গল্পে গল্পে ওরা শেখায় শব্দদূষণের ক্ষতি

সকাল নয়টা। রাজধানীর ব্যস্ততম সড়ক মিরপুর রোডে দাঁড়িয়ে আছে কয়েক’শ গাড়ি। মিনিট বিশেক কেটে গেলেও ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়ার লক্ষণ নেই। একদিকে অফিসগামী মানুষের অফিস যাবার তাড়া। অন্যদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের যাবার তাড়া। এছাড়া রোগীদের অবস্থা আরো করুন। তার সাথে যোগ হয়েছে একের পর এক গাড়ির ক্রমাগত অযথা হর্ণ বাজানোর মহড়া। কান ঝালাফালা করা এক পরিস্থিতি।

এরই মধ্যে একদল তরুণকে দেখা গেল, দলে দলে ভাগ হয়ে গাড়ি চালকদের সাথে গল্প করছে। সবার হাতে প্ল্যাকার্ড। খিট খিটে মেজাজের চালকও যেন তাদের গল্প মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। ভুলেই গেছেন অযথা হর্ণ বাজানোর কথা। একটু এগিয়ে গিয়ে জানা গেল, এরা সবাই সেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আর্থকেয়ার ক্লাব’ এর সদস্য। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যলয়সহ নানা পেশাজীবী তরুণদের নিয়ে শব্দ দূষণমুক্ত একটি সুন্দর ধরনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে সংগঠনটি। ক্লাবের সদস্যরা রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে ভাগ হয়ে পরিবহন চালকদের সাথে কথা বলে। তাদেরকে নানাভাবে উত্সাহিত করে অযথা হর্ণ না বাজাতে। গল্পে গল্পে তারা চালক, হেল্পার, কন্ডাক্টর, মেকানিকদের সামনে ফুটিয়ে তোলে শব্দদূষনের ভয়াবহতা।

শব্দ দূষণমুক্ত একটি সুন্দর ধরনী গড়ার প্রত্যয় নিয়ে ‘আর্থকেয়ার ক্লাব’ এর শুরুটা চলতি বছরে ৪ সেপ্টেম্বর থেকে। দুই তরুণ রাজীব চন্দ্র পাল এবং আশরাফুল আলমের হাত ধরেই ক্লাবের জন্ম। পরবর্তীতে তাদের সাথে যোগ দেন ফাইয়াজ, ফয়সাল, ইকবাল, রানা, তুষার, মনজুরুলসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একদল তরুণ। ক্লাবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোঃ আশরাফুল আলম বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমরা এ কাজে উত্সাহিত হয়েছি। আমরা লক্ষ্য করলাম, শব্দদূষণ নিয়ে নানা সামাজিক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়। বিভিন্ন সভা, সেমিনার করা হয়। কিন্তু চালকরা আদৌ কি মনে রাখে আমাদের ওই কথাগুলো? এজন্য আমরা একটু ভিন্নভাবে শুরু করেছি। একজন চালকের পাশে বসে যখন গল্পে গল্পে শব্দদূষনের ভয়াভহতার কথা তুলে ধরি, ইমোশোনালি বোঝানোর চেষ্টা করি তখন চালকরা মন দিয়ে আমাদের কথা শোনেন। যখন বলি, আপনার পরিবারের সদস্যরা শব্দদূষনের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তখন তারাও বিষয়টি মন থেকে উপলব্ধি করে। আমরা চালকদের শপথ করার মাধ্যমে সচেতন করি। দেখা যাবে, ওই চালক পরবর্তীতে অযথা হর্ণ বাজাতে গেলেই তার শপথের কথা মনে পড়বে।

এই তরুণ আরো বলেন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ইউনিসেফের গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে প্রায় ৩০টি জটিল রোগের অন্যতম প্রধান উত্স শব্দ দূষণ। প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা শব্দের মাত্রা নিকট ভবিষ্যতে একটি অসুস্থ প্রজন্মের জন্ম দিতে পারে।

ক্লাবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সমন্বয়কারী রাজীব চন্দ্র পাল বলেন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রচারণা চালানো বিকল্প নাই। আর প্রচারণাটা হওয়া চাই গল্পে গল্পে, তত্ত্বকথায় নয়। সেই লক্ষ্যেই কাজ করে চলেছে ‘আর্থকেয়ার ক্লাব’। আমরা যখন চালকদের সাথে কথা বলি তখন তারাও আমাদের কাছে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন। অধিকাংশ চালকের একই অভিযোগ, অনেক পথচারী কানে হেডফোন লাগিয়ে কিংবা ফোনটি কানে ধরে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হন। তখন আমাদের বাধ্য হয়ে হর্ণ বাজাতে হয়। তাই তাদেরও সচেতন করুন। শুধু আমরাই নই, পথচারীদেরও সচেতন হওয়া দরকার।