প্রায় সব আর্থ-সামাজিক সূচকেই বাংলাদেশ এগিয়ে

জুন (২০১৭) শেষে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল এক হাজার ৫৩৮ মার্কিন ডলার। পাকিস্তানের ছিল এক হাজার ৪৭০ ডলার। বাংলাদেশের চেয়ে ৬৮ ডলার কম। নানা প্রতিকূল খবরের মধ্যে খুদে সংবাদটি পড়ে যারপরনাই খুশি হয়েছিলাম। অহংকারে মন ভরে গিয়েছিল। আর মনে পড়ছিল, কোথায় ছিলাম আর এখন কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি আমরা। ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে যে বাংলাদেশ এক দশক ধরে ৬ শতাংশের বেশি হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। গেল দুই বছর ধরে ৭ শতাংশেরও বেশি হারে তার অর্থনীতি বেড়েছে। আর এর বিপরীতে পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে ৩-৪ শতাংশ হারে। ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে যখন বাংলাদেশ নামের স্বাধীন দেশটির জন্ম হয় তখন তার জিডিপির বড়জোর ৬-৭ শতাংশ আসত শিল্প খাত থেকে। তখন পাকিস্তানে শিল্পের অবদান ছিল ২০ শতাংশ। আর বর্তমানে বাংলাদেশের শিল্প খাতের অবদান জিডিপির ২৯ শতাংশের মতো। এই হার দিন দিনই বাড়ছে। তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য আসলেই নজরকাড়া। ভারত ও পাকিস্তান মিলে যে পরিমাণ গার্মেন্টসামগ্রী রপ্তানি করে, বাংলাদেশ একাই তার চেয়ে বেশি রপ্তানি করে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানের চেয়ে বেশি হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে তার দ্রুত হারে কমে যাওয়া জনসংখ্যা। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যেখানে ১.২ শতাংশ, সেখানে পাকিস্তানের ওই হার ২.১ শতাংশ। মনে রাখতে হবে, আমরা যখন যুদ্ধ করে পাকিস্তানকে হারিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি করি তখন আমাদের জনসংখ্যা ছিল প্রায় আট কোটির মতো। আর আয়তনে আমাদের চেয়ে পাঁচ গুণ বড় পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল সাত কোটি। আর আজকে আমাদের জনসংখ্যা যেখানে ১৬ কোটি, পাকিস্তানের তা ২১ কোটি।
শুধু কি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণেই বাংলাদেশের এমন নজরকাড়া সাফল্য? মোটেও না। আর্থ-সামাজিক প্রায় সব সূচকেই বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। মানব উন্নয়নের অন্যান্য সূচকেও বাংলাদেশ পাকিস্তানকে অনেক দূরে ফেলে এসেছে। বর্তমানে আমাদের জীবনের গড় আয়ু ৭২ বছর, পাকিস্তানের তা ৬৬ বছর। আমাদের চেয়ে গড়ে ছয় বছর কম। শিশুমৃত্যুর হার বাংলাদেশে এক হাজারে ৩১, পাকিস্তানে তা ৬৬। আমাদের দ্বিগুণেরও বেশি। আমাদের ছেলে-মেয়েরা গড়ে ১০.২ বছর ধরে লেখাপড়া করে। সেখানে পাকিস্তানের হার ৮.১ বছর। আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষার হার ৪২ শতাংশ। পাকিস্তানে এই হার আমাদের অর্ধেকেরও কম, ২০ শতাংশ। প্রাথমিক শিক্ষায় আমাদের সাফল্য প্রায় শতভাগ। আমাদের মানব উন্নয়ন সূচক ০.৫৮। পাকিস্তানের ০.৫৫। আমাদের জেন্ডার সূচক ০.৯৩। পাকিস্তানের ০.৭৪। আমাদের ১৫ বছরের বেশি জনসংখ্যার ৫৯.৪ শতাংশই কর্মে নিয়োজিত। এর একটা বড় অংশ আবার নারী। পাকিস্তানে তা ৫১ শতাংশ। আমাদের রপ্তানি ও আমদানি মিলে জিডিপির ৪২.১ শতাংশ। পাকিস্তানের তা ২৮.১ শতাংশ। ২০০০ সালকে ভিত্তি বছর ধরলে আমাদের রপ্তানির সূচক (২০১৪) ৫০৬.৭৯। আর পাকিস্তানের তা ২৪৫.৭৭। সামন্ততান্ত্রিক পাকিস্তানের কৃষকদের চেয়ে বাংলাদেশের কৃষকদের অবস্থা ঢের ভালো। আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষির পাশাপাশি অকৃষি খাতের অবদানও উল্লেখযোগ্য। গ্রামে অর্থ প্রেরণের সুযোগও বেড়েছে। প্রতিদিন এক হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ যাচ্ছে শহর থেকে গ্রামে শুধু মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। অন্য ব্যাংকগুলোর গ্রামীণ শাখাও বেশ সক্রিয়। তাই বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি অনেকটাই চাঙ্গা। সে কারণে পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের আয়-বৈষম্যও অনেক কম। এ রকম অসংখ্য সূচক দিয়ে আমরা প্রমাণ করতে পারি যে পাকিস্তানকে আমরা ছুড়ে ফেলে দিয়ে এসেছি, তার চেয়ে কতটাই না এগিয়ে গেছি।

