সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

বাড়িতে যখন কম্পিউটার কেনা হলো তখন মৌমিতার একটু মন খারাপ হয়েছিল। কম্পিউটারের চেয়ে বড় একটা নতুন টিভি কেনা হলে খুশি হতো সে। কারণ সে মনে করেছিল কম্পিউটার হলো ছেলেদের জিনিস। নিশ্চয়ই এটা ওর বড় ভাই ব্যবহার করবেন। আর ব্যবহার করবেন বাবা। মা আর সে নিশ্চয়ই কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারবে না। তার বান্ধবীরাও কেউ কম্পিউটার বিষয়ে আগ্রহী নয়। কিন্তু তার বাবা এবং বিশেষ করে বড় ভাই তাকে কম্পিউটার চালাতে শেখালেন। সে তখন স্কুলের ছাত্রী ছিল। ধীরে ধীরে কম্পিউটারের বিভিন্ন কাজ শিখতে পারে সে। কলেজে ওঠার পর বাবা তাকে ল্যাপটপ কিনে দেন। মৌমিতা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। পড়ার পাশাপাশি আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে ভালো রোজগার করে সে।
নারীর জন্য তথ্যপ্রযুক্তি সত্যিই নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে শিক্ষা লাভের মাধ্যমে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন ইত্যাদিতে যেমন নারী এগিয়ে আসছেন, তেমনি বিভিন্ন অফিসে কম্পিউটার কম্পোজ বিভাগেও নারীরা কাজ করছেন। অনলাইন পত্রিকাগুলোয়ও কাজ করছেন অনেক নারী। এমনকি ঘরে বসেও অনেকে নিউজ পোর্টাল চালাচ্ছেন। কলসেন্টারে কাজ করে অর্থ উপার্জন করছেন অনেকে। আউটসোর্সিংয়েও আছেন অনেকে। তথ্যপ্রযুক্তিতে জ্ঞান লাভ ছাড়া আজকাল চাকরি বা ব্যবসা কোনোটাই সম্ভব নয়। এমনকি কৃষিকাজেও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। রোগাক্রান্ত গবাদিপশু, ফসলের পোকা ইত্যাদির ছবি তুলে সরাসরি কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে পাঠিয়ে দেওয়া যাচ্ছে ইন্টারনেট অথবা মোবাইলে। তার পর পরামর্শও পাওয়া যাচ্ছে একইভাবে। অনলাইন শপিং দেশে ক্রমেই জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, নানারকম জাংক জুয়েলারি ও কস্টিউম জুয়েলারি, কসমেটিকস, গৃহস্থালি পণ্য, খাবার-দাবারসহ নানারকম জিনিস। অনলাইন বুটিকশপগুলো অধিকাংশই চালাচ্ছেন নারীরা। ঘরে বসেই উপার্জন করছেন তারা। নারীদের জন্য অনলাইন শপিং সম্ভাবনার নতুন দুয়ার সত্যিই খুলে দিয়েছে। হাতের কাজ করা পোশাক, নিজেদের তৈরি বিভিন্ন রকম পণ্য, এমনকি বিদেশ থেকে নিয়ে আসা বিভিন্ন পণ্যও নারীরা বিক্রি করছেন অনলাইনে। এ জন্য তাদের দোকান নেওয়ার ঝামেলায় যেতে হচ্ছে না। খুব বেশি বিনিয়োগেরও প্রয়োজন পড়ছে না। স্বল্পপুঁজিতে রোজগারের পথ খুঁজে নিচ্ছেন এই নারীরা।
অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন হলো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি প্রকল্প। এই প্রকল্পের অধীনে গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ৬৪টি জেলা তথ্য অফিস ও ৪টি উপজেলা তথ্য অফিসের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তথ্যপ্রযুক্তির সেবা ছড়িয়ে দিচ্ছে। অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্প ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরিতে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এটুআই প্রকল্পের জনপ্রেক্ষিত বিশেষজ্ঞ নাইমুজ্জামান মুক্তা বললেন, ‘এই যুগ হলো তথ্যপ্রযুক্তির। এখন যার কাছে তথ্য জ্ঞান যত বেশি সে তত ক্ষমতা অর্জন করতে পারবেন। তথ্যপ্রযুক্তি যেন নারী-পুরুষের বৈষম্য বাড়াতে না পারে এবং নারী যেন তথ্যপ্রযুক্তিকে নিজের উন্নয়নে ব্যবহার করতে পারেন সে জন্য বাংলাদেশের বর্তমান সরকার কাজ করছে। আমাদের প্রতিটি প্রোগ্রামে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ যত বাড়বে নারীর ক্ষমতায়ন তত অগ্রসর হবে।’ তিনি আরও জানালেন, ‘এটুআই প্রকল্প দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কাজ করছে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া যে তৃণমূল জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারে না সেখানেও তারা ভ্রাম্যমাণ চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে সরকারি সেবা কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য পৌঁছে দিচ্ছেন। নারীরা জানতে পারছেন স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন তথ্য। গ্রহণ করছেন বিভিন্ন সেবা।’ একই প্রকল্পে হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট মিডিয়া এক্সপার্ট হিসেবে কাজ করছেন তানজিলা শারমিন। তিনি বললেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম প্রধান কারিগর হতে পারেন নারীরা। সরকার তাদের নানারকম সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু সেগুলো গ্রহণ করে নিজেদের ভাগ্য গড়ে নিতে হবে তাদের।’
বাংলাদেশের প্রতি স্কুলে ও কলেজে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু অনেক মেয়ে এই বিষয়ে অনীহা দেখায়। অথচ নারীর জন্য তথ্যপ্রযুক্তির শিক্ষা হতে পারে ক্ষমতায়নের পথ। শুধু একে ব্যবহার করতে জানতে হবে।