সীমান্ত গান্ধীর আশাবাদ এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ

বঙ্গবন্ধুর সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকাকালে দেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। কিন্তু ১৫ আগস্টে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে সবকিছু পাল্টে যেতে থাকে। এরপরে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর বেশকিছু উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছিল। কিন্তু ২০০১-এর নির্বাচনে জামায়াত-বিএনপি জোট ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর দেশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। পুনরায় ২০০৮-এর নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব লাভের পর থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে। এ দেশের সাধারণ মানুষ আশা করে, রোহিঙ্গা শরণার্থী স্রোত ও জঙ্গি হামলা মোকাবেলায়ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সফলতা লাভ করবে।
ড. অরুণ কুমার গোস্বামী
অহিংস চেতনায় বিশ্বাসী বাংলাদেশ একটি শান্তিবাদী দেশ। প্রতিবেশী মিয়ানমারের প্রায় ২০টি পুলিশ ক্যাম্পে ২৪ আগস্ট জঙ্গি হামলার প্রেক্ষিতে সেখানে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি তার ফলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। বিভিন্ন মাধ্যমে খবর থেকে জানা যাচ্ছে, কোনো কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় আলাদা একটি রাষ্ট্র সৃষ্টির ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের আইএসআইর জড়িত থাকার খবরও জানা যাচ্ছে। এরই মধ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্রোত বেড়েই চলেছে। এ পর্যন্ত ২ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি সমস্যা একটি অবশ্যই মানবিক আর একটি জঙ্গি সমস্যা। অন্যান্য অনেক সমস্যার পাশাপাশি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা মোকাবেলার সঙ্গে জঙ্গি সমস্যারও সমাধান প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের স্রোত ঠেকাতে সেখানে জাতিসংঘের মতো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার তত্ত্বাবধানে একাধিক নিরাপদ এলাকা (সেইফ জোন) গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এর আগে জঙ্গি হামলা প্রতিরোধে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে যৌথ টহলের প্রস্তাব দিয়েছিল বাংলাদেশ। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এর কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশে যখন পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী ও তাদের বাঙালি সহযোগীরা নির্বিচারে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগি্নসংযোগ, লুটতরাজ প্রভৃতি চালাচ্ছিল এবং এসব বর্বরতার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে (পূর্ব) বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত হয়েছিল তখন সীমান্ত গান্ধী নামে খ্যাত খান আব্দুল গাফ্ফার খান কাবুলে স্বেচ্ছা নির্বাসনে ছিলেন। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয় তখন তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ‘এই উপমহাদেশে একমাত্র বাংলাদেশেই নিখুঁত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে ও কার্যকর থাকবে।’ মহাত্মা গান্ধীর অনুসারী এবং অসাম্প্রদায়িকতা ও অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন গাফ্ফার খান। তিনি (পূর্ব) বাঙালিদের ওপর, ধর্মীয় উপনিবেশ পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক শোষণ ও নির্যাতনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। ধর্মের নামে পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে ছিল বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার জন্য ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে এখনো পাকিস্তানি মানসিকতার প্রচুর প্রভাবশালী লোক বাংলাদেশে আছে। আবার এর বিপরীতে, সংখ্যায় অত্যন্ত কম হলেও দু-একজন পাকিস্তানি আছেন যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে, অন্ততপক্ষে মনে মনে সমর্থন করছিলেন। এমন একজন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাও স্বাধীন