে ভিনদেশী নাগরিকদের চোখ ছানাবড়া! আর বাঙালী আপ্লুত। উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলেন যেমন, তেমনি কেঁদে ফেলছিলেন। এভাবে অনেকটা পথ পারি দিয়ে ফের কালচারাল পার্কে এসে শেষ হয় শোভাযাত্রা। এতে অভিবাসী বাঙালীরা ছাড়াও যোগ দেন বাংলাদেশ থেকে আসা প্রতিনিধি দল ও দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা কর্মচারীরা। যুগ্ম সচিব ফায়জুর রহমান ফারুকী, শিল্পকলা একাডেমির সচিব জাহাঙ্গীর হোসেন, সানিয়া আক্তার প্রমুখ পহেলা বৈশাখের পোশাকে শুভাযাত্রায় অংশ নেন। কোরিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জুলফিকার রহমানও ছিলেন শুভাযাত্রায়। অনন্য সাধারণ মঙ্গল শোভাযাত্রা সরাসরি দেখানো হয় স্থানীয় টেলিভিশনে।

শোভাযাত্রা শেষে টান টান উত্তেজনা ছিল ফল জানার জন্য। সন্ধ্যার পর পর আসে কাক্সিক্ষত ঘোষণা। জানানো হয়, মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে এবার সেরা নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ। সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও ছাংওউনে বাংলাদেশ কমিউনিটির প্রধান পারভেজের হাতে সম্মাননা তুলে দেয়া হয়। এর পর থেকেই চলে বিজয় উল্লাস। এখনও সেই রেশ রয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, আমাদের সংস্কৃতি যে সমৃদ্ধ তা এই স্বীকৃতির মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো। এতগুলো দেশ অংশগ্রহণ করেছে। অথচ বিজ্ঞ বিচারকেরা আমাদের প্রেজেন্টেশন দেখে সবচেয়ে বেশি অভিভূত হয়েছেন। প্রবাসী বাঙালীদের এ জন্য অভিনন্দন জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, যে যেখানেই থাকুন না কেন দেশ ও মাটির প্রতি এভাবেই অনুগত থাকতে হবে। ভালবাসতে হবে।

বাঙালী কমিউনিটির প্রধান পারভেজ বলেন, আমরা গত বার বছর ধরে এই উৎসবে অংশগ্রহণ করছি। কিন্তু এবারই শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত হলো বাংলাদেশ। এমন প্রাপ্তি ধরে রাখার জন্য সব করবেন বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশীর বাস। বড় অংশটি শ্রমিক। সংখ্যায় ১২ হাজার। বাঙালীসহ অন্য দেশগুলোর অভিবাসীদের নিয়েই বহুজাতিক এই সাংস্কৃতিক উৎসব। এ বছর উৎসবের ‘গেস্ট অব অনার’ করে বিরল সম্মান দেখানো হয় বাংলাদেশকে। ফলে আয়োজনের মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে আমার সোনার বাংলা। মাল্টি কালচারাল ফোরামে অন্য ১১ দেশ তাদের সংস্কৃতি তুলে ধরতে যে সময় পায়, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি সময় ও সুযোগ দেয়া হয় বাংলাদেশকে। সর্বশেষ মঙ্গল শোভাযাত্রার সফল আয়োজন এনে দেয় বড় সাফল্য।