স্বাস্থ্য বীমায় আশার আলো

চিকিৎসা নাগরিকের মৌলিক অধিকার হলেও বাংলাদেশ এখনো সরকারিভাবে স্বাস্থ্য বীমা কার্যক্রম হাতে নিতে পারেনি। বিশ্বের অনেক সরকার স্বাস্থ্য বীমা চালু ও সফলভাবে পরিচালনা করছে। আমাদের দেশেও পরীক্ষামূলকভাবে তিন উপজেলায় সরকারি একটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। অনেকেরই প্রত্যাশা, সীমিত এই প্রচেষ্টাটি একদিন বড় হয়ে সারা দেশের অসহায় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে। ইতিমধ্যে বেসরকারি কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের ফলে লাখ লাখ মানুষ স্বাস্থ্য বীমার আওতায় এসেছে, যার মধ্যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মসূচিটি উল্লেখযোগ্য।

সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের আওতায় ২০১৫ সালে টাঙ্গাইলের কালিহাতী, মধুপুর ও ঘাটাইল উপজেলায় দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের জন্য পরীক্ষামূলক বিশেষ স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প নেওয়া হয়। এর আওতায় কার্ডধারীদের ৫০টি রোগের বিনা মূল্যে চিকিৎসার সুযোগ পাওয়ার কথা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজ) সিদ্ধান্তের আলোকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সবার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে সীমিতভাবে এ কার্যক্রম চালু করে। তবে প্রায় দুই বছরেও উদ্যোগটি সর্বজনীন হয়ে ওঠেনি বলে জানা যায়।

দেশে বেসরকারি পর্যায়ে প্রথম স্বাস্থ্য বীমার আওতায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা শুরু করে ১৯৭৩ সালে ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। এর আওতায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১৫ লাখ মানুষ চিকিৎসা সুবিধা নিয়েছে।

শ্রমজীবী মানুষের জন্যও প্রতিষ্ঠানটি পৃথক একটি স্বাস্থ্য বীমা চালু করেছে।গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের উদ্যোগের অভাব আছে বলেই দেশে এখনো স্বাস্থ্য বীমা সর্বজনীন আকারে চালু হচ্ছে না। আবার আমাদের মতো যেসব প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য বীমা নিয়ে কাজ করছে, আমরা একজন বিত্তবানের প্রিমিয়াম দিয়ে দুজন হতদরিদ্র মানুষের বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করছি—সেই কাজকেও আমলে নিচ্ছে না। তবে বিচ্ছিন্নভাবে হলেও দিনে দিনে দেশে স্বাস্থ্য বীমা আশা জাগানিয়া পর্যায়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। ’ এ জন্য সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ওপর তিনি জোর দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবুল হামিদ কালের কণ্ঠকে  বলেন, এখন জরুরি হয়ে উঠেছে সরকারের সিদ্ধান্ত। বেসরকারি পর্যায়ের স্বাস্থ্য বীমার বা স্বাস্থ্য নিরাপত্তা কার্যক্রমের সঙ্গে সরকারি কার্যক্রমের সমন্বয় ঘটিয়ে সারা দেশের মানুষের জন্য একটি কার্যকর স্বাস্থ্য বীমা পদ্ধতি চালু মোটেই কঠিন হবে না। যার মধ্য দিয়ে সরকারের সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়নও সহজ হয়ে উঠবে।

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবুল হামিদ আরো বলেন, দেশে প্রচলিত প্রাইভেট ইনস্যুরেন্স কম্পানিগুলোর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বীমা খুব গ্রহণযোগ না হলেও গ্রুপ স্বাস্থ্য বীমা খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বহু প্রতিষ্ঠান এই গ্রুপ হেলথ ইনস্যুরেন্স করছে। এর বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রামীণ ব্যাংক আরো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান নিজস্ব আঙ্গিকে স্বাস্থ্য বীমা চালু করেছে। অন্যদিকে কমিউনিটি পর্যায়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ আরো কয়েকটি সংস্থা কাজ করছে।

