কালো সুতি কাপড়ের ছাউনি, কাঠের বাঁট ধরে রেখেছে ঐতিহ্য

একটু পেছনে ফিরে যাওয়া চাই, এই তো সেদিনের কথা, ছাতা মানেই কাঠের বাঁট। ৩০-৩২ ইঞ্চি লম্বা বাঁটে কালো সুতি কাপড়ের ছাউনি। ২২, ২৪ এবং ২৬ ইঞ্চি ঘের। এই ঘেরের ভেতরে কত শত স্মৃতি! হ্যাঁ, দেশীয় ছাতা স্মৃতি হয়ে গিয়েছিল প্রায়। তবে এবারের বর্ষা, ভারি বর্ষণ পাল্টে দিয়েছে অনেক কিছু। চিন থেকে আমদানি করা হালকা রঙিন ছাতা ভিজে একাকার। কাজের কাজটি হচ্ছে না। তাই বিগত দিনের গৌরব আর ঐতিহ্য নিয়ে সামনে এসেছে দেশীয় ছাতা। তৈরি হচ্ছে অনেক। বিক্রিও ভাল।

চায়না ছাতার কথাটি বলে নেয়া যাক আগে। ছোট-খাটো দেখতে ছাতা। খুব রঙিন। সহজে আকর্ষণ করে। ব্যবহার শেষে কয়েক ভাঁজ করে রেখে দেয়া যায়। তার চেয়ে বড় কথা ‘চায়না মাল’ দামে কম। বাঙালী তাই বগলদাবা করে। বাংলাদেশের প্রকৃতিও কেমন যেন বদলে গিয়েছিল। বর্ষায় তেমন বৃষ্টি হতো না। চায়না ছাতায় মোটামুটি চালিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু এবার সেটি হচ্ছে না। বৃষ্টি থেকে গা বাঁচাতে মজবুত কাঠামো আর ভারি সুতি কাপড়ের ছাতার নিচে আশ্রয় নিচ্ছে বাঙালী!

এখনও সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রস্তুত করা হয় দেশীয় ছাতা। তবে প্রস্তুত ও বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল ঠিকানা ঢাকার চকবাজার। চক মোগলটুলি, ইমামগঞ্জ ও মিটফোর্ড এলাকার বিভিন্ন মার্কেটের ছাদ ও ভাড়া বাড়িতে সারা বছরই ছাতা তৈরি কাজ হয়। গোটা এলাকা ঘুরে প্রায় ১৬০টি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া যায়। হ্যাঁ, অনেক নামীদামী কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর পর দারুণ নাম করেছিল আলাউদ্দিন ছাতা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এটি আর বাজারে নেই। একই পরিণতি হয়েছে শফিউদ্দিন ছাতার। তবে নওয়াব ছাতা, জাহাজ মার্কা সানোয়ার ছাতা, শরীফ ছাতা, এটলাস ছাতা ও লাবণীসহ কয়েকটি ব্র্যান্ড ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কারখানা রয়েছে। বাকিরা কারিগরদের দিয়ে করিয়ে নিচ্ছেন। প্রতিদিন ১০০ মতো কারখানায় চলছে ছাতা তৈরির কাজ।

শরীফ ছাতার চকবাজারের কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, কুটির শিল্পের পরিবেশ। ছোট ছোট কামরায় ছাতা তৈরির কাজ হচ্ছে। কারিগরদের কেউ মোটা কালো কাপড় মাপমতো কাটছেন। কেউ ব্যস্ত সেলাইয়ে। ছাতার মূল কাঠামোর সঙ্গে ছোট হাতুড়ির ঠোকাঠুকির শব্দ আসছিল। সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছাতাগুলো আদি চেহারার। গঠনের দিক থেকে কোন ধরনের পার্থক্য বা পরিবর্তন নেই। ছাতা তৈরির কাজ তদারকি করছিলেন আঃ মতিন। তিনি জানান, বর্ষার অনেক আগে থেকেই ছাতা তৈরির কাজ হচ্ছে। তবে শ্রাবণের শুরু থেকে ভরা বর্ষা। প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে তাই চাহিদা বেড়ে গেছে। এখন প্রতদিন ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ ছাতা তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি।

কারখানায় তৈরি ছাতা সরাসরি চলে আসছে চকবাজারের শোরুমে। বিভিন্ন শোরুম ঘুরে দেখা যায়, দেশীয় ছাতার সুন্দর উপস্থাপনা। এম কে ছাতার কর্ণধার মজিদ আহম্মেদ বলেন, এখন সবাই চায়না ছাতা নিয়ে ব্যস্ত। অনেকে আবার মানহীন ছাতা তৈরি করছেন। চকবাজার ভরে গেছে এ ধরনের ছাতায়। যে যেমন পারছে ছাতা তৈরি করছে। এ অবস্থায় নিজেদের বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা কঠিন চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জে হারতে রাজি নন বলে জানান তিনি।

বহু দিনের পুরনো জাহাজ মার্কা সানোয়ার ছাতার শোরুমে বসেছিলেন মালিক হাজী মোঃ সানোয়ার মিয়ার ছেলে সিরাজ উদ্দিন দীপু। তিনি বলেন, এখন মাত্র তিন মাসের ব্যবসা। কোন রকমে চলার চেষ্টা করি। এবার বৃষ্টি বেশি হচ্ছে। হালকা ছাতা দিয়ে আর হচ্ছে না। তাই আমাদের দেশীয় ছাতার চাহিদা বেশ ভাল।

নওয়াব ছাতার এখন কোন কারখানা নেই। চায়না ছাতা সাজিয়ে রাখা হয়েছে দোকানে। তবে ঐতিহ্য থেকে পুরোপুরি সরে আসতে পারেনি। আছে দেশীয় ছাতাও। দোকানের কর্মী সালাউদ্দিন বলেন, সবাই চায়না ছাতা বিক্রি করে। আমাদেরও করতে হয়। তবে দেশীয় ছাতার প্রতি যে টান, সেটা কখনও নষ্ট হবে না।

দেশীয় ছাতার সর্বশেষ অবস্থা জানতে কথা হয় ছাতা প্রস্তুত ও বিক্রয়কারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, চায়না ছাতা অনেকেই রাখেন। কাস্টমাররা চায় বলেই রাখা। তবে দেশীয় ছাতাটা নিয়েই গর্ব করি আমরা। শোরুমে আলাদা করে সাজিয়ে রাখি। দেশীয় ছাতা অত্যন্ত মজবুত। অমাদের প্রকৃতি পরিবেশের সঙ্গে মানানসই। এ বছরের ভারি বর্ষণের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গত কয়েকদিন ভারি বৃষ্টি হলো। বড় বড় ফোটা। সঙ্গে ছিল বাতাস। তখন বিদেশী ছাতা কিন্তু কাজে আসেনি। দেশীয় ছাতা এখনও কুটির শিল্প পর্যায়ে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের সহায়তা পেলে আমরা হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে পারব।