বাংলাদেশ সম্পর্কে সীমান্ত গান্ধীর মতো প্রায় একই ধরনের আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি হচ্ছেন মেজর জেনারেল শওকত রেজা। একাত্তরের অক্টোবর মাসে পূর্বপাকিস্তানের ডিভিশন কমান্ডার মেজর জেনারেল শওকত রেজাকে ‘যুদ্ধে অনীহা প্রদর্শনের’ কারণে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। শওকত রেজা ছিলেন অকৃতদার ও সামরিক পেশায় একান্ত নিবেদিত প্রাণ। এ ছাড়া অতীব মেধাসম্পন্ন অফিসার হিসেবেও তার সুখ্যাতি ছিল। তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে যখন পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক বাঙালি নারীদের ওপর অত্যাচার, খুন, ধর্ষণ প্রভৃতি হচ্ছিল তখন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার জেনারেল নিয়াজী এগুলোকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করে ‘বাঙালি রক্তে পাঞ্জাবি রক্ত মিশিয়ে দিয়ে এদের (বাঙালিদের) জাত উন্নত করে দিতে তার সেনাবাহিনীকে আদেশ দিয়েছিলেন।’ এভাবেই প্রায় চার লাখ বাঙালি নারী পাকিস্তানি বাহিনীর লালসার শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। নিয়াজি প্রায়ই বাংলাদেশ সম্পর্কে বলতেন, ‘দিস ইজ অ্যা লো লাইং কান্ট্রি-পিপল হিয়ার আর লো অ্যান্ড দে লাই।’ পাঞ্জাবি সেনা কর্মকর্তা শওকত রেজা এগুলো মেনে নিতে পারেননি। তাই তাকে (শওকত রেজাকে) যুদ্ধ করার ‘গুরদা’ নেই বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। এ ছাড়া বাঙালিরা তাদের ন্যায্য পাওনা পাচ্ছে না সেটা অনুভব করে তিনি (শওকত রেজা) সাধারণভাবে বাঙালি অফিসারদের বিশেষ প্রশ্রয় দিতেন। পাকিস্তানের পাঞ্জাবি সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল শওকত রেজা সম্পর্কে, বাঙালি সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান বলছেন, ‘তিনি (শওকত রেজা) অনেকটা সন্ন্যাসীর মতো বাস করতেন। তার আসবাবহীন কামরাটির চারদিকে পুস্তকের অরণ্য।’ এমন একজন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা শওকত রেজা স্বাধীন বাংলাদেশ সম্পর্কে মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানের কাছে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। … অতএব অতি শিগগিরই তোমরা অর্থনৈতিক উন্নতির দিক দিয়ে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে যাবে।’
বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো পাকিস্তানি এ ধরনের মনোভাব পোষণ করলে তিনি পাকিস্তান সরকারের ও জনগণের চোখে শত্রু হিসেবেই গণ্য হয়ে থাকেন! বলা বাহুল্য, স্বাধীনতার পর যখন সীমান্ত গান্ধী ও পাঞ্জাবি মেজর জেনারেল শওকত রেজা বাংলাদেশ সম্পর্কে এসব কথা বলেছিলেন তখনও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনের কাজ তাৎপর্যপূর্ণভাবে এগিয়ে চলছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে, স্বাধীন হওয়ার চার বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অগ্রগতির পথ থামিয়ে দেয়া হয়েছিল। পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় স্বাধীনতা বিরোধীচক্র, ঘর শত্রু বিভীষণদের হাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে পরিণত করেছেন। কিন্তু শেখ হাসিনার সামনে পর্বতপ্রমাণ চ্যালেঞ্জ। তাকে হত্যার জন্য এ পর্যন্ত ১৯ বারেরও বেশি ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।
বাংলাদেশকে সত্যিকারের সোনার বাংলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার যে স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু চিরদিন লালন করতেন, তা ছিল বাস্তবসম্মত। বাংলাদেশ সম্পর্কে সীমান্ত গান্ধী ও পাঞ্জাবি মেজর জেনারেল শওকত রেজার উলি্লখিত ভবিষ্যদ্বাণী তাই প্রমাণ করে। আর এই বাস্তবসম্মত পথেই স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে এগিয়ে নিচ্ছিলেন। কিন্তু পরাজিত পাকিস্তানি এবং তাদের এদেশীয় দোসররা সেই স্বপ্ন বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় বাস্তবায়িত হতে দেয়নি। বাংলাদেশ সম্পর্কে সীমান্ত গান্ধী ও পাঞ্জাবি মেজর জেনারেল শওকত রেজার উলি্লখিত ভবিষ্যদ্বাণীর কথা জানা যায় মেজর জেনারেল মুহাম্মদ খলিলুর রহমানের (অব.) ‘পূর্বাপর ১৯৭১, পাকিস্তানি সেনা-গহ্বর থেকে দেখা’ শিরোনামের বই থেকে।