সরকারি প্রকল্প : সরকারের সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্যক্রম প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আসাদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, পাইলট প্রকল্পের আওতায় টাঙ্গাইলের তিন উপজেলায় দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী পরিবারপ্রতি একটি করে স্বাস্থ্যকার্ড দেওয়া হয়। এই পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসার প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হতে পারবে এবং ৫০টি রোগের (রোগ নির্ণয়, ওষুধ, পথ্যসহ) পূর্ণ চিকিৎসা বিনা মূল্যে পাবে। চিকিৎসাব্যয় নির্বাহের জন্য পরিবার প্রতি বার্ষিক এক হাজার টাকা প্রিমিয়াম সরকার থেকে জমা দেওয়া হবে, এর আওতায় প্রতিটি পরিবার বার্ষিক সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সুবিধা লাভ করবে। পরিকল্পনা হচ্ছে পাইলট প্রকল্প চলাকালে এই প্রিমিয়ামের অর্থসহ প্রকল্পের যাবতীয় ব্যয় স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি উন্নয়ন সেক্টরের উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে সংস্থান করা হবে। পরবর্তী সময়ে সরকারি বরাদ্দ এবং সচ্ছল পরিবারের কাছ থেকে প্রিমিয়াম সংগ্রহের মাধ্যমে কর্মসূচিটি পরিচালিত হবে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র : গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র জানায়, যে কেউ ফরম পূরণ করে তাদের স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আসতে পারে। নিবন্ধন ফি দরিদ্র মানুষের ২০, মধ্যবিত্তের ১০০ ও উচ্চবিত্তের জন্য ২০০ টাকা। এরপর নিয়মিত ‘প্রিমিয়াম’ জমা দিতে হবে। পরিমাণ দরিদ্রদের জন্য বছরে মাত্র ৭০ টাকা। মধ্যবিত্ত হলে একক ৭০০ এবং পুরো পরিবারের জন্য বছরে ১৭০০ টাকা প্রিমিয়াম দিতে হয়। উচ্চবিত্তের জনপ্রতি প্রিমিয়াম ১২০০ টাকা করে। বীমাধারীদের কার্ড দেওয়া হয়। কার্ড দিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের যেকোনো শাখার আউডডোরের চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপি, দাঁত, চোখের পরীক্ষা, টিকাসহ আরো কিছু সেবা বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের চিকিৎসকদের পরামর্শ দরকার হলে দরিদ্র শ্রেণির কার্ডধারীরা বিনা মূল্যে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির ১০০ ও উচ্চবিত্তের ২০০ টাকা ফি দিতে হবে। ইসিজি, আলট্রাসনোগ্রাম, এন্ডোসকপির মতো সেবা নিতে দরিদ্র কার্ডধারীদের টাকা লাগবে না, তবে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত কার্ডধারীদের দিতে হবে ২০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। কার্ডধারী নিম্নবিত্তের জন্য এই সংস্থার হাসপাতালে বেড ভাড়া একদম ফ্রি, মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের কার্ডধারীদের জন্য ভাড়া ২০০ টাকা। এসব সেবা কার্ড ছাড়া পাওয়া যাবে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে, তবে ফি বেশি লাগে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ধনী-গরিব সবাইকে যে একই মানের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব আমরা আমাদের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তা দেখতে পাচ্ছি। সরকার ইচ্ছা করলে দেশের সব মানুষের জন্য এমন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম নিশ্চিত করতে পারে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।

মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট সূত্র জানায়, দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, জটিল ও ব্যয়বহুল রোগের প্রাদুর্ভাব ও নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির কারণে চিকিৎসাসেবার খরচ বেড়েছে। তাই বিপদে পড়ছে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো। এ কারণেই সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার নতুন এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ছাড়া সর্বজনীন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য ‘হেলথ কেয়ার ফাইন্যানসিং স্ট্র্যাটেজি ২০১২-২০৩২’-এ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে সরকারের।

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশের প্রতিজন মানুষের বছরে স্বাস্থ্যসেবার পেছনে নিজের পকেট থেকে ব্যয় হয় ৬৩ শতাংশ টাকা। বাকিটা দাতা সংস্থা, সরকার কিংবা এনজিও থেকে সংস্থান হয়ে থাকে। তবে বেশির ভাগ মানুষের পক্ষে ৬৩ শতাংশ অর্থের জোগান দিতে গিয়ে বাড়িঘর, ভিটেমাটি, পালিত গবাদি পশুসহ বিভিন্ন স্থায়ী ও অস্থায়ী সহায়-সম্পদ বিক্রি করে দিতে হয়। পড়তে হয় দেনার কবলে। একপর্যায়ে নিঃস্ব থেকে আরো নিঃস্ব হয়ে পড়ে মানুষ। তাদের সুরক্ষার জন্যই সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্যক্রম জরুরি।