‘আমি চাই আমার এই কাজটা অন্য মেয়েরা দেখুক’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী আঁখি আক্তার। অনার্স-মাস্টার্স শেষ করার পর বিয়ে। অনেক মেয়ের স্বপ্ন এখানে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আখি দেখে নতুন এক স্বপ্ন। নিজে কিছু করার স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্ন থেকেই একজন উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা। বর্তমানে অনলাইন ক্যাটারিং সার্ভিসের ক্ষেত্রে ঢাকার জনপ্রিয় একটি ব্র্যান্ড হয়ে উঠছে তার উদ্যোগে তৈরি ‘স্পাইসি চিটাগাং’। তার এই স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলা নিয়ে কথা হল মানবকণ্ঠের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার গ্রহণে রাফাত রহমান।

মানবকণ্ঠ: কবে থেকে এই ক্যাটারিং করার কথা মাথায় আসে?
আঁখি: ছোটবেলা থেকেই ব্যবসা দেখে বড় হয়েছি। আমার বাবা-শ্বশুর দুজনই ব্যবসায়ী। বিয়ের পর আমি যখন ইচ্ছ করেই চাকরীর প্রতি আগ্রহী হচ্ছিলাম না তখন আমার স্বামী জিজ্ঞাসা করল- কি করতে চাও? এ সময় ভাল ও নতুন কিছু রান্না করা আমার নেশায় পরিণত হয়েছিল। তাই ভাবলাম যে কাজটা প্রতিদিন করি, সেটা পেশা হিসেবে নিলে কেমন হয়? ব্যাস, এই চিন্তা মাথায় আসার কিছুদিন পরেই ফেসবুকে পেজ ওপেন করলাম বন্ধুদের ডাকলাম আমাকে সাহায্যের জন্য। পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে প্রথম কাজের অর্ডার পেলাম। সেখান থেকে যেই সাড়া আমি পেয়েছি, তারপর আর আত্মবিশ্বাসের অভাব হয়নি কোনদিন। সবচাইতে ভাল বিষয় হল আমার ক্লাইন্টরাই আমাকে নতুন ক্লাইন্ট জোগাড় করে দেয়। তারা আমার কাজে সন্তুষ্ট।

মানবকণ্ঠ : ক্যাটারিং সার্ভিস বিষয়টাকে এখনো এ দেশে অনেক ক্ষেত্রেই হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। আপনি কখনো এমন নামাজিক সমস্যায় পড়েননি?
আঁখি : আমি আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে নিয়েছি। বিষয়টাকে অনেকে যেভাবে ভাবছে, আমি তার চাইতে আলাদা করে ভাবার চেষ্টা করেছি। আমার কাছে কোন কাজই ছোট মনে হয়না। বিশেষত খাবার তৈরির কাজ। ফেসবুকে একটি মেয়ে অর্ডার দেয়ার সময় অবাক হয়েছিল আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা শুনে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বা ভাল কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেই আমাকে চাকরী করতে হবে, ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু করব না এমন নয়। বরং আমার এই ব্যবসার কাজটিকে আমি তুলনা করি আমার মায়ের কাজের মত। আমি একজন মায়ের কাজ করে উপার্জন করছি।

মানবকণ্ঠ: এই কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ কি ছিল?
আঁখি : অনলাইনে শুধুমাত্র বিশ্বাস করে খাবার অর্ডার দেয়া হয়, এটা আমাদের দেশের জন্য বেশ নতুন পদ্ধতি। সবার কাছে বিশ্বস্ত হিসেবে নিজের প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তোলা এবং গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এখনো খাবারের মান ধরে রাখা সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রতিষ্ঠানের জন্য বাজার ও রান্না সরাসরি আমি নিজ হাতে করি। আমার স্বামীও আমাকে সাহায্য করে।

মানবকণ্ঠ : আপনার এই উদ্যোগে কার প্রেরণা ছিল সবচেয়ে বেশি?
আঁখি : আমার হাসবেন্ড। ও ছাড়া আমি কিছুই না। ও হল আমার পাওয়ার ব্যাংক। এ ছাড়াও আমার শশুর-শ্বাশুরিও আমাকে এই কাজে প্রেরণা দেয়। আমার শ্বশুর একজন ব্যবসায়ী। তিনি আমার কাজে খুবই খুশি।

এ ছাড়াও ক্লায়েন্ট রিভিউ আমাকে বেশ প্রেরণা দেয়। তারা আমার কাজের যখন প্রশংসা করে তখন অনুপ্রেরণা পাই।

মানবকণ্ঠ : পরিবার ও আপনার পরিচিত মানুষেরা এই কাজটিকে কিভাবে দেখে?
আঁখি : আমার বাবা এবং পরিবারের পক্ষ থেকে ইচ্ছা ছিল আমি যেন অফিসিয়াল কোন চাকরী করি। তাই এই ব্যবসায় নামার সময় তারা প্রথমে চিন্তিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে আমার সফলতায় তারাও খুশি। তাদের ইচ্ছা ছিল, মেয়ে যেন সফল হয়। তাদের সেই ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা করছি।

আমার এই কাজ নিয়ে পরিচতদের কেউ কেউ বাঁকা হাসি হেসেছেন। বলেছেন এইগুলা শিক্ষিত মানুষের কাজ না। কিন্তু আমি আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করেছি। এখনো করে যাচ্ছি।

মানবকণ্ঠ : আপনার (এই কাজ নিয়ে) ভবিষ্যৎ স্বপ্ন কি?
আঁখি: আমি চাই নিজের একটা বড় আঙ্গিকে ক্যাটারিং সার্ভিস থাকবে। এই দেশে প্রথম নারী মালিকানাধীন এবং নারী পরিচালিত ক্যাটারিং সার্ভিস।

আমি চাই আমার এই কাজটা অন্য মেয়েরা দেখুক। তারাও এমন কাজে এগিয়ে আসুক। আত্মসম্মান বোধ নিয়ে যে কোন কাজের উদ্যোগ নেয়া সম্ভব। নারীদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু থাকবে না। তারা চাইলে সব ক্ষেত্রেই কাজ করতে পারে।

আর গত ১২ বছর ধরে আমার বাবা প্যারালাইজড। আমি চাই সে আমাকে সফল হিসেবে দেখে যাক।

মানবকণ্ঠ : বর্তমান প্রজন্মের জন্য কি বলতে চান?
আঁখি: যে কাজটা ভাল লাগে সেই কাজটাই যেন সবাই করে। আত্মবিশ্বাস ও ভাল লাগা থাকলে যে কোন কাজে সফলতা আসবেই। কাজকে সম্মান করতে হবে এবং সময়ের সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে।

***

উদ্যোক্তার পরিচিতি : আঁখি আক্তার
বাবা: মো. নুরুল আলম
মা: শিরিনা আক্তার
স্বামী: মোহাম্মদ হোসেন রাজু
লেখপড়া:
এস.এস.সি (২০০৫) মতিঝিল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। মানবিক শাখা।রেজাল্ট ৪.৫।
এইচ.এস.সি (২০০৭): ভিকারুন নিসা নুন কলেজ।মানবিক শাখা, রেজাল্ট ৪.৩০।
অনার্স (২০০৭-০৮): চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নৃবিজ্ঞান বিভাগ। রেজাল্ট- ফার্স্টক্লাস।
মাস্টার্স ২০১২: চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নৃবিজ্ঞান বিভাগ। রেজাল্ট- ফার্স্টক্লাস।

ব্যবসার বর্তমান ব্যপ্তী: ১ বছর ৭ মাস

মানবকণ্ঠ/আরএ/আরএস