সাফল্যের নাম বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি পাকিস্তানের চেয়ে বেশি এমন একটি ইতিবাচক তথ্য তুলে ধরেছে লন্ডনের অর্থনীতিভিত্তিক পত্রিকা ইকোনমিস্ট। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে পাকিস্তানকে ক্রমান্বয়ে পেছনে ফেলছে এটি এখন একটি বাস্তবতার নাম। ইকোনমিস্ট সে সত্যটি সামনে এনেছে নতুন অবয়বে। স্মরণ করিয়ে দিয়েছে স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশের জিডিপি ছিল পাকিস্তানের চেয়ে অনেক কম। কিন্তু কালক্রমে তা বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত লন্ডনের ইকোনমিস্ট পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজারের বিনিময় হার হিসাবে ডলারের মূল্যমানে ৩০ জুন সমাপ্ত গত অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী এখন বাংলাদেশের জিডিপি ১৫৩৮ মার্কিন ডলার আর একই সময়ে পাকিস্তানের জিডিপি ১৪৭০ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ দুই দেশের জিডিপির পার্থক্য ৬৮ ডলার। বাংলাদেশের টাকায় যার পরিমাণ সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার চেয়েও বেশি। ইকোনমিস্ট বলেছে, বাংলাদেশে গত ১০ বছরে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির গড় ছিল ছয় শতাংশ। আর শেষ দুই বছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে সাত শতাংশে পৌঁছেছে। ১৯৭১ সালে এ দেশের জš§লগ্নে জিডিপিতে শিল্পায়নের অবদান ছিল মাত্র ছয় থেকে সাত শতাংশ। এখন বাংলাদেশের জিডিপিতে শিল্পায়নের অবদান ২৯ শতাংশ। একটা সময় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে সংকট দেখা দিলেও এখন দেশটি ভালো অবস্থান তৈরি করেছে।
উল্লেখ্য, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণেও বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছে। পাকিস্তান গত ২৫ আগস্ট যে সর্বশেষ শুমারির প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে বলা হয়, দেশটির জনসংখ্যা ২০ কোটি ৭৮ লাখের মতো, যা আগের শুমারির চেয়ে ৯০ লাখ বেশি। জনসংখ্যায় পাকিস্তান এখন পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম দেশ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি। জš§শাসনের কারণে বাংলাদেশের জনসংখ্যা এখন ১৭ কোটিতে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হয়েছে। এ সংখ্যা পাকিস্তানের জনসংখ্যার চেয়ে প্রায় চার কোটি কম। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়। লাখ লাখ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়। যাতায়াত ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। বলা যায়, ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে এগোতে হয়েছে বাংলাদেশকে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রূপকথার ফিনিক্স পাখির মতো সক্ষমতা দেখিয়েছে। ভস্মের মধ্য থেকে উড়াল দেয়ার কৃতিত্বের অধিকারী বাংলাদেশের মানুষ। যে বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করা হতো তলাবিহীন ঝুড়ি বলে সে বাংলাদেশের পরিচয় এখন অপার সম্ভাবনার দেশ হিসেবে। বাংলাদেশের এ উত্থান সম্ভব হয়েছে এ দেশের পরিশ্রমী মানুষের কারণে। এ দেশের কৃষক শ্রমিক ও কর্মজীবীদের দেশপ্রেমের কাছে হার মেনেছে সব সীমাবদ্ধতা।
অফুরন্ত সম্ভাবনার অপর নাম বাংলাদেশ। এ দেশের রয়েছে অমিত সম্ভাবনাময় ষোলো কোটি মানুষের বত্রিশ কোটি হাত। ষোলো কোটি মানুষ বাংলাদেশের জন্য অভিশাপ নয়, আশীর্বাদ। কেননা আবহমান কাল থেকেই এ দেশের মানুষ কর্মনিষ্ঠ, পরিশ্রমী। অচিরেই এ দেশ পরিণত হবে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ পোশাক, জুতা, ওষুধ, সিরামিক ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানিকারক দেশে। সৃষ্টিকর্তার অপার কৃপায় ধন্য এদেশে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর মাটি আর দূষণমুক্ত পানি। গ্যাস ও কয়লার প্রাচুর্যের পাশাপাশি এ দেশে বছরে তিনবার ফসল উৎপাদিত হয়। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইতোমধ্যেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে, এ দেশে এখন আর কেউ না খেয়ে মরে না।
কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশের দরিদ্র, শ্রমজীবী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীনির্ভর প্রবাসী আয়কে পুঁজি করে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ঘামঝরা শ্রমের ফসল পোশাকশিল্প উন্নয়নের ধারাকে করেছে আরো বেগবান। দেশে যেভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, অর্থনীতি এগিয়েছে, যেভাবে বিশ্বমন্দা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলা করেছে তাতেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের মানুষ অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী। এক সময়ের অচেনা বাংলাদেশ এখন বিশ্বব্যাপী এক বিস্ময়ের নাম। উন্নয়ন নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করা মানুষদের কপালে ভাঁজ ফেলে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও সম্ভাবনার দিগন্তে সাফল্যের পতাকা উড়িয়ে দেশ অব্যাহত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৪৫টি দেশ সম্পর্কে প্রকাশিতব্য মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে তরুণদের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের ৪৯ শতাংশ মানুষের বয়স ২৪ বছর কিংবা তার নিচে। দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৫৬ লাখ বা মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক এই অবস্থান বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে। ইউএনডিপি বলছে, এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আরো বেশি কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে আর বিনিয়োগ বাড়াতে হবে উৎপাদনশীল খাতে। ইউএনডিপির পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনসংখ্যা ১০ কোটি ৫৬ লাখ। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশই কর্মক্ষম। আগামী ১৫ বছরে অর্থাৎ ২০৩০ সাল নাগাদ কর্মক্ষম জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১২ কোটি ৯৮ লাখে, যা হবে মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ। দেশে বয়স্ক বা ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ ৭ শতাংশ। ২০৩০ ও ২০৫০ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে যথাক্রমে ১২ ও ২২ শতাংশে।
উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদদের মতে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে তরুণ জনগোষ্ঠীকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে। বাংলাদেশের সামনেও সোনালি ভবিষ্যৎ হাতছানি দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফল হবে কিনা তা নির্ভর করছে সৃষ্ট সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে তার ওপর। বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তে সমস্যা হলো জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশ বেকার। যুব জনগোষ্ঠীর একটি অংশ অভিভাবকদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। যুবসমাজের কর্মসংস্থানের যথাযথ পদক্ষেপ যেমন দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে তেমন এ ক্ষেত্রের ব্যর্থতা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। দেশের সোনালি ভবিষ্যতের স্বার্থেই কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে গতি আনার উদ্যোগ নিতে হবে।