তরুণরা নিজ উদ্যোগে নেমেছে বন্যার্তদের সাহায্যে

‘মাত্র ৪ ঘণ্টার উদ্যোগে নিজেদের হাতে যা ছিল তাই দিয়ে সাধ্য অনুযায়ী শুকনা খাবার মুড়ি, চিড়া, ২ প্যাকেট বিস্কুট ও গুড় কিনে প্রতি পরিবারের জন্য ২ প্যাকেট করে প্রায় ২০০টি পরিবারকে আমরা সাহায্য করি। গিয়েছিলাম ভাঙ্গা রাস্তা পেরিয়ে বীরগঞ্জ থানার ভোগডোমা এলাকার বুড়িহাট স্কুলের আশ্রয়কেন্দ্রে। গিয়েছিলাম উত্তর সাদুল্লাপাড়া এবং কাজল নামক গ্রামে।’Ñ দিনাজপুরে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ত্রাণ তৎপরতা চালিয়ে যাওয়া শম্পা সরকার নামের এক তরুণী ফেসবুকে লিখেছেন এ কথাগুলো। আর সম্প্রতি জনগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী নিজেদের উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ করে এসেছে জামালপুরের ইসলামপুরে। বিশ্ববিদ্যালয়টির পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মশিউর রহমান আদি জনকণ্ঠকে বলেন, ‘ক্যাম্পাসে অনেক গ্রুপই ত্রাণ সংগ্রহ করছে। তবে আমরা প্রথম বর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থী মিলে নিজেদের মধ্য থেকে অল্প কিছু অর্থ সংগ্রহ করি। পরে যমুনা ট্রেনে করে জামালপুর যাওয়ার পথে ট্রেনের যাত্রীদের কাছ থেকেও কিছু অর্থ উঠানো হয়। এছাড়াও আদনান নামের এক বড় ভাই প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করে। পরে তা আমরা ইসলামপুরের বন্যার্তদের হাতে উঠিয়ে দিই।’Ñ শুধু শম্পা ও আদিরাই নয়, সাম্প্রতিক বন্যায় ত্রাণ তৎপরতায় এগিয়ে এসেছে দেশের তরুণেরা। নিজেদের উদ্যোগে ত্রাণ সংগ্রহ করে পরবর্তী সময়ে তা নিয়ে যাচ্ছে বন্যার্ত এলাকায়। নিজ নিজ উদ্যোগ ছাড়াও এগিয়ে চলছে সংগঠনভিত্তিক কার্যক্রমও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তার রেশ বয়ে চলছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর শাহবাগ ও টিএসসিতে ত্রাণ সংগ্রহের লক্ষ্যে নেমে এসেছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। টিএসসি কেন্দ্রিক সামাজিক সংগঠনগুলোও বেশ তৎপর। শাহবাগে অর্থ সংগ্রহ করতে দেখা গেছে কোন কোন বাম সংগঠনের নেতাদেরও। যানজটে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজির যাত্রীদের কাছেও তারা তুলে ধরছেন দুর্ভোগের কথা। সম্প্রতি মহাখালীর পাশর্^বর্তী বউ বাজারে দেখা গেছে, একদল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হাতে বাক্স নিয়ে বন্যার্তদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ করছে। সেখানে এক কাঁচা মরিচ বিক্রেতাকেও বানভাসিদের জন্য ১০০ টাকার একটি নোট তুলে দিতে দেখা যায়। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও এগিয়ে এসেছে। তারা তাদের টিফিনের টাকা বা হাত খরচ বাঁচিয়ে তা তুলে দিচ্ছে ত্রাণ-তহবিলে। শিক্ষার্থীদের উদ্ধুদ্ধ করতে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তাদের বেতনের একদিনের টাকা বন্যার্তদের সাহায্যে ব্যয় করার ঘোষণা দিয়েছেন। একই রকম ঘোষণা এসেছে কয়েকটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকেও।

