ওষুধ শিল্প পার্কে জমি পেল ২৭ প্রতিষ্ঠান

দেশের মধ্যেই ওষুধশিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় একটি শিল্প পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০৮ সালে। ঢাকা থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরত্বে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে বাউশিয়া মৌজায় ২০০ একর জমির ওপর অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) শিল্প পার্ক নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল দুই বছর পর অর্থাৎ ২০১০ সালে। কিন্তু কখনো মামলাজনিত জটিলতায় জমি অধিগ্রহণে দেরি, কখনো ওষুধশিল্প মালিকদের অনীহা, কখনো আবার নকশায় ত্রুটি ও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণে আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে এক প্রকার অন্ধকারেই ছিল এপিআই শিল্প পার্ক নির্মাণ প্রকল্পটি। তবে কিছুটা আশার কথা হলো—নানা জটিলতায় আটকে থাকা শিল্প পার্ক নির্মাণ প্রকল্পটি অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। ওষুধ শিল্প পার্কে ২৭ শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে প্লট বরাদ্দ দিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সুপারিশ ও আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ২৭ শিল্প উদ্যোক্তাকে মোট ৪১টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মামলা জটিলতায় একটি প্লট এখনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এখন জমির প্রথম কিস্তির টাকা জমা দেবে প্লট পাওয়া ২৭ শিল্প উদ্যোক্তারা। প্লটের মালিকানা বুঝে পাওয়ার পর অবকাঠামো নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শুরু করে দেবে শিল্প উদ্যোক্তারা। ২০২০ সালের মধ্যে এপিআই শিল্প-কারখানা উৎপাদনে যাওয়া শুরু করবে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বাউশিয়ায় প্রকল্প এলাকা ঘুরে বিসিক চেয়ার্যমান, ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির মহাসচিবসহ প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে বিসিক যে ২৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ৪১টি প্লট বরাদ্দ দিয়েছে, সেটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কেউ কেউ তিনটি করে প্লট পেয়েছে। কেউ পেয়েছে দুটি করে। বাকিদের একটি করে প্লট পেয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। তিনটি প্লট পাওয়া সৌভাগ্যবান হলো দুটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও অপসোনিন ফার্মা। স্কয়ার ফার্মা পেয়েছে প্রায় ১০ একর জমি। আর অপসোনিন পেয়েছে ৭ একর জমি। দুটি করে প্লট পেয়েছে জেনারেল ফার্মাসিউটিক্যালস, দি একমি ল্যাবরেটরিজ, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, গ্লোব ড্রাগস, এরিস্টোফার্মা, হেলথকেয়ার কেমিক্যালস ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। ইবনে সিনা, ডেলটা ফার্মা, ফার্মাটেকসহ অন্যরা পেয়েছে একটি করে প্লট।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, এপিআই শিল্প পার্ক ২০০৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় যখন অনুমোদন দেওয়া হয়, তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১৩ কোটি টাকা। ২০১০ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। এরপর কয়েক দফা প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ দুটিই বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ এই প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৩৩২ কোটি টাকা করা হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ২৫১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর বাকি ৮০ কোটি টাকা ওষুধ শিল্প মালিক সমিতি সিইটিপি নির্মাণে দেওয়ার কথা। নতুন করে শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করে পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় আরো ৫০ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন এখন প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করছে। এরপর প্রকল্পটি আবারও পাঠানো হবে একনেক সভায়।

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক আবদুল বাছেত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় জনবলের বেতন ভাতা, অফিস খরচসহ আরো কিছু অবকাঠামো নির্মাণের কাজ বাকি আছে। সে জন্য প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে। তা ছাড়া কারখানা উৎপাদনে আসবে ২০২০ সালে। তত দিন পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ চলবে। সে কারণে প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে। ’

তিনি বলেন, ২৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তারা ১০ বছরে ১০ কিস্তিতে টাকা জমা দিতে পারবে। প্রতি একরে জমির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে দুই কোটি ৯০ লাখ টাকা।

বর্তমানে ওষুধের কাঁচামালের ৯০ শতাংশ ভারত, চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে বাংলাদেশ। দেড় শ থেকে ২০০ ধরনের কাঁচামাল আমদানি করা হয়। শিল্প মন্ত্রণালয় বলছে, কারখানা চালু হলে ওষুধের কাঁচামাল আমদানির পেছনে বাংলাদেশের ব্যয় ৭০ শতাংশ কমবে। এল আর গ্লোবালের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮২ সালে বাংলাদেশে ওষুধশিল্পের আকার ছিল ১৭০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে শুধু বাংলাদেশে ওষুধশিল্পের বাজার ছিল ১৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার। এপিআই শিল্প পার্ক থেকে ৩৩৫টি কাঁচামাল উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশ এখন ১৩৩টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে। গত অর্থবছর ওষুধ রপ্তানি করে ১০ কোটি ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ।

বিসিক সূত্র বলছে, প্রকল্পের আওতায় সিইটিপি ও ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণ করবে ওষুধ শিল্প মালিক সমিতি। সে জন্য ৮০ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে। যদিও এখনো সিইটিপি নির্মাণের কাজই শুরু হয়নি। এটিকে এই প্রকল্পের অন্যতম দুর্বল জায়গা বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত শনিবার প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বাস্তবায়ন বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী প্রকল্প এলাকা সরেজমিন পরিদর্শনে যান। সেখানে ছিলেন বিসিক চেয়ারম্যান মোস্তাক হাসান মোহাম্মদ ইফতেখার, ওষুধ শিল্প মালিক সমিতির মহাসচিব এস এম শফিউজ্জামানসহ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সবাই। সেখানে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এস এম শফিউজ্জামান আবুল কালাম আজাদের কাছে বেশ কিছু দাবি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ওষুধ শিল্প পার্কে এখনো গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া বিসিক তাদের কাছে ১২ শতাংশ সার্ভিস চার্জ আদায় করার প্রস্তাব করেছে। সার্ভিস চার্জ বাতিল করার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে শিল্প পার্কের ভেতরে প্রস্তাবিত পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণ না করে গেটের পাশে নির্মাণ করার দাবি জানান। জবাবে আবুল কালাম আজাদ দ্রুততার সঙ্গে ওষুধ শিল্প পার্কে গ্যাস সংযোগের ব্যবস্থা করতে বিসিক চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেন। তিতাসকে দ্রুত প্রকল্প এলাকায় গ্যাসের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

প্রস্তাবিত সার্ভিস চার্জের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক আবদুল বাছেত বলেন, বিসিক আইনে নিজেদের আয়ের কথা বলা আছে। দেশের ৭৭টি শিল্পনগরী আছে। সেখানে বিসিকের কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে। তারা সেবা দেয় তাদের খরচও আছে। সে কারণে এপিআই শিল্প পার্কেও সার্ভিস চার্জ ধরা হয়েছে।