কিন্তু মঞ্চে যখনই বাংলাদেশের সাফল্য নিয়ে কথা বলি তখনই পাকিস্তান ও আশপাশের দেশগুলোর চেয়ে অনেক সূচকেই যে আমরা এগিয়ে রয়েছি সে কথা উল্লেখ করি। এ কথাগুলো বলার সময় মনটা ভরে যায়। দেশটা স্বাধীন হয়েছে বলেই না আমরা আমাদের ভাগ্য এমন করে পরিবর্তন করতে পারছি। অর্থনীতির বাইরেও বাংলাদেশের সাফল্য চোখে পড়ার মতো। জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বাংলাদেশের অবদানের কথা সারা বিশ্বেরই জানা। যেখানেই বাংলাদেশের সৈনিক ও পুলিশ শান্তি মিশনে গেছে সেখানেই সুনাম কুড়িয়ে এনেছে। আফ্রিকার একটি দেশে বাংলাকে তারা দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় ভাষায় পরিণত করতে পেরেছে। আমাদের লাখ লাখ অনাবাসী কর্মী ও উদ্যোক্তা ভাই-বোন পৃথিবীজুড়ে সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিটি দেশেই তাঁদের কর্মদক্ষতা, সদাচরণ ও শান্তিপ্রিয়তার সুখ্যাতি শুনে মনটা ভরে যায়।

এক দিনে এই অহংকার তৈরি হয়নি। পুরো পাকিস্তান আমলে আমাদের কী নিদারুণ উপেক্ষা, শোষণ ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছিল তা হয়তো তরুণ প্রজন্মের অনেকেরই অজানা। সরল মনেই বাঙালি জনগোষ্ঠী মূলত অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির আশায়ই ১৯৪৬ সালে পাকিস্তানের পক্ষে গণভোট দিয়েছিল। কিন্তু সামরিক-বেসামরিক এলিট নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটি যে কতটা নিপীড়নবাদী, বৈষম্যের উদ্গাতা ও অমানবিক ছিল, তা বুঝতে বাঙালির খুব বেশি সময় লাগেনি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্ম। আর ১৯৪৮ সালেই বাঙালিকে রাস্তায় নামতে হলো তাদের মুখের ভাষার সম্মান রক্ষার জন্য। এর কিছুদিনের মধ্যেই বাঙালির মুক্তির দিশারি তরুণ রাজনীতিক শেখ মুজিবকে এগিয়ে আসতে হলো নতুন করে আওয়ামী মুসলিম লীগ এবং আরো পরে আওয়ামী লীগ নামের দল গঠন করার লক্ষ্যে। এরপর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং তার পরের অসংখ্য আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতিসত্তা গড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে আমাদের এই জাতিসত্তা গড়ার মূল নেতৃত্বে চলে আসেন বঙ্গবন্ধু।