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা না হলে সীমান্ত গান্ধী ও শওকত রেজার ভবিষ্যদ্বাণী অনেক আগেই বাস্তব রূপলাভ করত। কিন্তু বিলম্বে হলেও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেশ উলি্লখিত ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষ করছে। দেশরত্ন শেখ হাসিনার তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা প্রতিবেদন দ্বারা প্রমাণিত হয় যে ২০৪১ সালে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। আশাবাদ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও সুখ এ তিনটি আলাদা সূচকের ওপর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইন ও গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক পরিচালিত জরিপে দেখা যাচ্ছে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। প্রায় একই সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান বস্নুমবার্গ ২০১৬ সালের বিশ্ব অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন দেশের প্রবৃদ্ধি অর্জনের হার নিয়ে পরিচালিত গবেষণার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, অর্থনেতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে নিকট ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতির শীর্ষ দেশ চীনকে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ। সবকিছু মিলিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নত সমৃদ্ধ ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য পূরণ এখন কয়েকটি বছরের ব্যাপার মাত্র। মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান ১৯৭১ সালে রাওয়ালপিন্ডি আর্মি সদর দপ্তরে যুদ্ধ-পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজে যুক্ত থেকেছেন এবং কাছ থেকে দেখেছেন পদস্থ পাকিস্তানি জেনারেলদের। তবে ২৫ মার্চ তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক বাঙালি নিধনযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর থেকে তাকে কার্যত দাপ্তরিক কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয় এবং পরে আটক করা হয় বন্দি শিবিরে। মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান তার এই বইতে একাত্তরের পাক-বাহিনীর ভেতর মহলের অজানা বিভিন্ন দিক উদ্ঘাটিত হয়েছে। অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক যেসব কর্মকর্তা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন তাদের কয়েকজনের নাম ও মুক্তিযুদ্ধকালে তাদের বাংলাদেশবিরোধী ভূমিকা সম্পর্কে এই বই থেকে জানা যায়। যেমন এই বইয়ের ৪৩ পৃষ্ঠায় ‘পাকিস্তান-প্রেমিক বাঙালি কূটনীতিক রিয়াজ রহমান’ উপ-শিরোনামে লিখেছেন, ‘(১৯৭১-এর) জুন-জুলাই মাসের কথা। খলিলুর রহমান লিখেছেন, ‘একদিন পাকিস্তানের সংবাদপত্রগুলোয় দেখলাম বড় শিরোনামে লেখা হয়েছে’, ‘বাঙালি দুষ্কৃতকারীদের অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবেলা করে দেশপ্রেমিক বাঙালি কূটনীতিকের দিলি্ল ত্যাগ ও করাচিতে আগমন।’ ভেতরে বর্ণিত হয়েছে কীভাবে সেখানকার বাঙালি দুষ্কৃতকারীদের পরাস্ত করে করাচিমুখী প্লেনে আরোহণ করেন।’ রিয়াজ রহমান ১৯৭১ সালে দিলি্ল থেকে করাচিতে গিয়ে পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় সচিব হয়েছিলেন এবং ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিতই শুধু নয়_ ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। এভাবে খলিলুর রহমান আর একজন বাঙালি সামরিক কর্মকর্তার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি হচ্ছেন মেজর কাইয়ুম চৌধুরী, মরহুম সাবেক জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী এবং শহীদ মুনীর চৌধুরীর ভাই। মেজর কাইয়ুম চৌধুরী ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি প্রশিক্ষণে বার্লিন ছিলেন। এ সম্পর্কে আর একজন বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা মেজন মান্নান সিদ্দিকীর উদ্ধৃৃতি দিয়ে খলিলুর রহমান বলছেন, ‘…মেজর কাইয়ুম চৌধুরী বার্লিনে গেছেন একটা প্রশিক্ষণ কোর্সে। সেখানে এত সুযোগ ছিল পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার অথচ তা না করে মুনীর চৌধুরীর মতো লোকের ভাই যে ভাষণ দিয়েছে রেডিও পাকিস্তানে তা শুনে কতটা ঘেন্না ধরে গেছে তা বলার ভাষা আমার জানা নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে তো ‘মুখে বা বলে প্রকাশের অযোগ্য ভাষায়’ আখ্যায়িত করেছে, তা ছাড়া বলেছে, ‘মুজিব তুমি জানো না তোমার মতো কুলাঙ্গার এই সোনার (পাকিস্তান) দেশটির কি ক্ষতি করেছে ও করছে।’ (পৃ.৪৫) এভাবে দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর ভাই মেজর কাইয়ুম চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর মতাদর্শ সম্পর্কে কী ভয়ঙ্কর ঘৃণ্য মনোভাব পোষণ করত এবং তা বাস্তবায়নের জন্য ছিল সদা তৎপর।
