দেশের ওষুধ শিল্প ও ফার্মেসি পেশার উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর অবদান

১৫ আগস্টের এই শোকাবহ আবহে প্রথমেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁর ৪২তম শাহাদাতবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। সেই সঙ্গে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাতে তাঁর পরিবারবর্গসহ বর্বর হত্যাকা-ের শিকার সব শহীদদের প্রতিও জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। একই সঙ্গে ১৯৭৫ সালের ৩ নবেম্বর ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে নৃশংস হত্যার শিকার বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহযোগী জাতীয় ৪ নেতার প্রতিও রইল আন্তরিক শ্রদ্ধা। এছাড়া শ্রদ্ধা নিবেদন করি মুক্তিযুদ্ধের কমপক্ষে ৩০ লাখ শহীদ ও ৫ লাখ বা তারও বেশি মা-বোনদের প্রতি যাঁরা সেই সময় পাকিস্তানীদের দ্বারা চরম অপমান ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে যে ভাষা আন্দোলন শুরু করেছিলেন, ১৯৫২ সালে তা বাঙালীর জাতীয়তাবাদী চেতনায় পরিণত হয়ে ভাষা শহীদদের আত্মদানের মাধ্যমে নতুন মাত্রা পায়। পরবর্তীতে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন, ষাটের দশকের ৬-দফার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং সত্তরের জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে তা বাঙালীর একটি পৃথক জাতিসত্তা বিনির্মাণ করে যা স্বাধিকার আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। নির্বাচনে বাঙালীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার অস্বীকৃতি ও পূর্ব বাংলায় ব্যাপক গণহত্যা শুরুর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এই স্বাধিকার আন্দোলন স্বাধীনতা আন্দোলনে পর্যবসিত হয়েছিল। ২৩ বছর ধরে পর্যায়ক্রমিক এই সংগ্রামের প্রতিটি স্তরে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্ব দিয়েছেন, আমাদের আত্মপরিচয়সমৃদ্ধ একটি জাতিরাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন, শোষণ-বঞ্চনা-দারিদ্র্য-অশিক্ষা-কুসংস্কার-সাম্প্রদায়িকতা-দুর্নীতিমুক্ত একটি উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন।

উন্নত রাষ্ট্র গঠনের দিকে আমাদের এই পথযাত্রায় স্বাধীনতাবিরোধীদের সকল বাধা সত্ত্বেও আমরা শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কৃষি-নারী অধিকার-সন্ত্রাস ও ধর্মীয় জঙ্গীবাদ প্রতিরোধ ইত্যাদি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছি। বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বিনামূল্যে বই প্রদান শিক্ষাক্ষেত্রে এবং ডিজিটাল ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার দেশের কৃষিতে বিপ্লব এনেছে। স্বাধীনতার পরপর দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল ৭০ মার্কিন ডলার, এখন প্রায় ১ হাজার ৬০০ ডলার। গড় আয়ু ছিল ৩৪ বছর, এখন ৭১ বছর। শিশুমৃত্যুর হার তখন ছিল প্রতি হাজারে ১৭০, এখন কমে ৩১ এবং নবজাতকের বেলায় ২৪। তখন দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ৩.৩; এখন তা কমে ১.৩। দারিদ্র্যের হার ছিল ৭০%, এখন কমে ২২%।

বাংলাদেশের উন্নত রাষ্ট্রের এই অভিযাত্রায় অন্যান্য পেশাজীবীদের সঙ্গে আমরা ফার্মাসিস্টরাও অংশ নিয়েছি। আজকের বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পের যে বলিষ্ঠ অবস্থান, এর পেছনে বঙ্গবন্ধুর যে অবদান ছিল তা আমরা ওষুধবিজ্ঞানীরা গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি।

পঞ্চাশের দশকের আগে পূর্ব বাংলায় কয়েকটিমাত্র স্থানীয় ওষুধ কোম্পানি ছিল। কিন্তু দেশীয় চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নগণ্য। ষাটের দশকে এখানে কয়েকটি বিদেশী কোম্পানির আগমন ঘটে, সেই সঙ্গে আরও কয়েকটি দেশী কোম্পানিও উৎপাদন শুরু করে। কিন্তু এ সত্ত্বেও এখানকার ওষুধের বাজারে আমদানি নির্ভরতা কমেনি। উপরন্তু দেশীয় উৎপাদন ও বিক্রয়ে বিদেশী কোম্পানির একচেটিয়া আধিপত্য বজায় থাকে, যা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়েও অব্যাহত ছিল। স্বভাবতই ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রে দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো অনেক পিছিয়ে ছিল।

সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শক্ত হাতে বিভিন্ন সেক্টরে বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। তখন ওষুধ সেক্টরের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। দেশের চাহিদার ৮০% এরও বেশি ওষুধ অত্যন্ত মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে আমদানি করতে হতো। দেশে যে সামান্য উৎপাদন হতো তারও সিংহভাগ ছিল বিদেশী কোম্পানিগুলোর উৎপাদিত। ওষুধ সেক্টরে সরকারী নিয়ন্ত্রণও অত্যন্ত সীমিত ছিল, কারণ এই নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন কার্যকর সরকারী সংস্থা ছিল না। যা ছিল তা হলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বদলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ‘ড্রাগ কন্ট্রোলারের অফিস।’ এর ফলে অনেক ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বাজারে প্রচলিত ছিল। দেশের মানুষ যাতে প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনীয় ওষুধটুকুই কেনে এবং মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় বন্ধ করা যায় সে লক্ষ্যে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশের কয়েকজন প্রখ্যাত চিকিৎসককে নিয়ে ১৯৭৩ সালে একটি কমিটি গঠন করেন, যার প্রধান ছিলেন তখনকার বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ নূরুল ইসলাম। এই কমিটিকে এ বিষয়ক নীতিমালা প্রণয়ন ও বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ওষুধ বাছাই, মান যাচাই, পরিমাণ ও মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে আমদানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয়া হয়। আমদানি নিয়ন্ত্রণের সুবিধার্থে এ জন্য গঠন করা হয় ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) অধীনে একটি ‘ড্রাগ সেল।’ এর মাধ্যমে অনেক ওষুধের আমদানি নিষিদ্ধ এবং অনেকগুলোর আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বাস্তব অর্থে বাংলাদেশে এটিই ছিল প্রথম একটি ‘ছায়া ওষুধনীতি’, পূর্ণাঙ্গ না হলেও যা ছিল তখনকার পরিপ্রেক্ষিতে উল্লেখযোগ্য। এর ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ওষুধ আমদানি খাতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় বন্ধ হয়, জনগণ অপ্রয়োজনীয় ওষুধের পেছনে কষ্টার্জিত পয়সা খরচ না করে জীবন রক্ষাকারী ও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের পেছনে তা খরচ করতে সক্ষম হয় এবং গরিব জনগণের জন্য সাশ্রয়ী খরচে চিকিৎসা সেবা প্রদান চালু করা সম্ভব হয়।

এছাড়া বঙ্গবন্ধু ওষুধের আমদানি কমিয়ে দেশে মানসম্মত ওষুধের উৎপাদন বাড়ানো এবং এ শিল্পকে সহযোগিতা ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে ‘ওষুধ প্রশাসন পরিদফতর’ গঠন করেন। তিনি দেশে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনে আর্থিক সহায়তা প্রদানের জন্য ইতোমধ্যে যে ‘বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক’ ও ‘বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থা’ গঠন করেছিলেন, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ওষুধ সেক্টরে নতুন শিল্পোদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে নির্দেশ দেন। ওষুধ প্রশাসন পরিদফতরকে নির্দেশ দেন নিবিড়ভাবে প্রযুক্তিগত পরামর্শ দিতে। এবং ওষুধ প্রশাসন পরিদফতরের প্রথম পরিচালক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক হুমায়ুন কে এম এ হাই আন্তরিকভাবে এ নির্দেশ পালন করতে থাকেন। ফলে অনেকগুলো নতুন দেশীয় ওষুধ শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে। এর ফলে জীবন রক্ষাকারী ওষুধগুলোর দাম কমে আসার পাশাপাশি এগুলো সহজলভ্য হয়।

এছাড়াও বঙ্গবন্ধু জনস্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে বিভিন্ন বিদেশী কোম্পানির পেটেন্টকৃত ওষুধও দেশীয় কোম্পানি কর্তৃক উৎপাদনের জন্য গরিব দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে পেটেন্ট আইনের বাইরে রাখেন। আমলাতন্ত্র তখন বঙ্গবন্ধুকে বলেছিল যে ওষুধের পেটেন্ট না মানলে পেটেন্টধারী বিদেশী কোম্পানিগুলো সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করবে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ নূরুল ইসলাম ও অধ্যাপক হুমায়ুন কে এম এ হাই উভয়ের জবানিতেই শুনেছি, বঙ্গবন্ধু এর উত্তরে যা বলেছিলেন তার মর্মার্থ হলোÑ আমি সারাজীবন বাংলার মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, সারাজীবন ঘর-সংসার ফেলে জেল খেটেছি। না হয় বাংলার মানুষের ওষুধের অধিকারের জন্য আরও কিছুদিন জেল খাটব। তারা মামলা করলে তো আমার বিরুদ্ধে করবে, তোমাদের বিরুদ্ধে নয়। তোমাদের ভয় নেই। তোমাদের যা বলেছি তা কর। ওসব পেটেন্টওলা ওষুধ আমার দেশের কোম্পানিগুলোকে বানাতে দাও। আমার কাছে আগে আমার দেশের গরিব মানুষের জীবন। এত দাম দিয়ে তারা ওসব পেটেন্টওলা ওষুধ খেতে পারবে না।