সামাজিক দায়বদ্ধতাকে মাথায় রেখে কাজ করে এমন কয়েকটি সংগঠন এখন বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করছে। প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশন বরাবরের মতো এবারও মাঠে নেমে মঙ্গলবার কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলে ত্রাণ বিতরণ করেছে। গনির চর, চর বাঘমারা ও কালার চরে ৩৫০ জনের মধ্যে সংগঠনটি ত্রাণ বিতরণ করেছে বলে জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশনের সহ-উদ্যোক্তা পাভেল বাবু জনকণ্ঠকে বলেন, ‘বন্যার্তদের জন্য প্রচেষ্টা মূলত দুই ধাপে কাজ করছে। বন্যার সময়ে ত্রাণ বিতরণ ও বন্যা পরবর্তী সময়ে মেডিক্যাল ক্যাম্প। প্রথম ধাপের কাজ হিসেবে মঙ্গলবার কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের তিনটি চরে ৩০০ পরিবারের মধ্যে ত্রাণ দেয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু হবে এ মাসের ২৫ তারিখে। তাদের দেয়া ত্রাণের প্রতি প্যাকেটে ছিলÑ ৩ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ১ কেজি আলু, ২ কেজি চিড়া, ১ কেজি মুড়ি, হাফ কেজি লবণ, ১ কেজি গুড়, ১০ প্যকেট স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, মোমবাতি, দিয়াশলাই ও ব্লিচিং পাউডার।

তবে একাধিক সংগঠনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবেই চলছে এখনও ত্রাণ সংগ্রহের কাজ। তাদের বেশিরভাগই এখনও মাঠ পর্যায়ে যেতে পারেননি। কোন কোন সংগঠনের ইভেন্টে নির্দিষ্ট তারিখ ও নির্দিষ্ট স্থান ঘোষণা করেই ত্রাণ সংগ্রহ চলছে। উদ্যোক্তাদের মতে, তৃতীয় দফার বন্যার শুরুতেই যারা কাজ করতে শুরু করেছে তারা এ সপ্তাহের মাঠ পর্যায়ে ত্রাণ পৌঁছে দিতে পারবে।

এদিকে, ঢাকার বাইরে প্রতিটি জেলা উপজেলায় সংগঠন ছাড়াও নিজ নিজ উদ্যোগে ত্রাণ সংগ্রহের তৎপরতা চলছে। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে এলাকাভিত্তিক ত্রাণ তৎপরতা চালাচ্ছে এমন একজন ময়মনসিংহের বাসিন্দা মাজহারুল ইসলাম তমাল। জামালপুর বা নেত্রকোনার কোন একটি গ্রামের ২০০ পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের লক্ষ্য রয়েছে তাদের। সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার পরিমাণ ১ লাখ হলেও প্রথমদিনেই উঠেছে ৪০ হাজারের ওপরে। তমাল জনকণ্ঠকে বলেন, সাময়িক সময়ের জন্য হলেও বন্যায় আক্রান্ত কোন একটি গ্রাম, যেখানে অনন্ত ২০০ পরিবার রয়েছে; সেই গ্রামের বন্যার্ত প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই। তবে ২০০’র বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এমন গ্রামে আমরা যাব না। এ ব্যাপারে কয়েকটি এলাকার স্থানীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা চলছে।

এদিকে ফেসবুকে ‘বন্যার্তদের পাশে প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশন’, ‘বন্যার্তদের জন্য জরুরী ত্রাণ সহযোগিতা কেন্দ্র’, ‘বন্যার্তদের পাশে লাইটার ইয়ুথ ফাউন্ডেশন’, ‘বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ান’, ‘বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ান, মানবতার হাত বাড়ান’ ও ‘বন্যাদুর্গতের জন্য এগিয়ে আসুন’সহ একাধিক ইভেন্ট লক্ষ্য করা গেছে। এসব ইভেন্টে যোগাযোগের জন্য নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বর ছাড়াও বিকাশ ও ব্যাংক এ্যাকাউন্ট নম্বর দেয়া আছে, যাতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা সাহায্য করতে পারেন। তবে দীর্ঘদিন যাবত সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করেন এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনকণ্ঠকে বলেন, ‘যার কাছে ত্রাণের অর্থ তুলে দিচ্ছেন সে যেন হয় বিশ্বস্ত এবং কাছের। কারণ কোন কোন ক্ষেত্রে যারা ত্রাণ সংগ্রহ করে তাদের নিয়েও প্রশ্ন উঠে।’