বিশ্ব রাজনীতিতে শান্তির মডেল শেখ হাসিনা

শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন মিয়ানমার সেনাবাহিনী যখন হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যা করছে; তখন পাশের দেশের নেতা হয়ে সেই নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের প্রতি এই দরদী মনোভাবের পরিচয় দেয়ায় আবার আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আলোচিত হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের এই মানবীয় গুণাবলি সত্যিই বিশ্ব শান্তির মডেল। তিনি দৃঢ় নেতৃত্বে দেশকে যেমন এগিয়ে নিচ্ছেন; তেমনি বিশ্বদরবারেও দেশের ভাবমর্যাদা করছেন উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর। ১৯ বছর আগে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি করে ইতিহাস রচনা করেছেন; ছিটমহল বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়ন করে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন; এখন রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেকে বিশ্বের মানবতাবাদী রাষ্ট্রনায়কের কাতারে নিয়ে গেলেন। রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের প্রতি সহানুভ‚তিশীল আচরণ তাঁকে বিশ্ব রাজনীতিতে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বিশ্বের অবহেলিত যাদের দেখার কেউ নেই; তাদের জন্য যেন রয়েছেন শেখ হাসিনা। মানবদরদী এই নেত্রী নিজেকে ধীরে ধীরে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন যা ছোঁয়া অন্য নেতাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। সীমিত সাধ্যের মধ্যেও শেখ হাসিনা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছেন। তাদের থাকা, নিরাপত্তা ও খাবার নিশ্চিত করেছেন। অথচ রোহিঙ্গাদের চাপ বহন করা বাংলাদেশের জন্য সত্যিই চ্যালেঞ্জ। তারপর রোহিঙ্গা সমস্যাকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক দৃষ্টিতে দেখছেন; এ বার্তা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। তাঁর শান্তিবাদের দর্শন, চেতনার মানবতাবাদী পদক্ষেপ সারা বিশ্বে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। উখিয়া সফরে গিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিশুদের পরম মমতায় জড়িয়ে ধরে শেখ হাসিনা যে দৃশ্যের অবতারণা করেন; তা কোটি কোটি মানুষের চোখ ভিজিয়ে দিয়েছে। দেশহারা শরণার্থীদের দুর্দশা দেখে ব্যথিত হয়ে তাদের জড়িয়ে ধরে চোখের পানি ফেলা তাঁর পক্ষেই এটা সম্ভব। এ দৃশ্য দেখেই বিশ্বের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাশীল বিজ্ঞানীরা বিশ্ব দরবারে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থান অনেক ওপরে বলে মন্তব্য করছেন।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের খাদ্য-আশ্রয় দেয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায় আমি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে আহ্বান জানাচ্ছি। তবে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদের যা করা দরকার আমরা সেটি করব। মিয়ানমারে যেভাবে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে তাতে কি তাদের বিবেককে নাড়া দেয় না? একজনের ভুলে এভাবে লাখ লাখ মানুষ ঘরহারা হচ্ছে। আমরা শান্তি চাই। আমরা ১৬ কোটি মানুষের দেশ। সবার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছি। সেখানে আরো ২/৫/৭ লাখ মানুষকেও খেতে দিতে পারব। তিনি কক্সবাজারের স্থানীয় নাগরিক ও দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, এখন যারা যুবক তারা হয়তো মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি। কিন্তু আমরা দেখেছি। তাই রোহিঙ্গাদের যেন কোনো কষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি এই আহ্বান জানিয়েছেন যে, তারা যেন মিয়ানমারের নেতা সুচির ওপর চাপ দিয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমদের তাদের নিজ দেশে নিতে বাধ্য হয়। জাতিসংঘের অধিবেশনে তিনি এ ইস্যুকে প্রাধান্য দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিভীষিকাময় দৃশ্য দেখে শেখ হাসিনা বলেন, স্বজন হারানোর বেদনা আমরা বুঝি। ১৯৭৫-এ বাবা-মা হারিয়ে আমাদেরও রিফিউজি হিসেবে বিদেশে থাকতে হয়েছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন আমাদের ওপর হামলা করে সে সময় আমরা ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। দেশ হারানো রোহিঙ্গা নারী-শিশু-বৃদ্ধরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা বলতে থাকেন- আমাদের দেশের (মিয়ানমার) প্রধানমন্ত্রী আমাদের চায় না। ভিনদেশী (বাংলাদেশ) প্রধানমন্ত্রী আমাদের দেখতে এসেছেন। আল্লাহ তার মঙ্গল করুন।’
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশার প্রতি সহমর্মী হয়ে ছোট বোন শেখ রেহানার জন্মদিনে আনুষ্ঠানিকতা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ রেহানার জন্মদিন ছিল গতকাল বুধবার। ১৯৫৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয়া শেখ রেহানার বয়স বাষট্টি বছর পূর্ণ হলো। প্রতি বছর জন্মদিন পালন করলেও এবার মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি সহমর্মী হয়ে জন্মদিনে কোনা আনুষ্ঠানিকতা করা হয়নি। জন্মদিন উপলক্ষে যে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়; সেগুলো এতিমখানায় পাঠানো হয়েছে। গণমানুষের নেত্রী শেখ হাসিনা হাজারো ব্যস্ততার মধ্যেই দেশহীন রোহিঙ্গাদের দেখতে ছুটে গেছেন। ঢাকায় ফেরার সময় সেখানে রেখে এসেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে। কারণ শরণার্থীদের যেন ভালোভাবে দেখভাল করা হয়। শেখ হাসিনা মানুষের দুঃখকে হৃদয় দিয়ে ধারণ করেন; মানুষের কষ্ট যন্ত্রণার সঙ্গে নিজেকে একাকার করে ফেলেন। দেশের কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীদের কেউ অসুস্থ হলে তার চিকিৎসার দায়িত্বভার অবলীলায় গ্রহণ করেন। তাদের চিকিৎসার সব খরচ বহন করেন। যার ঘর নেই তাদের ঘর তুলে দেন। দেশের কোথাও ঘূর্ণিঝড়, বন্যা হলেই ছুটে যান দুর্গতদের পাশে। এ জন্য তিনি দেশের মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেই তিনি ঘোষণা দেন কেউ না খেয়ে মরবে না।
