লবণসহিষ্ণু দেশী পাট-৮ স্বপ্ন দেখাচ্ছে চাষীদের ॥ দক্ষিণে পাট বিপ্লব

দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততাকে জয় করল পাট। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ত জমিতে বিজেআরআই উদ্ভাবিত দেশী পাট-৮ জাতের পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। লবণাক্ততার কারণে বছরের পর বছর পরিত্যক্ত থাকা জমিতে পাট আবাদ করে চাষীরাও খুব খুশি। বিজেআরআই উদ্ভাবিত লবণসহিষ্ণু দেশী পাট-৮ এখন উপকূলীয় অঞ্চলের চাষীদের নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে। স্বপ্ন দেখাচ্ছে, এক ফসলী জমিতে এখন দুটি ফসল আবাদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপকূলীয় সব জেলায় এই পাট আবাদে সরকার কৃষকদের সহযোগিতায় এগিয়ে এলে উপকূলের অর্থনীতিতে পাট বিপ্লব সাধিত হবে। যা ওই অঞ্চলের কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে আরও স্বাবলম্বী করে তুলবে।

জানা যায়, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১৮ জেলায় মোট কৃষি জমির পরিমাণ ২৮ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ ৩০ শতাংশ। চাষযোগ্য এই জমির মধ্যে ১০ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিই বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত। দিন দিন এই লবণাক্তার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে প্রতি বছর খরিফ-১ মৌসুমে এই বিশাল পরিমাণ জমি পতিত পড়ে থাকে।

এই পতিত জমিতেই গত দুই বছর ধরে বিজেআরআই উদ্ভাবিত লবণসহিষ্ণু দেশী পাট-৮ চাষে ব্যাপক সফলতা পেয়েছে কৃষক। লবণসহিষ্ণু আমন ধান চাষে সফলতার পর পাট চাষে এই সফলতা কৃষকদের নতুন করে আশাবাদী করে তুলেছে। চাষীরা মনে করছে, এখন আর এক ফসলের পর তাদের লবণাক্ত জমি পতিত থাকবে না। এখন থেকে তারা পাট এবং আমন দুটি ফসলই আবাদ করতে পারবে। বাংলাদেশ জুট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিজেআরআই) উর্ধতন কর্মকর্তারা সরেজমিনে ঘুরে দেখতে পেয়েছেন, পরীক্ষামূলকভাবে লবণ সহিষ্ণু জমিতে পাট চাষে সফলতা আসায় কৃষক এখন ব্যাপক উচ্ছ্বসিত। খুলনার প্রত্যন্ত দাকোপ উপজেলার বাজুয়া ইউনিয়নের পাট চাষী বাসুদেব ম-ল জানান, গত এপ্রিল মাসের শুরুতে তিনি তার পরিত্যক্ত জমিতে লবণসহিষ্ণু পাট বপন করেন। গত ৪ মাসে পাটের বৃদ্ধি ভাল হওয়ায় তিনি বাম্পার উৎপাদন প্রত্যাশা করছেন। তিনি বলেন, ‘লবণাক্ত জমিতে এত ভাল পাট হবে তা আমি কল্পনাও করতে পারেননি। এখন পাট কাটার পরই আমন ধান লাগানো যাবে। ফলে আগামীতে একই জমিতে আমি দুটি ফসলই চাষ করব।’

তবে শুধু বাসুদেবই নয়, এই উপজেলায় লবণসহিঞ্চু জাতের পাট পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা আরও ৫০ জন চাষীই এখন উৎফুল্ল এবং আশাবাদী। পাটের অত্যন্ত সুন্দর ফলন দেখে চাষীর মুখে হাসি ফুটেছে। এ জাতের পাট চাষে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এই উপজেলার অন্যান্য চাষীরাও। তারা এখন পতিত লবণাক্ত জমিতে দুটি ফসল আবাদের স্বপ্ন দেখছেন।

দেশী পাট-৮ জাত আবাদ করা অপর কৃষক শামসুল আলম বলেন, ‘আমার জমিগুলো পতিত অবস্থায় ছিল। পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্যারেরা আমাকে পাট চাষের কথা বলেন। ট্রেনিং দেয়ার পর পাট চাষ শুরু করি। এই পাট আবাদ করে এখন আমি ভালই লাভে আছি।’ তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণসহ নানা উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা দেয়ায় আমাদের অনেকেই এখন পাট চাষে আগ্রহী হচ্ছে।’