এই স্বাধীন বাংলাদেশের নেতৃত্ব তাঁর কাঁধেই চাপে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আত্মস্থ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সংবিধান ও আইন-কানুন, পরিকল্পনা ও নিয়ম-নীতি চালুও করেন। কিন্তু সেই সময়ের চ্যালেঞ্জগুলো ছিল সত্যি বিরাট। তবু তিনি মানুষকে হতাশ করেননি, বরং সব বাধা পায়ে ঠেলে মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এক কঠিন সংগ্রামে তিনি নেমে পড়েছিলেন।

দেশবাসীকে তিনি আশার বাণী শুনিয়েছিলেন এমন এক সময় যখন আসলেই বাংলাদেশ এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েছিল। ১৯৭১ সালে এক কোটিরও বেশি মানুষ শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। তারা তখন ফিরে আসছিল। দেশের ভেতরে প্রায় দুই কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। ১৫ লাখ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত করা হয়েছিল। ২০ লাখ মানুষের কোনো ঘরবাড়িই অবশিষ্ট ছিল না। তখনো বেসামরিক প্রশাসন পুরোপুরি পুনর্গঠিত ছিল না। তা ছাড়া পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলা থেকে উচ্চ পদে খুব সামান্যসংখ্যক মানুষ সরকারি কর্মকর্তা নিয়োজিত হতে পেরেছিলেন। যাঁরা নিয়োজিত ছিলেন তাঁদের একটা বড় অংশ আবার পাকিস্তানে আটকা পড়েছিল। একই সঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের রাস্তাঘাট, রেল ও নৌ যোগাযোগ ছিল ভঙ্গুর। বন্দরে মাইন পোঁতা। প্রায় সব অবকাঠামো ভঙ্গুর। যাঁরা পূর্ব বাংলায় ব্যাংক ও শিল্প পরিচালনা করতেন তাঁরা চলে গেছেন পাকিস্তানে। স্বাভাবিক নিয়মেই ব্যাংক-বীমা, শিল্প ইউনিটগুলো জাতীয় করা হয়। অথচ এগুলো পরিচালনা করার মতো উপযুক্ত জনবলের বড় অভাব ছিল সে সময়।

বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশই সংযুক্ত ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে। আমাদের রপ্তানির ৩২ শতাংশ ও আমদানির ৩৫ শতাংশ পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। হঠাৎ করে কাঁচা তুলা, সুতা, কাপড়, তেলবীজ, শিল্পসামগ্রী আমদানির উৎস বন্ধ হয়ে গেল। আর এ ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো উদ্যোক্তা শ্রেণির উদ্ভবই ঘটেনি বাংলাদেশে। আর কে না জানে পাকিস্তানের এই পূর্বাঞ্চলের প্রদেশটি (আজকের বাংলাদেশ) ছিল একটি ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ’। এখানকার পাট রপ্তানি করে যে বিদেশি মুদ্রা অর্জন করা হতো তার প্রায় পুরোটাই ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানের নগরায়ণ ও শিল্পায়নে। বিদেশ থেকে যে সাহায্য পাওয়া যেত তার বেশির ভাগই আসত সামরিক সহযোগিতা খাতে। আর সামরিক বাহিনী ছিল মূলত পশ্চিম পাকিস্তানে। তাই বিদেশি সাহায্য যেত ওই অঞ্চলেই। অবকাঠামো ও অন্যান্য অর্থনৈতিক খাত বাবদ পাওয়া সাহায্য ও ঋণও যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতিবিদরা সেই ১৯৫৬ সালেই বলেছিলেন, পাকিস্তানে ‘দুই অর্থনীতি’ চালু হয়ে গেছে। বিনিয়োগ ও উন্নয়নে সরকারি অর্থ খরচের হার বরাবরই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক। অধ্যাপক নুরুল ইসলামের (১৯৭২) এক গবেষণায় ধরা পড়েছে যে ১৯৫৯-৬০ সাল থেকে ১৯৬৯-৭০ সালের ব্যবধানে পূর্ব বাংলায় মাথাপিছু জিডিপি বেড়েছে ১৭ শতাংশ। তার বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানে বেড়েছে ৪২ শতাংশ। ১৯৫৯-৬০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মাথাপিছু আয় পূর্ব বাংলার জনগণের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ বেশি ছিল। ১৯৬৯-৭০ সালে এই অঙ্ক দুই-তৃতীয়াংশ বেশি হয়ে গিয়েছিল। তার মানে ১৯৭১ সালের আগে যে অঞ্চলটি আজকের বাংলাদেশ সে অঞ্চলে শিল্প ও আর্থিক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান খুব সামান্যই গড়ে উঠেছিল। বাণিজ্য ও শিল্পে তাই বাঙালির হিস্যা ছিল খুবই সামান্য। এ রকম একটি পরিপ্রেক্ষিতে যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হলো তখন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো ও বড় পরাশক্তির ধারণা হয়েছিল যে সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারবে না। হেনরি কিসিঞ্জারের নেতৃত্বাধীন এক কমিটি মনে করেছিল, এটি হবে ‘আন্তর্জাতিক এক তলাবিহীন ঝুড়ি’। এখানে যতই সাহায্য ঢালা হোক না কেন, তা কোনো কাজেই লাগবে না! তাই দেশটিতে দ্রুতই দুর্ভিক্ষ ও মহামারি দেখা দেবে। ওই সময়ে সিআইএর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এত অল্প জায়গায় এত মানুষের বাস এবং এত দারিদ্র্যের’ কারণে দেশটি তার প্রতিবেশী এবং বিশ্বের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে (১৯৭২) বলা হয়, পুরো পাকিস্তান আমলে এ অঞ্চলের মাথাপিছু আয় ছিল ৫০-৬০ ডলারের মতো এবং তা ছিল প্রায় স্থবির। এ অঞ্চলের মানুষের জীবনের গড় আয়ু ছিল ৫০ বছরেরও কম। বেকারত্বের হার ছিল ২০-৩০ শতাংশ। শিক্ষার হার ২০ শতাংশ। প্রকৃতি ছিল ভয়ংকর প্রতিকূল। সব মিলিয়ে দেশটির টিকে থাকাই মুশকিল হবে। প্রায় অভিন্ন সুরে বিশ্বব্যাংকের দুই সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ইউস্ট ফাল্যান্ড ও পার্কিনসন (১৯৭৬) এক বইয়ের শিরোনাম দিয়েছিলেন ‘বাংলাদেশ : অ্যা টেস্ট কেইস অব ডেভেলপমেন্ট’। এখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশের কোনো সম্ভাবনাও তাঁদের চোখে পড়েনি।

কী আশ্চর্য, সেই হতভাগ্য দেশটিই কিনা আজ ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে সারা বিশ্বের নজর কাড়ছে। শুধু মাথাপিছু আয় কেন, অর্থনৈতিক ও মানব উন্নয়নের প্রায় সব কটি সূচকেই বাংলাদেশের অবস্থান পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। মালথাস তত্ত্বে বিশ্বাসীদের অবাক করে দিয়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নেমে এসেছে ১.২ শতাংশ। বাংলাদেশের প্রতি দম্পতির সন্তান সংখ্যা দুই। পাকিস্তানের তা সাত। বাংলাদেশের প্রায় শতভাগ শিশু প্রাথমিক স্কুলে যায়। পাকিস্তানে এ হার ৭০ শতাংশের মতো। আর সার্বিক শিক্ষার হার তো মাত্র ২০ শতাংশ।

