ওই দেখা যায় পদ্মা সেতু

মুন্সীগঞ্জের মাওয়ার শিমুলিয়া ঘাট থেকে রওনা দিতেই নজর কেড়ে নিল আকাশের এই রং, রূপ। আর নিচে খরস্রোতা নদী। তার বুকে জেগে উঠেছে একের পর এক চর। তার ওপর কাশবন ফুলে ফুলে সাদা। চরের চ্যানেল ধরে লঞ্চটি চলছিল। একসময় দূর থেকেই দৃষ্টিতে এলো বহু কাঙ্ক্ষিত সেই অবকাঠামোটি। এর নাম স্প্যান। ১৫০ মিটার দীর্ঘ। এভাবে একের পর এক ৪০টি স্প্যান বসবে। তৈরি হবে স্বপ্নের সেতু, যার ওপর দিয়ে চলবে গাড়ি, নিচে ট্রেন।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে চোখে পড়ল পদ্মা নদীর জাজিরায় প্রকল্পের জন্য তৈরি করা নদীঘাটের কাছে সেতুর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলার। সেগুলোর ওপরে বসানোর জন্য প্রস্তুত স্প্যানটি। নদীতে ঘুরছে কয়েকটি স্পিডবোট। এগুলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর, মূল সেতুর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি ও বাংলাদেশ সেতু বিভাগের। সাংবাদিকরা লঞ্চে থাকতেই দেখা গেল সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের একটি সাদা স্পিডবোটের ওপর দাঁড়িয়ে। তাঁর চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস। ঘড়িতে যখন সকাল ১০টা ২৮ মিনিট, তখনই ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারের ওপর ক্রেন দিয়ে বসানো হলো দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যানটি। ফলে বিশ্বব্যাংকের ঋণ ফিরিয়ে দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে মূল পদ্মা সেতুর অংশ দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে গতকাল থেকে।

স্প্যান বসানোর দৃশ্যটি দেখতে বহু মানুষ নৌকায় করে প্রকল্প এলাকায় আসতে চেয়েছিল। তবে নিরাপত্তার জন্য কাছে ভিড়তে দেওয়া হয়নি। তারা দূর থেকে পিলারের ওপর স্প্যান দেখে আনন্দে উদ্বেল হয়ে পড়ে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি। তিনিও ছিলেন উচ্ছ্বসিত।

পদ্মা সেতু প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এর নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সেতু বিভাগের সর্বশেষ তথ্যানুসারে, প্রকল্পে এ পর্যন্ত সার্বিক অগ্রগতি প্রায় ৪৯ শতাংশ। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, মাওয়া থেকে জাজিরা পর্যন্ত মূল সেতুটি হবে ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ। ৪২টি পিলারের ওপর তৈরি হবে এটি। প্রতিটি পিলারে বসানো হবে ছয়টি করে পাইল। মাওয়া প্রান্তে ভায়াডাক্টে আরো ১২টি এবং জাজিরায় বসবে ১৬টি ট্রানজেকশন পিলার। দ্বিতল পদ্মা বহুমুখী সেতুর কাঠামো তৈরি হবে স্টিল ও কংক্রিট দিয়ে। সেতুর ওপরের তলায় থাকবে চার লেনের মহাসড়ক, নিচ দিয়ে যাবে রেললাইন। এ সেতু হলে ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমের ২১ জেলার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন হবে সড়ক ও রেলপথে।

দিনের আলোয় ধূসর ও রাতে সোনালি দেখা যাবে পদ্মা সেতু। প্রথম স্প্যান বসানোর পর স্পিডবোট থেকে নেমে জাজিরাঘাটে যান সড়কমন্ত্রী। সেখানে প্রায় ২৫ মিনিট অবস্থান করেন তিনি। বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় এই সেতুর স্প্যান বসানোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বর্তমানে ওয়াশিংটনে আছেন। বাংলাদেশ সেতু বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েই স্প্যান বসানো কাজের উদ্বোধন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তাঁকে ছাড়াই কাজ চালিয়ে নিতে। কারণ গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের কাছে এতটুকু বিলম্ব চান না তিনি। ওবায়দুল কাদের প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার কত গভীর তা তুলে ধরে বলেন, তাঁর নেতৃত্বের সোনালি ফসল এটি। এখানে অপূর্ব সুন্দর পরিবেশ। নদীর ধারে কাশবন। বঙ্গোপসাগরের ঊর্মিমালার মতো উদ্বেল আমাদের হৃদয়।

