রুপালি শস্যের উৎপাদন

দারুণ রুপালি ঝিলিক, লোভনীয় রসনা-তৃপ্তকর স্বাদ এবং অতিথি আপ্যায়নে বাঙালীর বিশেষ খাদ্য-ঐতিহ্যÑ সব মিলিয়ে জাতীয় মাছ ইলিশের বিশেষ কদর রয়েছে। শর্সে ইলিশ, ইলিশ পাতুড়ি, ইলিশ ভাজাÑ জিভে জল আসার মতোই সব রেসিপি। বাঙালীর ইলিশপ্রেম নিয়ে নানা কথা চালু রয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রফতানি আয় বাড়ানো এবং আমিষের চাহিদা মেটানোর জন্য ইলিশের ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে। উপকূলীয় মৎস্যজীবীদের জীবিকার প্রধান উৎসই হচ্ছে ইলিশ। প্রায় পাঁচ লাখ জেলে সরাসরি ইলিশ আহরণে নিয়োজিত। ২০-২৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে এর সঙ্গে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বঙ্গোপসাগর তীরের ভারত-মিয়ানমার, আরব সাগর তীরের বাহরাইন-কুয়েত, পশ্চিম মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের পাশে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মেকং অববাহিকার ভিয়েতনাম-কম্বোডিয়া, চীন সাগরের পাশে চীন ও থাইল্যান্ডে ইলিশের বিচরণ কমছে। আর বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন প্রতি বছর আট থেকে দশ শতাংশ হারে বাড়ছে। এখন বিশ্বের মোট ইলিশের শতকরা ৬৫ ভাগই উৎপাদিত হচ্ছে বাংলাদেশে।

ইলিশের বিচরণক্ষেত্র সম্প্রসারণের বিষয়টি বেশ ক’বছর যাবত আলোচিত হচ্ছে। আগে চারটি জেলার মাত্র ২০টি উপজেলায় ইলিশ সংরক্ষণ কার্যক্রম থাকলেও এখন তা ২৯টি জেলার ১৫০টি উপজেলায় সম্প্রসারণ করা হয়েছে। মাছটির উৎপাদন বাড়াতে নতুন অভয়াশ্রম চিহ্নিত করার পাশাপাশি সেগুলোর সুরক্ষার কাজও চলছে। ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে নতুন বিচরণক্ষেত্র চিহ্নিত করে সেগুলোকে অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ইলিশের নতুন বিচরণক্ষেত্র চিহ্নিত করতে গবেষণা কার্যক্রম বাড়াতে হবে। পাশাপাশি এগুলোর যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থাও নিতে হবে। জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো গেলে ইলিশ উৎপাদন আরও বাড়বে। ইলিশ উৎপাদন ও আহরণ বাড়াতে সরকার ইতোমধ্যেই বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়েছে। তা বাস্তবায়নের জন্য প্রজনন পয়েন্ট ও অভয়াশ্রম এলাকা প্রয়োজনে বাড়াতে হবে। জেলে, স্থানীয় প্রশাসন ও কোস্টগার্ডের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সুরক্ষিত করা হচ্ছে এসব অভয়াশ্রম। বিদ্যমান অভয়াশ্রমগুলোয় বছরের নির্দিষ্ট সময় ইলিশ ও জাটকা ধরা নিষিদ্ধ থাকায় কয়েক বছর ধরেই দেশে মাছটির উৎপাদন বাড়ছে। মৎস্য অধিদফতরের হিসাবে, ২০০১-০২ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ২০ হাজার টন। ২০১৩-১৪ অর্থবছর উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮৫ হাজার টনে। পরের অর্থবছর তা আরও দুই হাজার টন বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮৭ হাজার টনে। আর গত অর্থবছর দেশে ইলিশ উৎপাদন হয় ৩ লাখ ৯৪ হাজার টন। এটা অনস্বীকার্য যে প্রজনন পয়েন্ট ও অভয়াশ্রমে নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় প্রতি বছরই ইলিশ উৎপাদন বাড়ছে। তবে ইলিশের এ উৎপাদন আরও বাড়াতে অভয়াশ্রমের কোন বিকল্প নেই। উৎপাদন বাড়াতে বৈজ্ঞানিক সব পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে চলেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ইলিশসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় ৯৭২ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্প নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মাধ্যমে দাদনের (ঋণ) জাল ও মহাজনদের হাত থেকে জেলেদের মুক্ত করা হবে। পাশাপাশি জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, মৎস্য সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ ও ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা হবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প প্রস্তাব জমা দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। ইতোমধ্যে অনুমোদনের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। মানুষের প্রত্যাশা প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থ যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার মাধ্যমে দেশের সুনাম আরও প্রসার লাভ করবে।