কী করে ঘটল বাংলাদেশের অর্থনীতির এই বিপ্লব? এর উত্তরে বলা যায়, এর মূলে রয়েছে এ দেশের লড়াকু মানুষ। ১৯৭১ সালে হার না মানা মানুষের অপরাজেয় প্রাণশক্তির নানা মাত্রিক বিকাশের ফসল আমাদের এই আর্থিক সাফল্য। বঙ্গবন্ধু অতি অল্প সময়ের মধ্যে দেশটির ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার শক্ত পাটাতন তৈরি করে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ মদদে তাই ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁকে শারীরিকভাবে সরিয়ে দেয়। এ আঘাত কাটিয়ে উঠে ফের আমরা বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে নির্মাণে মনোযোগী হয়েছি। ধারাবাহিকভাবে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা আমাদের অর্থনৈতিক নীতিকৌশলে পরিবর্তন এনেছি, যেখানে প্রয়োজন সেখানে উদারনীতি গ্রহণ করেছি, যেখানে প্রয়োজন (যেমন—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক সংরক্ষণ ইত্যাদি) সেখানে রাষ্ট্রের পক্ষপাতিত্বমূলক বিনিয়োগ ঢেলেছি এবং যেখানে প্রয়োজন ব্যক্তি খাতকে উৎসাহ ও প্রাধান্য দিয়েছি (যেমন—আর্থিক সেবা, আমদানি-রপ্তানিসহ ব্যবসা-বাণিজ্য)। তা ছাড়া সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও আয়-রোজগার বাড়াতে সরকার ও ব্যক্তি খাতের মধ্যে এক চমৎকার সমঝোতা তৈরি হয়েছে। আমাদের সামাজিক উন্নয়নে অলাভজনক অ-সরকারি খাতের ভূমিকাও ছিল সম্পূরক ও সহায়ক। আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উন্নয়নমুখী ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য। বিদেশি সাহায্য প্রদানকারী সংস্থাগুলো বাংলাদেশের এই আত্মপ্রত্যয়ী অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কৌশলকে স্বাগত জানিয়েছে এবং প্রয়োজনমতো সহায়তা করেছে। তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে এ দেশের পরিশ্রমী কৃষক, শ্রমিক, খুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তা শ্রেণি। তাদের শ্রমে-ঘামে গড়ে উঠেছে আজকের সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশকে অনেকেই আড়চোখে দেখলেও তার অভিযাত্রাকে সালাম না করে পারে না। বিশেষ করে বস্ত্র খাতে কী করে আমরা চীনের মতো বিরাট দেশকেও টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করছি, তা দেখে বিশ্বের চোখ ছানাবড়া। অর্থনীতিতে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে—এটিই আমাদের জন্য শেষ কথা নয়। আমরা ২০৩০ সালে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাই। ২০৪১ সালে আমরা উন্নত দেশ হতে চাই। তাই আমাদের বর্তমান সাফল্যে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। আগামীর এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে আমরা যেন নিচের মোটা দাগের নীতিকৌশলে স্থির সংকল্প থাকি সেদিকে সদাসতর্ক থাকতে হবে।