বলা চলে, ১৯৭০-এর নির্বাচনে যারা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়নি বা আওয়ামী লীগের মাধ্যমে ও নেতৃত্বে গড়ে ওঠা (পূর্ব) বাঙালিদের ঐক্যের সঙ্গে স্বাধীনতার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি, উল্টো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, স্বাধীনতার পরে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে যারা অপতৎপরতায় লিপ্ত ছিল তাদের সঙ্গে এই স্বাধীনতা বিরোধীরা যুক্ত হয়েছে। ১৯৭৫-এর পরে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে একাত্তরের অনেক মুক্তিযোদ্ধা। এভাবে বাংলাদেশে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, পাকিস্তানি মনোভাবের লোকসংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। এতসব ষড়যন্ত্র ও দেশবিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে থেকেও শেখ হাসিনা দেশ পরিচালনায় সফলতা দেখাতে পেরেছেন, এটাই সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার!
সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও, শেখ হাসিনার এই সফলতার প্রতিটি স্তরে জড়িয়ে আছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সংঘটিত মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য, ‘ত্রিশ লাখ বাঙালির আত্মত্যাগ ও প্রায় চার লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি’, ‘তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ’, সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার শোকাবহ, নিষ্ঠুর ও কলঙ্কজনক হত্যাকা-, দীর্ঘ ছয় বছর ঘাতকদের হুমকির মুখে প্রবাস জীবন, স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, সংগঠন গড়ে তোলা ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির মোকাবেলা, বিডিআর বিদ্রোহ মোকাবেলা, সন্ত্রাস মোকাবেলা, ধর্মীয় জঙ্গিবাদ দমনে তৎপরতা, এবং পেট্রল বোমার কবল থেকে গণতন্ত্র রক্ষা প্রভৃতি বিপদ সঙ্কুল পথ অতিক্রম করার কঠিন-সংগ্রামের কাহিনী। এই সঙ্গে আছে একুশে আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলাসহ ১৯ বার প্রাণঘাতী হামলা এবং প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্র। এতসব ঝুঁকিবহুল পরিস্থিতি মোকাবেলার পর এখন তিনি তার তৃতীয় মেয়াদে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করে দেশ ও জনগণের জন্য অভাবনীয় উন্নতি সাধন করতে পেরেছেন। দেশের উন্নয়নের সোপানে আজ বাংলাদেশ। যার লক্ষ্য উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। দেশবাসীর মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে দেশের উন্নতির জন্য দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্ব অপরিহার্য।
বঙ্গবন্ধুর সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকাকালে দেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। কিন্তু ১৫ আগস্টে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে সবকিছু পাল্টে যেতে থাকে। এরপরে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর বেশকিছু উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছিল। কিন্তু ২০০১-এর নির্বাচনে জামায়াত-বিএনপি জোট ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর দেশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। পুনরায় ২০০৮-এর নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব লাভের পর থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে। এ দেশের সাধারণ মানুষ আশা করে, রোহিঙ্গা শরণার্থী স্রোত ও জঙ্গি হামলা মোকাবেলায়ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সফলতা লাভ করবে।