ইউরোপে বাইসাইকেল রপ্তানিতে তৃতীয় বাংলাদেশ

এক দশক আগেও দেশের চাহিদা মেটাতে বাইসাইকেল আমদানি করতে হতো। সেই চিত্র এখন বদলে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের উৎপাদিত বাইসাইকেল ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও সাইকেল রপ্তানিতে শীর্ষ ৫টি দেশের মধ্যে একটি ছিল বাংলাদেশ। এ বছর সেটি তৃতীয় অবস্থান দখল করেছে। তবে বাংলাদেশের অবস্থান আগের চেয়ে এগিয়ে এলেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি গত বছরের চেয়ে কমেছে। শতাংশের হিসাবে সাইকেল রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমেছে ১৭.৫৪ ভাগ। সংশ্লিষ্টরা জানান, এর মাধ্যমে এটাই প্রমাণ করে বিশ্ববাজারে ক্রমেই শক্তিশালী অবস্থান করে নিচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি বাইসাইকেল। এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব বলে ইউরোপে সাইকেল জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় দুই চাকার এই বাহন রপ্তানির আশা দেখাচ্ছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের। বর্তমানে ইউরোপের অচলাবস্থা কেটে গেলে বাংলাদেশের সাইকেল রপ্তানি আরো বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে তৈরি পোশাকের মতো গোটা ইউরোপের বাজারও দখল করে নেবে বাংলাদেশের সাইকেল। তারা জানান, বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া বাইসাইকেলের ৮০ শতাংশই যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে। বাকিটা যায় ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশে।
জানা গেছে, ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে আমদানিকৃত বাইসাইকেলের ১১ শতাংশ বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে। এছাড়া ওই দেশগুলোর আমদানিকৃত বাইসাইকেলের ২৪ শতাংশ সরবরাহ করেছে তাইওয়ান, কম্বোডিয়া সরবরাহ করেছে ১৮ শতাংশ। আর ফিলিপাইন সরবরাহ করেছে ১০ শতাংশ। সেই হিসাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বাংলাদেশে উৎপাদিত বাইসাইকেল মূলত যুক্তরাজ্য, জার্মানি, হল্যান্ড, ইতালি, গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, বেলজিয়াম ডেনমার্ক, অস্ট্রিয়া, পর্তুগালে রপ্তানি হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্য মতে, ২০১৬ সালে সংস্থাটির ২৮টি দেশ মোট ১ কোটি ৭০ লাখ বাইসাইকেল আমদানি করেছে। এরমধ্যে ৫৮ শতাংশই সদ্য দেশগুলো থেকে আমদানি করেছে ওই ২৮ দেশ। আর বাকি ৪২ শতাংশ আমদানি করেছে ইউনিয়নের বাইরে থেকে। এছাড়া এই সময়ে ওই ২৮ দেশ ১ কোটি ১০ লাখ বাইসাইকেল রপ্তানি করেছে বলে ইইউ প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে। এদিকে সাইকেল রপ্তানিতে বাংলাদেশের বড় বাজার ইউরোপের দেশগুলো। প্রতি মাসে দেশ থেকে গড়ে ৮০-৮৫ কোটি টাকার সাইকেল রপ্তানি হচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা যায়, ২০০০ সাল থেকে বাইসাইকেল রপ্তানি শুরু হয়। প্রথম দিকে এ খাত থেকে তেমন আয় না হলেও ২০০৮ সাল থেকে বাড়তে শুরু করে রপ্তানি। তথ্যে দেখা গেছে, ২০০৯ সালে যেখানে ইউরোপের বাজারে বাইসাইকেল রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল নবম, সেখানে ২০১০ সালে বাংলাদেশ পঞ্চম স্থানে উঠে আসে। ২০১৪ সালেও সেই পঞ্চম স্থান ধরে রাখে বাংলাদেশ। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে বাংলাদেশ যথাক্রমে তিন লাখ ৭১ হাজার ও ৪ লাখ ১৯ হাজারটি বাইসাইকেল রপ্তানি করে। ২০০৭ সালে সংখ্যাটি ছিল ৩ লাখ ৫৫ হাজার। ২০১০ সালে রপ্তানি বেড়ে ৫ লাখ ছাড়িয়ে যায়। ২০১১ ও ২০১২ দুই বছরেই সাড়ে ৫ লাখের মতো সাইকেল রপ্তানি হয় ইউরোপের দেশগুলোতে। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে রপ্তানি ছাড়িয়ে যায় ৬ লাখ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাইসাইকেল রপ্তানিতেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি মেয়াদে বাইসাইকেল রপ্তানিতে আয় হয়েছিল ৫ কোটি ৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার সস্তা হওয়ায় তাইওয়ানের কোম্পানি আলিতা বাংলাদেশ লিমিটেড স্বল্প পরিসরে সাইকেল রপ্তানি শুরু করে। পরে এ ধারায় যুক্ত হয় মেঘনা গ্রুপ ও আরএফএল গ্রুপ। এখন আরো কিছু প্রতিষ্ঠানও সাইকেল উৎপাদন করছে। এর মধ্যে এইস বাইসাইকেল লিমিটেড, ট্রান্সওয়ার্ল্ড বাইসাইকেল কোম্পানি, সিরাজ বাইসাইকেল লিমিটেড, জার্মানি-বাংলাদেশ বাইসাইকেল, নর্থ বেঙ্গল সাইকেল ইন্ডাস্ট্রিজসহ অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মাউন্টেন বাইক, সিটি বাইক, ফ্রি স্টাইল, ট্র্যাকিং, ফোল্ডিং, বিচ ক্রুসার ও কিডস বাইক জাতীয় সাইকেল তৈরি হচ্ছে। এর একটি অংশ দেশের বাজারে ও বাকি অংশ রপ্তানি হচ্ছে। বর্তমানে ফ্রিস্টাইল, মাউন্টেন ট্র্যাকিং, ফ্লোডিং, চপার, রোড রেসিং, টেন্ডমেড ধরনের বাইসাইকেল রপ্তানি হচ্ছে। এসব সাইকেলের কিছু যন্ত্রাংশ আমদানি করা হলেও বেশির ভাগ যন্ত্রাংশই দেশে তৈরি হচ্ছে। বিশেষত চাকা, টিউব, হুইল, প্যাডেল, হাতল, বিয়ারিং, আসন তৈরি করছে দেশীয় এসব প্রতিষ্ঠান।
প্রাণ-আরএফএল’র বিপণন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা ইউরোপের বাজার নানান দিক দিয়ে সার্ভে করে দেখেছি সেখানে বাইসাইকেলের বিরাট বাজার আছে। সেই সুযোগটিই আমরা কাজে লাগাতে চাই। প্রাণ আরএফএল গ্রুপের ৮ ধরনের সাইকেল বাজারে রয়েছে। এগুলো হলো- এক্সটিম, গ্লাডিয়েটর, ডেইজি, ক্যামেলিয়া, নাইট, রায়ান, এক্সপ্রেস এবং অ্যাভেঞ্জার। দাম ৪ হাজার ২০০ টাকা থেকে ৭ হাজার ৪০০ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি মাসে দেশ থেকে গড়ে ৮০-৮৫ কোটি টাকার সাইকেল রপ্তানি হচ্ছে। বর্তমানে দেশের প্রকৌশল শিল্পজাত পণ্য রপ্তানিতে বাইসাইকেলের অবদান ৭.৫ শতাংশ।