উপকূলের বিশাল লবণাক্ত জমিকে খরিফ-১ মৌসুমে পাট চাষের আওতায় আনার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সহযোগিতায় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট তাদের উদ্ভাবিত মধ্যম মাত্রার লবণসহিষ্ণু দেশী পাট-৮ এবং উচ্চমাত্রার লবণসহিষ্ণু চারটি লাইন উপকূলীয় অঞ্চলের ৬টি জেলার ৬টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে আবাদ শুরু করে। এই উপজেলাগুলো হলো- বরগুনা জেলার বেতাগী, পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর, খুলনার দাকোপ, বাগেরহাট জেলার মোরলগঞ্জ এবং সাতক্ষীরা সদর উপজেলা। প্রতি উপজেলায় ৫০ জন কৃষককে নির্বাচিত করে তাদের প্রশিক্ষণ, মাঠ দিবস ও মতবিনিয়ের মাধ্যমে দেশী পাট-৮ ও অপর চারটি লাইন আবাদে উপযোগী করে তোলা হয়। এর মধ্যে পর পর দুই মৌসুমেই দেশী পাট-৮ জাত বাম্পার ফলন হয়েছে। বিশেষ করে এ বছর প্রতিটি পর্যবেক্ষণ মাঠেই পাট গাছগুলো যেমন মোটা এবং তেমনি লম্বা হয়েছে। যা উপকূলীয় অঞ্চলে পাট চাষে কৃষকদের নতুন করে আশাবাদী করে তুলেছে।

তবে এই পাট আবাদের গবেষণাকালীন দুটি সমস্যা দেখা দিয়েছে। এগুলো হলো- পাট বীজ বপনের সময় সেব সমস্যা এবং উৎপাদিত পাটের আঁশ বাজারজাতকরণ। সরকার এ দুটি সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলে আগামী দিনে উপকূলীয় এলাকাই হবে পাট আবাদের সম্ভাবনাময় অঞ্চল।

সম্প্রতি লবণসহিষ্ণু জাতের পাট পরীক্ষামূলক চাষ হওয়া জমি সরেজমিনে ঘুরে দেখে এসেছেন বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মোঃ মনজুরুল আলম। তিনি বলেন, লবণাক্ত মাটিতে পাটের ফলন দেখে মুগ্ধ হয়েছি। উপকূলীয় অঞ্চলের চাষীরা আগামীতে এ ধরনের পাট চাষ করে অধিক লাভবান হবেন। সেই সঙ্গে তারা একই জমিতে পরপর দুটি ফসল লাগাতে পারবেন।

ড. আলম বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে মধ্যম মানের লবণাক্ত এলাকাই বেশি। এখন একটি ফসলের (টি-আমন) পর এই এলাকার জমি পতিত থাকে। তাই কৃষি মন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন এই জমিতে ফসল আবাদের জাত উদ্ভাবন করতে হবে। সে লক্ষ্যেই বিজেআরআই বিভিন্ন শঙ্করায়নের মাধ্যমে দেশী পাট-৮ জাত উদ্ভাবন করে। এই জাত ৯ ডিএস/মিটার পর্যন্ত লবণসহিষ্ণু।

তিনি বলেন, ‘উচ্চ লবণসহিষ্ণু (১৪ ডিএস/মিটার) আরও চারটি পাটের লাইন নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ চলছে। আশা করছি, এই লাইনগুলোতেও সাফল্য পাব। তখন দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত জমিতে পাট আবাদের নতুন দুয়ার খুলে যাবে।’

ড. মনজুরুল আলম বলেন, দেশী পাট-৮ এর ব্যাপক সাফল্যে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, এই জাত মধ্যম মানের লবণাক্ততা সহিষ্ণু এবং উপকূলীয় অঞ্চলে চাষের উপযোগী। কৃষকের মধ্যে এই পাট আবাদের জন্য ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তারা এখন আমাদের কাছে বীজ চাচ্ছে। আমরা আগামী মৌসুমে প্রত্যেক উপজেলায় ১০০ কেজি করে দেশী পাট-৮ বীজ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন একটি সময়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত জমিতে পাট চাষে সফলতা এসেছে যখন দেশে ১৭ পণ্যে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে যে অতিরিক্ত ২০ থেকে ২২ লাখ বেল পাটের চাহিদা তৈরি হয়েছে, তা দক্ষিণাঞ্চলে পাট আবাদের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে দেশের উত্তরাঞ্চলকে ‘হাই ভ্যালু ক্রপের’ জন্য ছেড়ে দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলকে ধান ও পাট আবাদের জন্য কাজে লাগানো যাবে।

জানা যায়, পটুয়াখালীর কলাপাড়ার পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে মধ্যম মাত্রার লবণসহিষ্ণু দেশী পাট-৮ (৯ ডিএস/মিটার) এবং উচ্চ লবণাক্ততা সহিষ্ণু (১৪ ডিএস/মিটার) চারটি জাতের লাইন উদ্ভাবন করা হয়েছে। যা এখন পরীক্ষামূলকভাবে চাষাবাদ করা হচ্ছে। দেশী পাট-৮ জাত আবাদের সাফল্যে অর্থকরী এ ফসল আবাদের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলে অন্তত দুটি ফসল ফলানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।