বিলুপ্ত ছিটমহলে লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া

২০১৫ সালের ৩১ জুলাই গভীর রাতে বাংলাদেশ ও ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় হয়েছিল। এর মধ্যে ভারতের ভূখণ্ডে ছিল বাংলাদেশের ৫১টি ও বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ছিল ভারতের ১১১টি ছিটমহল। বাংলাদেশের বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হলেও হতাশা আছে ভারতের বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে

লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহল ১১৯ বাঁশকাটা গ্রামে স্থাপন করা হয়েছে ডিজিটাল তথ্য সেবাকেন্দ্র। এখানে সেবা নিতে আসেন ওই গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা l ছবি: আবদুর রব
দুই বছরের মাথায় বিলুপ্ত ছিটমহলের চিত্র পাল্টে গেছে। একসময়ের বঞ্চিত জনপদে লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। ঘরে ঘরে এসেছে বিদ্যুৎ। বিলুপ্ত ছিটবাসী পাচ্ছেন স্বাস্থ্যসেবা, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা। জমির কাগজপত্র হয়েছে তাঁদের। ডিজিটাল তথ্যসেবাকেন্দ্রের সেবাও পৌঁছে গেছে তাঁদের দোরগোড়ায়। বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের মনে তাই সুখের আমেজ। গতকাল সোমবার তাঁরা ছিটমহল বিনিময়ের তথা তাঁদের ‘স্বাধীনতার’ দুই বছর পূর্তি উদ্‌যাপন করেছেন হাসি-আনন্দে।

বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে ১১১টি ছিটমহলের ১২টি পড়েছে কুড়িগ্রামে, লালমনিরহাটে ৫৯টি, পঞ্চগড়ে ৩৬ এবং নীলফামারীতে পড়েছে ৪টি ছিটমহল।বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় কুড়িগ্রামেরদাসিয়ারছড়া। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের পাশে জমিতে আমন ধান বুনতে বুনতে গান গাইছেন কৃষিমজুরেরা। কাছে গিয়ে গানের বিষয় জানতে চাইলে মমিনুল ও জাহিদুল জানান, ‘শ্যাখের বেটি ছাড়া হামরা স্বাধীন হবার পাইলং না হয়। বাপের বেটি। রাইতোত স্বাধীনতার উৎসব পালন করম। তাই মনের সুখে গান ধরছি।’ এ অবস্থা শুধু জমিতে নয়, বিলুপ্ত ছিটমহলের সবার মধ্যে বিরাজ করছে।

এত কিছুর পরও মানুষের মনে একটা চাওয়া রয়ে গেছে বলে জানালেন আলতাফ হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ইউনিয়ন চেয়েছিলাম। এটা এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি।’ সহিদুল ইসলাম নামের এক তরুণ বলেন, ‘৬৮ বছর আমরা পরাধীন ছিলাম। পালিয়ে লেখাপড়া করেছি। চাকরির ক্ষেত্রে আমাদের কোটা দেওয়া হোক।’

ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা জানান, দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আজ মধ্যরাত থেকে ৬৮টি মোমবাতি ও দুটি মশাল জ্বালিয়ে কর্মসূচির সূচনা করা হবে। প্রতিটি বাড়িতে আলোকসজ্জাসহ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ১৮টি মসজিদে মিলাদ মাহফিল ও তিনটি মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের ভিতরকুঠি
বাঁশপচাই গ্রামটি আর আগের মতো নেই। গ্রামে এসেছে বহুল প্রত্যাশিত বিদ্যুৎ, নির্মাণ হয়েছে সাতটি কালভার্ট, দুই কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় পাকা হওয়ার অপেক্ষায়। গ্রামে উঠেছে ভিতরকুঠি সালেহা সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়, নির্মাণ হয়েছে একটি সুদৃশ্য শহীদ মিনার। গ্রামের বয়স্ক, বিধবা ভাতা পেয়েছেন অনেকেই।

কুলাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী বলেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভিতরকুঠি বাঁশপচাই গ্রামে ১৯৬টি রেশন কার্ড, ৭৫টি বয়স্ক ভাতা কার্ড, ১৫টি বিধবা ভাতা কার্ড, ১৫টি প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ড দেওয়া হয়েছে।

লালমনিরহাট জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান বলেন, জেলা পরিষদ থেকে বিশুদ্ধ পানীয় জলের জন্য ৪৯টি গোড়াপাকা নলকূপ, প্রশিক্ষিত দরিদ্র নারীদের কর্মসংস্থানের জন্য জেলা পরিষদ থেকে ৩৩টি সেলাই মেশিন বিনা মূল্যে দেওয়া হয়েছে।

লালমনিরহাট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসনাত জামান বলেন, ভিতরকুঠি বাঁশপচাই গ্রামে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার স্থাপন করা হয়েছে। এ ট্রান্সফরমারের আওতায় গ্রামের ১ হাজার ৯০০ পরিবারকে আবাসিক বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হয়েছে।

লালমনিরহাট সদরের ইউএনও শফিকুল ইসলাম বলেন, বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীদের সার্বিক উন্নয়নের জন্য সব ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকার নীতি মানা হচ্ছে।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার অভ্যন্তরে বিলুপ্ত চারটি ছিটমহলের অবস্থান। ওই চার ছিটমহলবাসীর যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি গত দুই বছরেও। তবে বিলুপ্ত ছিটমহল ২৯ নম্বর বড়খানকি খারিজা গিদালদহ গ্রামের বাসিন্দা মো. শফিকুজ্জামান বলেন, ‘বিদ্যুৎ, টিউবওয়েল, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা সব পাইছি। যারা বেশি গরিব তারা বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফসহ বিভিন্ন কার্ড পাইছে, জমির কাগজ হইছে, ভোটার তালিকাও কইরছে, কিন্তু রাস্তা পাই নাই। রাস্তা না পাওয়ার কারণে এখনো জমির আইল দিয়া চলাচল করির নাগে।’

দেশ, পতাকা ও পরিচয় পাওয়ার তৃপ্তি প্রকাশ করে নয়া বাংলা গ্রামের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাশরাফী নাজনীন বলে, ‘সব প্রত্যাশার ঊর্ধ্বে ছিল গ্রামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে, সেখানে আমার মতো শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া করবে। গ্রামের যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তন হবে। কিন্তু দুই বছরেও আমার সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এখনো বর্ষায় কাদাপানি ভেঙে প্রায় চার কিলোমিটার পথ হেঁটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে গ্রামের শিক্ষার্থীদের।’

ছিটমহল লাগোয়া গয়াবাড়ি ইউনিয়নের রহমানগঞ্জ বাজার। সেখানে গড়ে উঠেছে ছিটমহলের নাগরিকদের সেবায় ডিজিটাল তথ্যসেবাকেন্দ্র। ওই কেন্দ্রে এলাকার মানুষের আনাগোনা থাকে সারাক্ষণ। কেন্দ্রের উদ্যোক্তা আবদুল আলীম জানান, এখানে অনলাইনের সব সেবা, বিকাশসহ অন্যান্য কোম্পানির ক্যাশ লেনদেন, বিভিন্ন তথ্য আদানপ্রদান, ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের মাধ্যমে প্রাপ্ত সেবা প্রদান করা হয়। ছিটমহলবাসীর সুবিধার্থে কেন্দ্রটি স্থাপনে সহযোগিতা দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।