ওষুধের পেটেন্ট না মানা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর মতো এমন অকুতোভয় উচ্চারণ তখনকার তৃতীয় বিশে^র আর কোন রাষ্ট্রনায়ক করার সাহস পাননি। কয়েকটি বিদেশী ওষুধ কোম্পানি এ জন্য মামলার প্রস্তুতিও নিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মামলা করার মতো স্পর্ধা দেখায়নি।

ফলে দেশীয় কোম্পানিগুলো বিপুল প্রণোদনা লাভ করে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারের কারণে জীবন রক্ষাকারী ওষুধগুলোর দাম কমে আসার পাশাপাশি এগুলো সহজলভ্য হয়। এভাবে দেশের জনগণ ও দেশীয় ওষুধ শিল্প উভয়পক্ষই উপকৃত হয়। দেশের অর্থনীতিতেও তা অবদান রাখতে শুরু করে।

কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকা-ের পর তদানীন্তন সরকার বঙ্গবন্ধুর আমলের আমদানি-নিষিদ্ধ ওষুধগুলোর ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করে নেয়। এর ফলে ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধগুলো পুনরায় এদেশে আমদানি ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদন শুরু হয়। ওষুধের বাজার পুনরায় প্রায় একচ্ছত্রভাবে বিদেশীদের হাতে চলে যায়। এ অবস্থা ১৯৮২ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

এর অবসানে দেশের মানুষকে ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং দেশীয় ওষুধ শিল্পকে পুনরায় প্রণোদনা দিতে ১৯৮২ সালে দেশে প্রথম পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ওষুধনীতি প্রণীত হয়। কিন্তু তাতেও বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়ে অর্থাৎ ১৯৭৩ সালে যে ওষুধ আমদানি নীতিমালা বা ‘ছায়া ওষুধনীতি’ প্রণয়ন করা হয়েছিল তাই ছিল মূলনীতি। আমরা সবাই জানি যে ১৯৮২ সালের ওষুধনীতিটি ছিল রোগীবান্ধব ও শিল্পবান্ধব একটি অত্যন্ত সফল ওষুধনীতি।

আজ যে আমরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় কমদামে জীবন রক্ষাকারী ওষুধগুলো তৈরি করতে পারছি এবং ওষুধের পেটেন্ট আমাদের দেশের ওপর ২০৩২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রয়োজ্য হবে না, তার তৎপরতার জন্য আমরা বর্তমান সরকার এবং পথ দেখানোর জন্য বঙ্গবন্ধুর কাছে ঋণী।

আমরা ফার্মাসিস্টরা আরও একটা কারণে বঙ্গবন্ধুর কাছে কৃতজ্ঞ। স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তানে ফার্মাসিস্টদের পেশাগত রেজিস্ট্রেশন প্রদানের জন্য কোন ফার্মেসি কাউন্সিল ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল। কিন্তু এখানে নয়। যদিও ১৯৬৪ সালে এদেশে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের প্রতিষ্ঠা হয়। এর ফলে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা কোন সরকারী স্বীকৃতি পেত না। তারা বিদেশে গিয়ে ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করতে সমস্যায় পড়ত। ফার্মেসি গ্র্যাজুয়েটস্ এ্যাসোসিয়েশনের কাছ থেকে সদস্যভুক্তির একটি সনদপত্র নিয়ে তাদের বিদেশে পাড়ি জমাতে হতো। কিন্তু এটি ছিল কেবল একটি পেশাগত সংগঠনের স্বীকৃতি, কোন সরকারী স্বীকৃতি নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে সরকার ফার্মাসিস্টদের এই পেশাগত রেজিস্ট্রেশন প্রদানের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং বঙ্গবন্ধু তখনকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মরহুম আবদুল মান্নান এমপিকে নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি ও অধ্যাপক হুমায়ুন কে এম এ হাই এ বিষয়ক আইনের খসড়া প্রণয়ন করে তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠান। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সেটি বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হতে পারেনি। পুরো ১৯৭৫ সাল এই খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ে পড়ে থাকে। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে তা সামরিক সরকার থেকে ‘ফার্মেসি কাউন্সিল এ্যাক্ট’-এর পরিবর্তে ‘ফার্মেসি কাউন্সিল অর্ডিন্যান্স’ আকারে ঘোষিত হয়। এই আইনটি প্রণয়নের তথা ফার্মাসিস্টদের সরকারী পেশাগত স্বীকৃতি প্রদানের নিয়ম প্রণয়নের জন্য আমরা ফার্মাসিস্টরা বঙ্গবন্ধুর কাছে ঋণী। এই রেজিস্ট্রেশনের কারণে এখন ফার্মাসিস্টরা বিদেশে প্রচুর সংখ্যায় চাকরি করতে পারছে এবং দেশেও ওষুধ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগপ্রাপ্ত হচ্ছে।