এসব কারণেই বিশ্ব নেতৃত্বে অনেক এগিয়ে গেছেন শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তার গুরুত্ব এখন অপরিসীম। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়’ শ্লোগান নিয়ে পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে বিশ্বের দেশে দেশে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছেন। বিশ্বের যে ক’জন নেতাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গুরুত্ব দেয় শেখ হাসিনা তাদের মধ্যে অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন অ্যাফেয়ার্স সাময়িকীতে মানবজাতির উন্নয়ন ও কল্যাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মৌলিক চিন্তা, গবেষণা, উদ্ভাবন, সৃষ্টি এবং দৃষ্টি আকর্ষণমূলক কাজের জন্য সারাবিশ্ব থেকে যে একশ’ শীর্ষ ব্যক্তির তালিকা করা হয় সেখানে শেখ হাসিনার অবস্থান ১৩তম। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিউ ইয়র্ক টাইমস সাময়িকীর জরিপে বিশ্বের সেরা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর নারী নেতৃত্বের ১২ জনের তালিকা করা হয়েছিল ২০১১ সালে। ওই তালিকায় তার অবস্থান হলো সপ্তম। আবার ২০১০ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস সাময়িকীর অনলাইন জরিপে তিনি বিশ্বের সেরা ১০ ক্ষমতাধর নারীর মধ্যে ষষ্ঠ স্থানে ছিলেন শেখ হাসিনা। ২০১৫ সালে বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় শেখ হাসিনার অবস্থান ৫৯তম। ২০১৪ সালে এই তালিকায় শেখ হাসিনার অবস্থান ছিল ৪৭তম। ২০১০ সালের ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসের শতবর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা সিএনএন বিশ্বের ক্ষমতাধর ৮ এশীয় নারীর তালিকা প্রকাশ করে। ওই তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে ছিলেন শেখ হাসিনা। আমরা যদি শেখ হাসিনার সাফল্যের দিকে দেখি তাহলে দেখব তিনি যোগ্য নেতৃত্বের জন্যই অনেকগুলো আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রায় ৩০টি পুরস্কার ও পদক অর্জন করেছেন। পত্রিকায় খবর বের হয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবিকতা এবং শান্তির অনন্য নজির স্থাপনের জন্য শেখ হাসিনাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করার প্রস্তাব করছেন বিশ্বের খ্যাতিমান চিন্তাবিদরা। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধীনে পরিচালিত হয় অক্সফোর্ড নেটওয়ার্ক অব পিস স্টাডিজ (অক্সপিস)। অক্সপিসের দু’জন শিক্ষাবিদ ড. লিজ কারমাইকেল এবং ড. অ্যান্ড্রু গোসলার মনে করেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যেভাবে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন, তা সারাবিশ্বের জন্য এক অনুকরণীয় বার্তা। তাদের মতে, ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো যখন শরণার্থী নিয়ে নানা সমস্যায় জর্জরিত; তখন বাংলাদেশ দেখালো কিভাবে এই সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়। তারা দু’জনই শেখ হাসিনাকে ‘মানবিক বিশ্বের প্রধান নেতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আবার কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস স্টাডিজ বিভাগের তিন অধ্যাপক যৌথভাবে শেখ হাসিনাকে বিশ্ব শান্তির দূত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ড. অলডো সিভিকো, ড. দীপালী মুখোপাধ্যায় এবং ড. জুডিথ ম্যাটলফ যৌথভাবে বলেছেন, নোবেল শান্তি জয়ী অং সান সুচি আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যক্রম পাশপাশি মূল্যায়ন করলেই বোঝা যায় বিশ্ব শান্তির নেতা কে। তাদের মতে, সুচি মানবতার চরম সীমা লঙ্ঘনকারী বার্মার সামরিক জান্তাদের রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর চালানো পৈশাচিকতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার চরম ঝুঁকির মধ্যেও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিচ্ছেন। তাদের মতে, শেখ হাসিনা শান্তির নতুন বার্তা দিয়েছেন গোটা বিশ্বকে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ভার্ড ডিভাইনিটি স্কুলের ডিন ডেভিড এন হেম্পটন মনে করেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ শান্তির নতুন মাত্রা দিয়েছে। কেবল শান্তির স্বার্থে দেশটি চরম অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়েছে। এতগুলো শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়ার জন্য মানবিক হৃদয় লাগে। জার্মানি যা করতে পারেনি; শেখ হাসিনা তা করে দেখিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ইন ক্যানবেরার অধীনে পরিচালিত ‘পিস অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট’। এই ইনস্টিটিউটের প্রধান ড. হেনরিক উরডাল মনে করেন, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের জন্য শেখ হাসিনাকেই বিশ্ব শান্তির নেতার মর্যাদা দেয়া উচিত। রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নিপীড়নের প্রেক্ষাপটে গত এক সপ্তাহে স্ব-স্ব দেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেমিনার এবং সভায় তারা এসব মন্তব্য করেছেন। বিশ্ববরেণ্য এই ব্যক্তিত্বদের মতামতে বোঝা যায় বিশ্ব নেতৃত্বে শেখ হাসিনার অবস্থান কোন পর্যায়ে।