সড়কমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতুর দীর্ঘ পথ পরিক্রমার এটি একটি মাইলফলক। যিনি এর কুশীলব, যিনি এর রূপকার, তিনি এখানে অনুপস্থিত। ওবায়দুল কাদের আরো বললেন, শেখ হাসিনা বলেছেন, তোমরা পারবে। ওয়াশিংটন থেকে তিনি আরো জানিয়েছেন, এক মিনিটের জন্য পদ্মা সেতুর কাজ বন্ধ করা যাবে না।

ওবায়দুল কাদের বলেন, বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা প্রকল্প ছেড়ে চলে যায়, তখন একটা অনিশ্চয়তার অন্ধকার ছিল। হতাশার মেঘ ঢেকে ছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন এই কুয়াশা আর কাটানো যাবে না। অনেকেই ভেবেছিলেন পদ্মা সেতু আর হবে না। কিন্তু সেদিন বঙ্গবন্ধুর বীর কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা অসম সাহসে সময়ের মশাল হাতে এগিয়েছেন। অন্ধকার এখন কেটে গেছে।

তিনি বলেন, স্প্যান যখন একটা বসে গেছে, বাকিগুলোও কয়েক দিন পর পর বসে যাবে। যথাসময়ে আমরা পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করব।

স্প্যান বসানোর পর দুপুর প্রায় ১২টা থেকে আকাশে জমতে শুরু করে ঘন মেঘ। একপর্যায়ে শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি।

স্প্যান বসানোর পর জাজিরা থেকে মাওয়ার শিমুলিয়া ঘাটের দিকে ফিরতে ফিরতে দেখা গেল, নদীর বিভিন্ন অংশে পাইল করা হয়েছে। স্থানে স্থানে আছে ক্রেন। মাওয়া প্রান্তের কারখানায় আরো স্প্যান তৈরি নিয়ে কারিগররা ব্যস্ত। নভেম্বরের শেষ দিকে আরেকটি হ্যামার জার্মানি থেকে আসবে। মাওয়ার কুমারভোগে আরো ৯টি স্প্যান তৈরি রয়েছে। চীনে তৈরি আছে আরো ১২টি। এগুলো পর্যায়ক্রমে আনা হবে। আরো ১৯টি স্প্যান চিনে তৈরির প্রক্রিয়া চলছে।

গতকাল যে স্প্যানটি বসানো হয়েছে সেটি চীন থেকে আনা হয়েছে। এরপর মাওয়ার কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডের কারখানায় সেটি রাখা ছিল। গত রবিবার স্প্যানটি নিয়ে রওনা হয় একটি ক্রেন। রাতে ২৩ নম্বর পিলারের কাছে যাত্রাবিরতি করে। আবার রওনা হয়ে গত সোমবার দুপুরে ৩০ ও ৩১ নম্বর পিলারের মাঝামাঝি নোঙর করে। গত শুক্রবার দুপুরে সেটি ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারের মাঝামাঝি অংশে এনে রাখা হয়। গতকাল সকাল ৮টায় শুরু হয় বসানোর প্রক্রিয়া।

জাজিরায় ৩৭ থেকে ৪২ নম্বর পর্যন্ত ছয়টি পিলার বসানোর কাজ শেষ পর্যায়ে। শেষ হতে চলেছে ৩৯ ও ৪০ নম্বর পিলারের কাজও। ৪০টি পিলার নির্মাণ করা হবে নদীতে, দুটি হবে নদীপারে। নদীতে নির্মাণ করা প্রতিটি পিলারে ছয়টি করে পাইলিং করা হয়েছে, যার দৈর্ঘ্য গড়ে প্রায় ১২৭ মিটার পর্যন্ত। একটি পিলার থেকে আরেকটির দূরত্ব ১৫০ মিটার। নদীতে মূল সেতুর ২৬২টি পাইলের মধ্যে ৭৫টি বসেছে। এ ছাড়া জাজিরায় সেতুর ভায়াডাক্টের ১৮৬টি পাইল বসেছে। এখানে আর মাত্র সাতটি পাইল বাকি সংযোগ সেতুর (ভায়াডাক্ট) জন্য। মাওয়ায় সংযোগ সেতুর ১৭২টির মধ্যে সাতটি পাইল বসেছে। ‘৭বি’ নম্বর স্প্যানটির ফিটিং শেষ হয়েছে মাওয়ায়। এবার সেটির রঙের কাজ শুরু হবে।