গড়ে উঠেছে ১৬ লাখ ৬৯ হাজার খামার

একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প

একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের সুবিধা নিয়ে পল্লী অঞ্চলে গড়ে তোলা হয়েছে ১৬ লাখ ৬৯ হাজার ক্ষুদ্র খামার। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ হয়েছে ১ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা। ৪৮৫ উপজেলার ৪ হাজার ৫০৩ ইউনিয়নে গড়ে তোলা হয়েছে ৪০ হাজার ৫২৭টি গ্রাম সমিতি। এসব সমিতির আওতায় প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছে ২২ লাখের বেশি পরিবার। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বেসরকারি একটি সংস্থার তত্ত্বাবধানে সম্প্রতি প্রকল্পটির নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। পরিবীক্ষণ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ৮ বিভাগের ১৬ জেলার ৩২ ইউনিয়নের ৩২টি গ্রাম সমিতি থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। জেলাগুলো হলো বরিশাল, ভোলা, ফেনী, কক্সবাজার, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, খুলনা, বাগেরহাট, শেরপুর, নেত্রকোনা, বগুড়া, নওগাঁ, রংপুর, নীলফামারী, সিলেট ও মৌলভীবাজার।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির আওতায় সুবিধাভোগী নির্বাচনে বেশকিছু অঞ্চলে সচ্ছল ও বিত্তবানদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা ঋণ নেয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য কর্মকা-ে প্রভাব খাটাচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে গ্রামে সব দরিদ্র পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। উপকারভোগী নির্বাচনে প্রথম পর্যায়ে ইউএনও, চেয়ারম্যান, মেম্বাররা দরিদ্র পরিবারের তালিকা তৈরি করেছেন। সঞ্চয়ের জন্য মাসে যে ২০০ টাকা জমা দিতে হয়, তা অনেকেরই পক্ষে দেয়া সম্ভব ছিল না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের জুলাই থেকে গেল বছরের জুন পর্যন্ত ৭ বছরে প্রকল্পের আওতায় বেশকিছু পরিবারের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করছে। আবার প্রকল্পের কিছু দুর্বলতা পরিবারগুলোর উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার গতিকে মন্থর করছে। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক আকবর হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি আইএমইডির প্রতিবেদনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প চালু করে। ২০১৪ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্যে ১ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ব্যয় ধরে প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। ৪৮২ উপজেলার ১ হাজার ৯২৮ ইউনিয়নের ৯ হাজার ৬৪০টি গ্রামে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত ছিল। এর আওতায় ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৪০০ পরিবারকে সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়।
২০১০-১১ অর্থবছরে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৬০ পরিবারে প্রকল্প থেকে সম্পদ হস্তান্তর করা হয়। এ সম্পদের মধ্যে গরু, ঢেউটিন, হাঁস-মুরগি, গাছের চারা ও শাকসবজির বীজ বিতরণের কর্মসূচি ছিল। একই গ্রাম সংগঠনের মধ্যে কিছু পরিবার গরু, কিছু পরিবার ঢেউটিন এবং কিছু পরিবারের মধ্যে হাঁস-মুরগি, গাছের চারা ও শাকসবজির বীজ বিতরণ করায় সদস্যদের মধ্যে প্রাপ্তির অসামঞ্জস্যতার কারণে কিছুটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। প্রকল্প কার্যক্রমে বিশেষত সঞ্চয় দিতে সদস্যরা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন। এসব বিবেচনায় প্রকল্প বাস্তবায়নে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণের লক্ষ্যে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়।
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ৩ হাজার ১৬২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয় ধরে প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী অনুমোদন দেয়া হয়। ৪৮৫ উপজেলার ৪ হাজার ৫০৩ ইউনিয়নের ৪০ হাজার ৫২৭টি গ্রামে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়। বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পে উপকারভোগী খানার সংখ্যা নিধারণ করা হয় ১০ লাখ ৪৩ হাজার ২৮০। প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনীর আওতায় দেশব্যাপী ৬০ হাজার ৫১৫টি গ্রামের ৩৬ লাখ খানার ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষের দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য ২০২০ সাল মেয়াদকালে ৮ হাজার ১০ কোটি টাকার বিশেষ সরকারি বরাদ্দ রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪ লাখ ১২ হাজার ৬৯৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই কৃষিতে জড়িত। তাদের বড় অংশ গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন করছেন। অধিকাংশ জানিয়েছেন, তাদের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো।
নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে গ্রাম সমিতির মাধ্যমে সংগঠিতকরণ, সঞ্চয়ে উৎসাহ দান, সদস্য সঞ্চয়ের বিপরীতে সমপরিমাণ অর্থ বোনাস, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের মানবসত্তাকে শানিতকরণ, অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালনায় পুঁজি গঠনে সহায়তা, আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার কার্যক্রমসহ বহুমুখী কর্মকা- পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ কার্যক্রমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মাঠ প্রশাসন, বিআরডিবি, প্রকল্পে নিয়োগকৃত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধিরা সরাসরি নিয়োজিত রয়েছেন। ৬৪ জেলার ৪৮৫ উপজেলায় ৪ হাজার ৫০৩ ইউনিয়নের ৪০ হাজার ৫২৭টি ওয়ার্ডে এ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রতি ওয়ার্ডের একটি গ্রামে ৬০টি গরিব খানার সমন্বয়ে একটি গ্রাম উন্নয়ন সমিতি গঠন করে তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। আইএমইডির প্রতিবেদনে কিছু দুর্বলতার কথা উল্লেখ করলেও এর অনেক সফলতার বিষয় উঠে এসেছে। প্রকল্পের আওতায় দেশের ২৫ লাখ দরিদ্র পরিবারকে এ কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রাম সমিতির বেশিরভাগ সদস্য ঋণ পেলেও অধিকাংশই সেক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুুখি হয়েছেন। ঋণ পাওয়ার জন্য সদস্যদের কমপক্ষে দুই থেকে তিনবার উপজেলা অফিসে যেতে হয়। দল ছাড়া একা আবেদন করে কেউ ঋণের টাকা পাচ্ছেন না। ঘূর্ণায়মান তহবিলের অর্থ ব্যবহার করে সদস্যরা বিভিন্ন আয়বর্ধনমূলক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করছেন। তবে এ তহবিলের সমস্যা হচ্ছে অনেকেই ঋণ নিয়ে সেই ঋণ ফেরত দিতে বিলম্ব করছেন। এ তহবিলের ঋণের পরিমাণ কম, এজন্য সদস্যরা যৌথ বা বড় ধরনের খামার গড়ে তুলতে পারেন না।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পের ১০টি কম্পোনেন্টের বেশিরভাগ কম্পোনেন্টেই ‘উল্লেখযোগ্য পরিমাণ’ কাজ হচ্ছে। তবে সবক’টিতে সমান গতিতে কাজ হচ্ছে না। গ্রাম উন্নয়ন সমিতি ছাড়াও সঞ্চয় ও পুঁজি গঠন, ঋণ ও ঘূর্ণায়মান তহবিল এবং আয়বর্ধনমূলক কর্মকা-ে সবচেয়ে বেশি কাজ হয়েছে। তবে যেসব কম্পোনেন্টে বেশি কাজ হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রেও শতভাগ লক্ষ্য পূরণ সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ই-মার্কেটিং ছাড়া সমবায়ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলক কাজ কম হয়েছে।