খুদে শিক্ষার্থীদের এ্যাকাউন্টে হাজার কোটি টাকা

স্কুলের ছোট ছোট ছেলেমেয়োরাও সঞ্চয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছে। স্কুল পড়–য়া এসব শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চয়ী মনোভাব গড়ে তুলতে বিভিন্ন নামে সঞ্চয় প্রকল্প চালু করেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। ফলে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘স্কুল ব্যাংকিং’ কার্যক্রম। বর্তমানে দেশের ৫৭টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৫৬টি ব্যাংকে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম রয়েছে। গত ৭ বছরে এই হিসাব খোলার সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে আমানতের পরিমাণও। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, সারাদেশে বিভিন্ন ব্যাংকে ১৩ লাখ ৭৪ হাজার ৪৪৩টি স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা হয়েছে। এসব এ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

স্কুল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চয়ের মনোভাব গড়ে তুলতে ২০১০ সালের নবেম্বরে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ‘স্কুল ব্যাংকিং’ কার্যক্রম শুরুর অনুমতি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। শিক্ষার্থীদের পরবর্তী জীবনে আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত ও শিক্ষার ব্যয় নির্বাহ সহজ করাও এর অন্যতম লক্ষ্য। ছয় থেকে আঠার বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীরা এ হিসাব খুলতে পারে। আর হিসাব খুলতে কমপক্ষে ১০০ টাকা জমা দিতে হয়। ছাত্রছাত্রীর পক্ষে তার পিতা-মাতা অথবা আইনগত অভিভাবক এ হিসাব পরিচালনা করে থাকেন। এ হিসাব খুলতে অন্যান্য হিসাবের মতো ‘কেওয়াইসি’সহ নির্দিষ্ট ফরম রয়েছে। এসব ফরম পূরণ করে ছাত্র-ছাত্রীর জন্ম নিবন্ধন সনদ ও স্কুলের পরিচয়পত্র জমা দিয়ে এ হিসাব খোলা যায়। এসব হিসাব সাধারণ চলতি হিসাবে রূপান্তরের সুযোগও আছে। কোন কোন ব্যাংক আলাদা কাউন্টার বা ডেস্ক খুলে ছাত্রছাত্রীদের স্কুল ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, এই হিসাব খোলায় শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এবং জমা টাকার পরিমাণের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড। ইসলামী ব্যাংকে এ্যাকাউন্টের সংখ্যা ২ লাখ ১৬ হাজার ৫৩৪টি। যা মোট এ্যাকাউন্টের প্রায় ১৬ ভাগ। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকে এক লাখ ৭৮ হাজার ৫১৪টি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে এক লাখ ২৯ হাজার ৬৩১টি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ৯৯ হাজার ১৮৭টি এবং উত্তরা ব্যাংকে ৮০ হাজার ৫৫১টি এ্যাকাউন্ট রয়েছে।

অন্যদিকে জমানো টাকার দিক থেকে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের স্কুল ব্যাংকিংয়ে জমা পড়েছে ৩৬০ কোটি টাকা। যা মোট জমার প্রায় ৩৩ শতাংশ। এর বাইরে ইসলামী ব্যাংকে ১০৭ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংকে ৯৫ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে ৫৭ কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংকে ৫০ কোটি টাকা জমা হয়েছে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মোঃ শিরিন বলেন, সরকারের বিভিন্ন বৃত্তি ও উপ-বৃত্তির টাকা ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। আর আকর্ষণীয় বিভিন্ন প্রকল্প থাকায় শিক্ষার্থীরা স্কুল ব্যাংকিংয়ে আগ্রহী হচ্ছে।

স্কুল ব্যাংকিং এ সরকারী ব্যাংকের চেয়ে বেসরকারী ব্যাংকগুলো ভাল করেছে। এসব ব্যাংকে আট লাখ ৪৬ হাজার ৫৫৬টি এ্যাকাউন্ট আছে। যা মোট এ্যাকাউন্টের ৬১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এসব এ্যাকাউন্টে সাড়ে ৯০০ কোটি টাকা আমানত রয়েছে। যা স্কুল ব্যাংকিংয়ের মোট আমানতের ৮৬ দশমিক ২৭ শতাংশ।

এদিকে স্কুল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হলেও গ্রামীণ এলাকায় তা বাড়ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, স্কুল ব্যাংকিংয়ের যেসব হিসাব খোলা হয়েছে তার মধ্যে শহরেই বেশি হিসাব খোলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে গ্রামীণ এলাকা পিছিয়ে রয়েছে। সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, শহরের ব্যাংক শাখাগুলোতে আট লাখ ২৭ হাজার ৪০২টি এ্যাকাউন্ট রয়েছে। আর পল্লী এলাকার শাখাগুলোতে এ্যাকাউন্ট রয়েছে পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার ৪১টি। শহরের এ্যাকাউন্টগুলোতে টাকার পরিমাণও বেশি। অন্যদিকে ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্রদের এ্যাকাউন্ট বেশি।

স্কুল ব্যাংকিংয়ের হিসাবের মাধ্যমে শুধু টাকা সঞ্চয় হচ্ছে তাই নয়, শিক্ষার্থীরা ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে অভ্যস্ত হচ্ছে। ব্যাংকিং কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত প্রযুক্তির সঙ্গেও পরিচিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা এটিএম কার্ডের মাধ্যমে টাকা তুলতে পারছে। তাদের বেতনের টাকাও এ্যাকাউন্ট থেকে জমা দিতে পারছে। স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের বিপরীতে ব্যাংকগুলো এটিএম কার্ড (কেবল ডেবিট কার্ড) ইস্যু করতে পারে। যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা তোলা যায়। তবে অভিভাবকদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সর্বোচ্চ ৫০০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো যায়। স্কুল ব্যাংকিং হিসাব পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সরকারী ফি ব্যতীত অন্য কোন প্রকার সার্ভিস চার্জ নিতে পারে না। এ কার্যক্রমের আওতায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে বেতন-ফি জমা দিতে পারে। বৃত্তি বা উপবৃত্তির অর্থ জমা রাখতে পারে।