তারাই সৃষ্টি করেন ইতিহাস

দুঃখ, কষ্ট এবং সফলতা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। প্রবাদে আছে ‘নো পেইন, নো গেইন’। এটি চিরসত্য। কিন্তু আমরা প্রায়সই ভুলে যাই এই সত্যটিকে। কবি বলেছেন, কাটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে/ দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মোহিতে। কিন্তু আমরা একটু কষ্টেই হাফিয়ে যাই। জীবনে যখন দুঃখ-কষ্ট আসে, তখন পালানোর পথ খুঁজি অথচ ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও পরমাণু বিজ্ঞানী এ.পি.জে আব্দুল কালাম বলেছেন “জীবনে সমস্যার প্রয়োজন আছে, সমস্যা আছে বলেই সফলতার এতো স্বাদ।

আমরা অনেকেই একটু চেষ্টা করেই মনে মনে ভাবি সাফল্যের পথ অনেক দীর্ঘ, অনেক কন্টকাকীর্ণ। এই ভেবে অনেক হাল ছেড়ে দেয়। কিন্তু যারা ধৈর্য ধরে আঁকড়ে ধরে থাকে তারাই সফল হয়। কেননা কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার বলেছেন, “কেন পান্থ ক্ষান্ত হও হেরি দীর্ঘপথ উদ্যম বিহনে পুরে কি মনোরথ”। যেমন: দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা জীবনের মূল্যবান সময়ের ২৭টি বছর জেলখানার অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। কিন্তু হাল ছেড়ে দেননি। তিনি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছেন এবং শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। অনেক সময় আমরা কোনো কাজে একবার ব্যর্থ হলে হাল ছেড়ে দেই। বলে ফেলি আমাকে দিয়ে এ কাজ হবে না। কিন্তু মহামনীষীরা জীবনে বারবার ব্যর্থ হয়েও হাল ছাড়েননি। জীবন অবর্ণনীয় দুঃখ, কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে বড় হয়েছেন। দেশের জন্য মানুষের জন্য তথা এ বিশ্বের জন্য অবদান রেখে গেছেন।

রুশ সাহিত্যের এক অমর নাম ম্যাক্সিম গোর্কি। তিনি জীবন থেকে বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন কিশোর বয়সে যখন রুটির দোকানে, জাহাজে থালা-বাসন ধোয়ার কাজ করতেন তখন মালিক পক্ষ তাকে শারীরিক প্রহার করতো। তিনি কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। আর নিজ চক্ষে দর্শন করেছিলেন রাশিয়ার শিশু শ্রমিকদের অবর্ণনীয় দুঃখ, যা তাকে “মা” নামক বিশ্বক্লাসিক সাহিত্য গ্রন্থটি লিখতে অনুপ্রাণিত করেছিল। আর উত্তরকালে তিনি হয়েছিলেন একজন বিখ্যাত সাহিত্যিক।

এক কাঠুরিয়ার ছেলে আব্রাহাম লিংকন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়া তার জন্য সহজ ছিল না। তিনি জীবনে অনেকবার পরাজিত হয়েছেন। আর প্রতিটা পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে গেছেন। অবশেষে তিনি আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। আর হয়েছেন এ যাবত্কালের আমেরিকার সবচেয়ে সফল প্রেসিডেন্ট। ডেল কার্নেগী তার বইয়ে লিখেছিলেন আব্রাহাম লিংকন যদি একটি বিত্তশালী/ধনকুবের পরিবারে জন্মগ্রহণ করতেন, তাহলে হয়তো তিনি হার্ভার্ড থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে বড় জোড় একটি চাকরি করতেন। আর আরাম আয়েশেই জীবনটা কাটিয়ে দিতেন। যদি তার জীবনে দুঃখ, কষ্ট এবং পরাজয় না থাকতো তাহলে হয়তো তিনি গেটিসবার্গের বিখ্যাত সেই ভাষণটি দিতে পারতেন না। এছাড়া আজকের বিশ্বসাহিত্য ভুবনে জে.কে রলিং নামটি অনেক পরিচিত, তার হ্যারিপটার শিশুতোষ সিরিজটি বিশ্বে বহুল পঠিত এবং বিক্রিত সিরিজ। সিরিজের গল্পগুলো নিয়ে সিনেমাও তৈরি হয়েছে। অথচ এ সিরিজের স্রষ্টাও জীবনে বারবার ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর কথাই ধরুন। এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। আজ তিনি বিশ্বনেতা, রাজনীতির কবি, একটি জাতির স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। কিন্তু এ সাফল্য তিনি এমনি এমনিতেই পাননি। তাকেও সহ্য করতে হয়েছিল সীমাহীন কষ্ট, নির্যাতন ও নিপীড়ন। জীবনের মূল্যবান ১৩টি বছর জেল খেটেছিলেন, বার বার অ্যারেস্ট, রি-অ্যারেস্ট হয়েছিলেন, এমনকি জীবনের অনেকদিন অনিশ্চয়তার মধ্যেও কেটেছে। কিন্তু দমে যাননি। পরাজয় বরণ করেননি। রিক্স নিয়েছেন সফল হয়েছেন। তার এই সংগ্রামী জীবনের পিছনে দুঃখ, কষ্ট ও ত্যাগ না থাকলে হয়তো তিনি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ কোনো খসড়া বা পূর্বপ্রস্ততি ছাড়া ঐতিহাসিক ও জ্বালাময়ী ভাষণটি দিতে পারতেন না। যা সাত কোটি বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

পৃথিবীর সব সফল মানুষেরা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মান না। আর সোনার চামচ মুখে নিয়ে যারা জন্মগ্রহণ করে তারা বেশিদূর এগোতেও পারেন না। কিন্তু যারা ব্যক্তি ও সমাজের দুঃখ বুকে ধারণ করে তা প্রতিরোধে এক দুর্দমনীয় শক্তি নিজের ভিতর তৈরি করতে পারেন ইতিহাস সাক্ষী তারাই মহামানব, তারাই সৃষ্টি করেন ইতিহাস।

তাই বলে জীবনে সফল হতে হলে দুঃখ, কষ্টকে মেনে নিয়ে সংগ্রাম করে যেতে হবে। দুঃখ, কষ্টকে অভিশাপ নয় বরং আশীর্বাদ হিসেবে নিতে হবে। যেননিভাবে নিয়েছিলেন মহান ব্যক্তিরা।