অবশেষে আলোর মুখ দেখছে দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার-গুনদুম রেল প্রকল্প

অবশেষে আলোর মুখ দেখছে দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমারের কাছে গুনদুম পর্যন্ত ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প। ১৮০৩৪ কোটি টাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হচ্ছে। গতকাল শনিবার রেলভবনে এ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এসময় রেলপথ মন্ত্রী মোঃ মুজিবুল হক বলেন, বর্তমান সরকার রেল খাতের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। এ জন্যই বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার ফলে আমরা নতুন প্রকল্প গ্রহন করতে পারছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বড় বড় প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, প্রকল্পটি দুটি ভাগে ভাগ করে সম্পাদন করা হচ্ছে। প্রথম ভাগ দোহাজারী থেকে চকরিয়া পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করবে যৌথভাবে চায়নার সিআরইসি ও বাংলাদেশের তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানী। প্রথমভাগের চুক্তিমূল্য ২৬৮৭ কোটি ৯৯ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। দ্বিতীয় ভাগে চকরিয়া থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করবে যৌথভাবে চায়নার সিসিইসিসি ও বাংলাদেশের ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিঃ। এই অংশের চুক্তি মুল্য ৩৫০২ কোটি ৫ লাখ ২ হাজার টাকা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ১০২ কি.মি. নতুন ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ করা হবে। এতে ১৮৪ টি ছোট বড় রেলসেতু, ৯ টি স্টেশন বিল্ডিং, প্লাটফরম ও সেড নির্মান করা হবে। এছাড়াও সমুদ্রের ঝিনুকের আদলে কক্সবাজারে একটি আইকনিক স্টেশন বিল্ডিং বানানো হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডরের সঙ্গে যুক্ত হবে বাংলাদেশ। একই সাথে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের পর্যটন সুবিধা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১৮৯০ সালে মিয়ানমার রেলওয়ে চট্টগ্রাম হতে রামু এবং কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমার পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের জন্য সার্ভে করেছিল। সেই প্রেক্ষিতে ১৯০৮ থেকে ১৯০৯ সালের মধ্যে মিয়ানমার রেলওয়ে আরও বিশদ সার্ভে পরিচালনা করে। চট্টগ্রামের সঙ্গে আকিয়াবের (মিয়ানমার) রেল যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে দোহাজারী হতে রামু হয়ে আকিয়াব পর্যন্ত ১৯১৭ সাল থেকে ১৯১৯ সালের মধ্যে পুনরায় সার্ভে করা হয়। সে মোতাবেক চট্টগ্রাম হতে দোহাজারী পর্যন্ত মিটার গেজ রেললাইন স্থাপন করা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে কক্সবাজার হতে রামু পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ১৯৫৮ সালে তখনকার পূর্ববাংলা রেলওয়ে চট্টগ্রামের দক্ষিণ দিক থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন স¤প্রসারণের জন্য সার্ভে পরিচালনা করে। যার উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রাম হতে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলওয়ে সংযোগ স্থাপন করা। জাপান রেলওয়ে টেকনিক্যাল সার্ভিস ( জেআরটিএস) ১৯৭১ সালে রেললাইনটি ট্রাফিক সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে জেআরটি ১৯৭৬-৭৭ সালে তথ্য সংগ্রহের কাজ সম্পন্ন করে। ১৯৯২ সালে ইকোনমিক এ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া এ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক কমিশন অধিবেশনে সম্মতিপ্রাপ্ত এশিয়ান ল্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট নামের প্রকল্পের আওতায় ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের তিনটি ইউরো-এশিয়া সংযোগ বোর্ডের মধ্যে সাউদার্ন কোরিডর অন্যতম রুট। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ৬ জুলাই দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমারের কাছে গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন মিটার গেজ নির্মাণের জন্য এক হাজার ৮৫২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে (এর মধ্যে সরকারী তহবিলের ৬৭০ কোটি ৭ লাখ এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে এক হাজার ১৮২ কোটি ২৮ লাখ টাকা) একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন দেয়। সে সময় এটি বাস্তবায়নের কথা ছিল ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে। কিন্তু পরবর্তীতে উন্নয়নসহযোগী সংস্থা না পাওয়ায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ আটকে ছিল। ২০১৪ সালে ৯ সেপ্টেম্বর একনেক বৈঠকে সিঙ্গেল লাইন ট্র্যাককে মিটারগেজের পরিবর্তে ডুয়েলগেজ ট্র্যাকে নির্মাণের নির্দেশনা দেয়া হয়। ওই বছরই প্রধানমন্ত্রী রেলপথ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় এ প্রকল্পের মাধ্যমে সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ এবং নতুন রেললাইন নির্মাণের সময় ভবিষ্যতে ডাবল লাইন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমির সংস্থান রেখে ভূমি অধিগ্রহণের নির্দেশনা দেন। সে অনুযায়ী প্রকল্পটি সংশোধন করে পুনরায় অনুমোদনের জন্য একনেক উপস্থাপন করা হয়। গতকাল দুই ভাগের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশের পক্ষে প্রকল্প পরিচালক মোঃ মফিজুর রহমান ও চায়নার সিআরইসি এর প্রতিনিধি ঝং গুয়াংজু , দ্বিতীয় ধাপে সিসিইসিসি এর প্রেসিডেন্ট ঝাউ ডায়ালং। এশিয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে মোট ১৮০৩৪ কোটি টাকায় প্রকল্পটি নির্মিত হচ্ছে। এর চুক্তির মেয়াদ ৩ বছর।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মোঃ আমজাদ হোসেনসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মোঃ মোফাজ্জেল হোসেন সভাপতিত্ব করেন।