শিশুদের ব্যাংক হিসাবে হাজার কোটি টাকা

তানিশা আনজুম অর্পিতা। মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ইসাপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। সে ব্যাংক এশিয়ার গ্রাহকদের একজন। ২০১৫ সালের শুরুতে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে অর্পিতার স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলেন তার অভিভাবক।

কেন মেয়ের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হলো, এমন প্রশ্ন ছিল অর্পিতার পিতা রফিকুল ইসলামের কাছে। পেশায় ব্যবসায়ী ওই অভিভাবক বললেন, যখন শুনলাম বাচ্চাদের নামে হিসাব খোলা যাচ্ছে, তখনই মেয়ের নামে হিসাব খোলা হলো। নিজের মেয়ের নামে একটা ব্যাংক হিসাব থাকবে, এটাই আনন্দের। এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার ব্যাংকিং করার অভ্যাস গড়ে উঠবে।

শুধু অর্পিতা নয়, তার মতো প্রায় ১২ লাখ শিশু স্কুল ব্যাংকিং সেবায় হিসাব খুলেছে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে। শিক্ষার্থীদের খোলা হিসাবগুলোতে গত ডিসেম্বর শেষে জমা পড়েছে ১ হাজার ২১ কোটি টাকা।

খুদে শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়তে ২০১০ সালে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরুর পরামর্শ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ছোট এই উদ্যোগ আজ মহিরুহে পরিণত হয়েছে। ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সের শিশুরা যাচ্ছে ব্যাংকের শাখায় শাখায়। যদিও এই উদ্যোগের প্রথম বছরে স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা হয়েছিল ২৯ হাজার ৮০টি। দেড় লাখ স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খুলতে সময় লেগেছিল আড়াই বছর।

শুরুতে মাত্র ১০ টাকা জমা রেখে স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা যেত। তবে ২০১৩ সালে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। যাতে বলা হয়, কমপক্ষে ১০০ টাকা জমা করে স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খুলতে হবে। ৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা এ হিসাব খুলতে পারবে। শিক্ষার্থীদের পক্ষে অভিভাবকেরা এসব হিসাব পরিচালনা করতে পারবেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, হিসাব খোলায় শীর্ষে ইসলামী ব্যাংক ও জমা টাকায় শীর্ষে রয়েছে ডাচ্-বাংলা।

এ সেবার আওতায় ইসলামী ব্যাংকে ২ লাখ ১৩ হাজার ৬২৩, অগ্রণী ব্যাংকে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪০৩, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকে ১ লাখ ২৩ হাজার ১৭২, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ৯৯ হাজার ৪২ ও উত্তরা ব্যাংকে ৭৮ হাজার ৯৮১ হিসাব খোলা হয়।

সবচেয়ে বেশি টাকা জমা রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে। ব্যাংকটিতে জমা রয়েছে ৩৪২ কোটি টাকা। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংকের স্কুল ব্যাংকিং হিসাবে জমা পড়েছে ১০৫ কোটি টাকা, ইস্টার্ন ব্যাংকে ৯১ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে ৫৫ কোটি টাকা ও রূপালী ব্যাংকে ৫৪ কোটি টাকা।

ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মো. শিরিন বলেন, ‘সরকারের বিভিন্ন বৃত্তির টাকা আমাদের মাধ্যমে বিতরণ হয়। এ ছাড়া আমাদের মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং ও ব্যাংক শাখার মাধ্যমে স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা হয়। বিভিন্ন আকর্ষণীয় প্রকল্প থাকায় শিক্ষার্থীরা স্কুল ব্যাংকিংয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছে।’

স্কুল ব্যাংকিং হিসাবে ভালো অঙ্কের টাকা জমা হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আর্থিক শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিতে চাইছে। এর অংশ হিসেবে জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে আর্থিক শিক্ষাবিষয়ক অধ্যায় যুক্ত করতে শিক্ষাসচিবকে চিঠি দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী। ওই চিঠিতে বলা হয়, একুশ শতকের প্রথম দশক বিশ্বব্যাপী জনগণের মাঝে আর্থিক শিক্ষা বিস্তারের জন্য পরিচিত। সঠিক আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আর্থিক সচেতনতা, জ্ঞান, দক্ষতা, মনোভাব ও আচরণের উন্নয়ন অপরিহার্য। অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধারাবাহিক আর্থিক শিক্ষার মাধ্যমেই সম্ভব। বাংলাদেশের চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ধাপে ধাপে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে আর্থিক শিক্ষাবিষয়ক অধ্যায় অন্তর্ভুক্তি যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ আর্থিক শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে এস কে সুর চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের স্কুল ব্যাংকিং আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচিত। বাংলাদেশের এত পরিমাণ শিশুর ব্যাংক হিসাব রয়েছে, এটা একটা বড় অর্জন। ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করায় এটা সম্ভব হয়েছে।’