টাকা পাওয়ার পথ সুগম হলো বাংলাদেশের

মেক্সিকোর কানকুনে ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে ১০০ কোটি ডলারের যে সবুজ জলবায়ু তহবিল (জিসিএফ) গঠন করা হয়েছিল তা থেকে টাকা পাওয়ার পথ সুগম হলো বাংলাদেশের জন্য। গত ৬ জুলাই দক্ষিণ কোরিয়ার সংদুতে জিসিএফের ২৪ সদস্যের বোর্ডসভায় বাংলাদেশের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কম্পানি লিমিটেডকে (ইডকল) এ তহবিল থেকে টাকা পাওয়ার জন্য সরাসরি আবেদন করার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এত দিন বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাকে অনুরোধ করে তাদের মাধ্যমে আবেদন করত বাংলাদেশ সরকার। জিসিএফ তহবিল গঠনের পর সাত বছরের চেষ্টায় অবশেষে বাংলাদেশের কোনো সংস্থা সবুজ জলবায়ু তহবিলের ন্যাশনাল ইমপ্লিমেন্টিং এন্টিটি বা (এনআইই) মর্যাদা পেল।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক কোনো জলবায়ু তহবিলে বাংলাদেশি সংস্থার এমন স্বীকৃতি এই প্রথম। এই স্বীকৃতি সম্মানের, মর্যাদার। ইডকলকে দেওয়া এনআইই স্বীকৃতি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।

এনআইই ঘোষণার পর এখন ইডকল বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত যেকোনো প্রকল্প সরাসরি জিসিএফ বোর্ডে পাঠাতে পারবে। জিসিএফ বোর্ডের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনাও করতে পারবে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবুজ জলবায়ু তহবিল গঠনের পর সাত বছর ধরে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাকে অনুরোধ করে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে জিসিএফ তহবিলে টাকা পাওয়ার জন্য প্রস্তাব পাঠিয়ে আসছিল সরকার। এ সময় জিসিএফ তহবিল থেকে মাত্র ৩২০ কোটি টাকা পেয়েছে বাংলাদেশ। ইডকলকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে আগামীতে তহবিল থেকে আরো বেশি টাকা পাওয়ার পথ সুগম হলো।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সবুজ জলবায়ু তহবিলের টাকা পেতে সরাসরি আবেদনের জন্য বাংলাদেশ থেকে সরকারি ও বেসরকারি ছয়টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছিল। সেগুলো হলো পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও ইডকল। আবেদন যাচাই-বাছাই করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইডকলকে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দিয়েছে জিসিএফ বোর্ড।

তবে একাধিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, ইডকল সাধারণত মিটিগেশন বা প্রশমন খাতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে। যেমন, সোলার সিস্টেম। ইডকলের অভিযোজন খাতে প্রকল্প নেওয়া এবং বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা নেই। বাংলাদেশ গুরুত্ব দিচ্ছে অভিযোজন খাতের প্রকল্পকে। আর উন্নত বিশ্ব বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশের ওপর প্রশমন খাতে প্রকল্প দেওয়ার চেষ্টা করছে। কারণ, এর মাধ্যমে তাদের দেশের প্রযুক্তি বাংলাদেশে দেওয়া যাবে। এ কারণে অন্য সংস্থাকে না দিয়ে ইডকলকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যাতে সংস্থাটিকে দিয়ে প্রশমন খাতে প্রকল্প নেওয়া যায়। যদিও আরো যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান জিসিএফ তহবিলে আবেদনের স্বীকৃতির অপেক্ষায় আছে, তারাও ধীরে ধীরে এনআইইর স্বীকৃতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ইডকলের উপপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জিসিএফ বোর্ডকে দলিল-দস্তাবেজ দিয়ে আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রকল্প কিভাবে প্রণয়ন করতে হয়, কিভাবে নকশা প্রণয়ন করতে হয়। এ ছাড়া আমাদের আর্থিক আয়-ব্যয়ের হিসাব অত্যন্ত স্বচ্ছ, এ বিষয়েও প্রমাণ দেওয়া হয়েছে। আমাদের জবাবদিহি আছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতাও আছে। এক কথায়, তারা যেসব শর্ত চেয়েছে, আমরা সেসব শর্ত পূরণ করতে সক্ষম হয়েছি। সে কারণে জিসিএফ বোর্ড আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য বিরাট অর্জন। ’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জলবায়ু অর্থায়ন সেলের পরিচালক জাকির হোসেন খান কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো সংস্থাকে জিসিএফ থেকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, এটা অনেক বড় প্রাপ্তি। তবে মনে রাখতে হবে, ইডকল সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, বেসরকারি। এতেই প্রমাণিত হয়, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান এনআইই পেতে আন্তরিক নয়। ইডকল যেমন এনআইই পেতে যতটা পরিশ্রম করেছে, ততটা সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দেখা যায় না।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সবুজ জলবায়ু তহবিল (জিসিএফ) বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় এলাকায় বসবাসরত দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য এ তহবিল থেকে অর্থ পেতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। ২০০৯ সালে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (কপ ১৫) প্রথম সবুজ জলবায়ু তহবিল গঠনের বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। ওই সম্মেলনেই অংশগ্রহণকারী সব দেশ তহবিল গঠনে একমত হয়। পরের বছর মেক্সিকোর কানকুনে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (কপ ১৬) এ তহবিল গঠন করা হয়। শিল্পোন্নত দেশগুলো তহবিলে ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং প্রতিবছর এ তহবিল থেকে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি ডলার ছাড় করার ঘোষণা রয়েছে।

কিসের ভিত্তিতে একটি প্রতিষ্ঠানকে এনআইই করা হয় জানতে চাইলে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এ কে এম মামুনুর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রথম শর্ত হলো, সংস্থাটির জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবেলায় আগে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা আছে কি না, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার জন্য নেওয়া প্রকল্পের নকশা ঠিক আছে কি না, সংস্থার আর্থিক লেনদেন স্বচ্ছ কি না, নিয়মিত অডিট হয় কি না এবং পরিবেশ ও সামাজিক ঝুঁকি নির্ণয়ের সক্ষমতা আছে কি না। এসব দেখার পর একটি সংস্থাকে এনআইইর স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

সরকারি সংস্থার মধ্যে এসব স্বচ্ছতার ঘাটতি আছে বলে মনে করেন মামুনুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘ইডকল সাধারণত কাজ করে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন খাতে। অভিযোজন খাতে তাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। যেমনটা আছে পিকেএসএফ ও এলজিইডির। উন্নত বিশ্বের একটা চেষ্টা থাকবে ইডকলকে দিয়ে প্রশমন খাতে প্রকল্প দেওয়ার জন্য। কিন্তু আমাদের জন্য জরুরি অভিযোজন খাত। সে জন্য যত দ্রুত সম্ভব পিকেএসএফ ও এলজিইডির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোরও এনআইই পাওয়া জরুরি। ’

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ইডকলকে এনআইই স্বীকৃতি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।

প্রসঙ্গত, সবুজ জলবায়ু তহবিলের ২৪ সদস্যের বোর্ডে ১২ জন সদস্য প্রতিনিধিত্ব করে উন্নত বিশ্ব থেকে। বাকিরা উন্নয়নশীল দেশ থেকে।