ওষুধ সেক্টরে বঙ্গবন্ধুর এসব অবদানের ফলে আজ আমরা ওষুধ উৎপাদনে প্রায় স্বনির্ভর। এক সময়কার চাহিদার ৮০% এর বেশি ওষুধ আমদানিকারক বাংলাদেশটি আজ ৯৮% ওষুধ তৈরি করছে। আমাদের বেশকিছু ওষুধ কোম্পানি বিশে^র ওষুধ সম্পর্কিত প্রধান সার্টিফিকেশনগুলো- যেমন যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ, যুক্তরাজ্যের এমএইচআরএ, ইউরোপের ইইউ, অস্ট্রেলিয়ার টিজিএ, উপসাগরীয় দেশগুলোর জিসিসি, ব্রাজিলের আনভিসা ইত্যাদি সনদগুলো- অর্জন করেছে। দেশের ওষুধ কারখানাগুলো আজ বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার ‘গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্রাকটিস- জিএমপি’ নীতিমালা অনুয়ায়ী ওষুধ উৎপাদন করছে। যারা তা মানছে না, সরকার ও উচ্চ আদালত সেগুলোতে ওষুধ উৎপাদন বন্ধ করেছে। এর ফলে কিছু কোম্পানি বাদে বাকি সব কোম্পানির উৎপাদিত ওষুধ মানসম্পন্ন হয়েছে। যার সুফল হিসেবে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটছে। শুধু তাই নয়। বাংলাদেশের ওষুধ আজ বিশে^র ১৪০টি দেশে রফতানি হচ্ছে। যারা একসময় আমাদের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছিল, তারা আজ আমাদের দেশ থেকে ওষুধ আমদানি করছে। যারা আমাদের ‘মিস্কিন’ বলে অবজ্ঞা করত, ফার্মাসিস্ট নেই বলে তারা আজ পর্যন্ত তাদের দেশে ওষুধ কোম্পানি করতে পারেনি, এবং তারাও আজ আমাদের ওষুধ খাচ্ছে। ২০১৫ সালে আমরা ওষুধ রফতানি করেছিলাম ৮১২ কোটি টাকার। গত বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। আশা করা যায়, এই ২০১৭ সালে তা আরও বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হবে।

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করি, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করলেই জনগণের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী স্বাধীনতাকে রক্ষা করাও প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা এখনও দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে নানাভাবে নানা ব্যানারে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ পর্যন্ত ১৯ বার হত্যা করার চেষ্টা করেছে। কারণ তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, যা তারা চায় না। এসব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এদের প্রতিহত করতে হবে। এভাবেই আমাদের জাতির পিতা ও অগণিত মুক্তিযোদ্ধারা যে স্বপ্ন ও চেতনা নিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

বঙ্গবন্ধু আমাদের শুধু একটি দেশ-মানচিত্র-পতাকা-সংবিধান আর জাতীয় সঙ্গীতই দিয়ে যাননি। তিনি আমাদের দিয়েছেন একটি চেতনা বা বিশ^-দরবারে বুক ফুলিয়ে ‘বাঙালী’ হিসেবে পরিচয় দেয়ার সাহস। আর দিয়ে গেছেন একটি স্বপ্ন, যে স্বপ্নকে আমরা লালন করব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। কিন্তু তাঁকে আমরা কিছুই দিতে পারিনি। কিন্তু মাঝে মধ্যে একা যখন থাকি, তখন ভালবেসে নীরবে দুয়েক ফোঁটা অশ্রুও কি আমরা তাঁকে উপহার দিতে পারি না?