নারীর ক্ষমতায়নে নতুন জীবনের বিশ্বস্বীকৃতি

বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষা ও কর্মজীবনে দিন দিন সম্মান, মর্যাদা এবং নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন। তারা শুধু গৃহকোণেই এখন তাদের কর্মকা- সীমাবদ্ধ রাখছেন না। সংসার, পরিবারের গ-ি ছাড়িয়ে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ গঠন, রাষ্ট্রপরিচালনাসহ সর্বক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। বাংলাদেশে নারীর অবস্থান, পথ চলা আর এগিয়ে যাওয়ার এই সাফল্যের গল্প এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশ ও তাদের সরকার প্রধানদের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে। বিশ্বফোরামের বিভিন্ন সম্মেলনে বাংলাদেশকে অনুসরণের পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের নারীদের এগিয়ে যাওয়ার আরও একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের গৃহীত ‘নতুন জীবন’ বা সোশ্যাল ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম প্রোজেক্ট -২ (এসআইপিপি-২) প্রকল্পকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখায় বিশ্বব্যাংক এ উন্নয়ন প্রকল্পটিকে পুরস্কৃত করেছে। এই স্বীকৃতি শুধু বাংলাদেশের নারীদের জন্য নয়, দেশের আপামর জনগণের জন্য তথা সমগ্র বাংলাদেশের জন্য গৌরবের এবং অহঙ্কারের। একই সঙ্গে এই স্বীকৃতি বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে নিঃসন্দেহে।
সারাবিশ্বে বিশ্বব্যাংকের চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এসডিএফ) পরিচালিত ‘নতুন জীবন’ বা এসআইপিপি-২ প্রকল্পটি পুরস্কৃত করার মাধ্যমে এই প্রথম বাংলাদেশে চলমান কোনো প্রকল্পকে পুরস্কৃত করল বিশ্বব্যাংক। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিস থেকে বলা হয়েছে বিশ্বে বিশ্বব্যাংকের যে কয়টি প্রকল্প চলমান তার মধ্যে এই প্রকল্পটি খুবই কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বব্যাংক প্রকল্পটিতে ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়ন করেছে। দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, সহযোগিতা, কৃষিবিষয়ক জ্ঞান সমপ্রসারণ এবং যুব কর্মসংস্থানে প্রকল্পটি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। তাই প্রকল্পটিকে ‘সাউথ এশিয়া রিজিওনাল ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ (এসএআরভিপিইউ) এ ভূষিত করা হচ্ছে। বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য বড় প্রাপ্তি, গর্বের বিষয়।
দক্ষিণ এশীয় ৩৯টি টিমের মধ্যে অ্যাওয়ার্ডের জন্য পাঁচটি দেশের ছয়টি প্রকল্পকে নির্বাচন করা হয়। সাধারণত ছয়টি বিষয় মূল্যায়ন করে বিশ্বব্যাংক এ পুরস্কার প্রদান করে। এ বিষয়গুলো হলো- ক্লায়েন্টের জন্য ফলাফল সরবরাহ; টিম ও টিমের বাইরে সহযোগিতা করা; পরিচালনা ও উদ্ভাবন; জ্ঞান সৃষ্টি, প্রয়োগ ও সমপ্রসারণ; ভঙ্গুরতা, দ্বন্দ্ব ও সন্ত্রাস মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যান কার্যকর করা। এই ছয়টি বৈশিষ্ট্যের সবক’টিতেই ‘নতুন জীবন’ প্রকল্প বিশেষ নজর কেড়েছে।
দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, রংপুর, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর ছাড়াও পাহাড় আর হাওর অধ্যুষিত সিলেট, নদী অধ্যুষিত বরিশাল, খুলনাসহ দেশের ২২টি জেলার ৮৮টি উপজেলায় এসডিএফ “নতুন জীবন লাইভলিহুড ইম্প্রুভমেন্ট প্রজেক্ট” বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ নিয়ে ৩০ লাখেরও বেশি দরিদ্র মানুষ উপকৃত হচ্ছে। উপকারভোগীদের মধ্যে ৯০ শতাংশই নারী। প্রকল্পের আওতায় ছোট ছোট রাস্তা, স্কুল, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, পয়নিষ্কাশন ও পানি সমস্যা দূর করা হচ্ছে, যুব সমাজসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ প্রাধান্য। উন্নত জীবন গঠন এবং জীবিকা নির্বাহের জন্য অংশীদারিত্বমূলক ব্যবসার সাহায্যে বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে। এই প্রকল্প গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়নের পাশাপাশি নারীর কর্তৃত্ব ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া প্রকল্পটিতে জনগণের পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধি, কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা অর্জন এবং তা কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মক্ষম যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০০০ সালে সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এসডিএফ) প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে ৮৮টি উপজেলায় এ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আওতা আরও সম্প্রসারিত করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়া হবে বলে জানা গেছে। সম্প্রসারিত প্রকল্পে আরও ৫০ লাখ যুবক-যুবতীকে স্বাবলম্বী,কর্মক্ষম ও কর্মদক্ষ করে তোলা যাবে বলে আশা করা যায়।
এ ধরনের মহতী ও কার্যকর পদক্ষেপ যত বেশি বেশি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা যাবে ততই দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের উন্নয়ন হবে। একই সঙ্গে এই বিপুল জনগোষ্ঠী দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বোঝা বা অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেবে।
তাদের উপাজর্নের মধ্য দিয়ে নিজ নিজ পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা আসবে। অপরদিকে এসব প্রকল্পের সুবিধাভোগী ও প্রশিক্ষণ নেয়া মানুষ যাতে পরবর্তীতে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সঠিকভাবে তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা প্রয়োগের সুযোগ পায় এবং তা দীর্ঘস্থীয়ী তথা টেকসই হয় সে দিকে সরকারের নীতি নির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজর রাখবে- এমন প্রত্যাশা করা যায়। পিআইডি ফিচার।