১. ম্যাক্রো-অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রেখে বর্তমানে যেমনটি চলছে ব্যক্তি খাতের জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগের জায়গা করে যেতে হবে। ২. বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের আশপাশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো দ্রুত নির্মাণ করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শিল্পায়নে যুক্ত করতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে চলমান বিনিয়োগের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। ৩. রেল, নদী ও বিমান পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ৪. দুর্যোগ মোকাবেলায় যে রাষ্ট্রীয় সহনশক্তি ও সৃজনশীলতা আমরা অর্জন করেছি, তা আরো জোরদার করে যেতে হবে, যাতে কোনো দুর্যোগই যেন আমাদের ম্যাক্রো-অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করতে না পারে। ৫. বড় অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি গ্রামীণ অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক সংরক্ষণে সরকারি বিনিয়োগ অব্যাহতভাবে বাড়িয়ে যেতে হবে। ৬. বাড়তি বিনিয়োগের জন্য বাড়তি অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সমর্থন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে আমাদের সর্বদাই নিবেদিত থাকতে হবে। ৭. অ-সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারি জোরদার করে ‘পাবলিক সার্ভিস’ বিতরণব্যবস্থাকে আরো মজবুত করতে হবে। ৮. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, মেয়েদের পড়াশোনা, নারীর ক্ষমতায়নের যে নীতিকৌশল আমাদের সামাজিক উন্নয়নে এতটা সাফল্য দিয়েছে, সেসব নীতিকৌশল আরো জোরদার করতে হবে। ৯. আমাদের শিল্পায়ন শ্রমনির্ভর। এ খাতে শ্রমিকের অধিকার ও স্বস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ খাতকে পরিবেশগতভাবে আরো সবুজ করতে আরো মনোযোগী হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বিদেশগামী শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণে আমাদের সতর্ক হতে হবে। তাদের রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যবস্থা আরো সহজ ও জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের কারিগরি দক্ষতা বাড়ানোর নীতি আরো জোরদার করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকেও দক্ষতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে সাজাতে হবে। ১০. খুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে আর্থিক খাতকে আরো উদ্যোক্তাবান্ধব, পরিবহনব্যবস্থা ব্যয়সাশ্রয়ী এবং বাজারব্যবস্থাকে তাঁদের উপযোগী করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। নারী উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছেন। তাঁদের অর্থায়ন ও মার্কেটিং সুযোগ বাড়াতে হবে। ১১. আমাদের প্রশাসন যন্ত্রকে শাসক নয়, নাগরিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। ১২. এমডিজি অর্জনে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জাতীয় ঐকমত্য দেখিয়েছি, এসডিজি পূরণেও একই কৌশল গ্রহণ করতে হবে। এই রাজনৈতিক সদিচ্ছা আরো জোরদার করতে হবে। সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে একযোগে এসডিজি বাস্তবায়নে আমাদের উদ্যোগী হতে হবে।

এতক্ষণ যেসব নীতিকৌশলের কথা বললাম, তা নিরন্তর বদলে যাবে। সে জন্য দরকার হবে প্রয়োজনীয় গবেষণা ও মনিটরিং। আর দরকার হবে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করার। আশা করছি, সরকারকে এ জন্য উপযুক্ত বুদ্ধি-পরামর্শ দেওয়ার মতো জাতীয় ও ব্যক্তি খাতের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনোভেশন ল্যাবগুলো’ এগিয়ে আসবে। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক করার প্রশ্নে কোনো আপসের সুযোগ নেই।

সবাই মিলে কাজ করলে নিশ্চয় আমরা ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করব তাতে উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময় আরেক বাংলাদেশকে তুলে ধরতে সক্ষম হব। সে সময় আমরা আর আজকের মতো পাকিস্তানের মাথাপিছু আয়ের সঙ্গে আমাদের মানুষের আয়ের তুলনা করব না। আমরা তখন তুলনা করব নিজেদের অন্য সব উন্নয়নগামী দেশের সঙ্গে (যেমন—চীন, ভারত, মালয়েশিয়া ইত্যাদি)। আসুন, আমরা দ্রুত অগ্রসরমাণ সেই বাংলাদেশের জন্য একাগ্রচিত্তে কাজ করি। সব শেষে দি ইকোনমিস্টের শুরুতে উল্লিখিত প্রতিবেদনের কয়েকটি কথা উদ্ধৃতি করতে চাই :

‘…বাংলাদেশ তার অতীতের ছাইভস্ম থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে এবং অগ্রসরমাণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এক সফল দেশে রূপান্তরিত হতে পেরেছে। ’