চট্টগ্রাম কাস্টমসে চালু হচ্ছে আলাদা স্ক্যানিং বিভাগ

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি শতভাগ স্ক্যানিংয়ের আওতায় আনতে ১৮৩ জন নতুন লোকবল নিয়োগ ও বন্দরের প্রতিটি গেটে স্ক্যানার বসানোর পাশাপাশি আলাদা একটি বিভাগ চালু করতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। সম্প্রতি এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) একটি কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। নিয়ম থাকলেও দীর্ঘদিন ধরেই প্রশিক্ষিত লোকবল ও পর্যাপ্ত স্ক্যানার সংকটে পণ্যবাহী ৫৫ শতাংশ কনটেইনারকে স্ক্যানিংয়ের আওতায় আনতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, শতভাগ কনটেইনার স্ক্যানিংয়ের আওতায় আনতে গত মার্চে আলাদা একটি বিভাগের কাঠামো অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও এনবিআরে পাঠানো হয়। এতে ১৮৩ জন লোকবল নিয়োগ, ১২টি গেটের জন্য ১২টি স্ক্যানার মেশিন, ১০টি বিস্ফোরক পদার্থ শনাক্তকারী যন্ত্র, সাতটি মাইক্রোবাস, ৩৭টি কম্পিউটারসহ সিসিটিভি, টেলিফোন ও আনুষঙ্গিক আরো কিছু বিষয় সম্পর্কে বলা হয়।

এতে আরো বলা হয়, নবগঠিত স্ক্যানিং বিভাগের কনটেইনার স্ক্যানিং ও বিস্ফোরক পদার্থ শনাক্তকারী যন্ত্র পরিচালনার জন্য একজন অপারেশন ম্যানেজার, একজন কম্পিউটার অপারেশন সুপারভাইজার, একজন সিনিয়র কম্পিউটার অপারেটর নিয়োজিত থাকবেন। প্রতিটি বিস্ফোরক পদার্থ শনাক্তকারী যন্ত্র পরিচালনার জন্য দুজন কম্পিউটার অপারেটর ও দুজন ট্রাফিক কো-অর্ডিনেটর (সমন্বয়কারী) পদ রাখা হয়েছে। মোট ৮০ জন কম্পিউটার অপারেটর ও ৮০ জন ট্রাফিক কো-অর্ডিনেটরসহ পুরো বিভাগে মোট ১৮৩ জন চার শিফটে ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার হোসেন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের ১২টির গেটের মধ্যে মাত্র চারটিতে স্ক্যানার রয়েছে। এসব স্ক্যানার দিয়ে অর্ধেকের মতো কনটেইনার স্ক্যানিং করা সম্ভব হয়। তাছাড়া স্ক্যানিং বিভাগের জন্য আলাদা লোকবল না থাকায় সার্বক্ষণিক তদারকিও সম্ভব হয় না। এনবিআর থেকে এ বিষয়ে করণীয় জানতে চাইলে আমরা আলাদা একটি ডিভিশনসহ ১৮৩ জন লোকবল নিয়োগের একটি কাঠামো পাঠিয়েছি। দেশ ও বন্দরের নিরাপত্তার পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ে এ স্ক্যানিং বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ অবদান করবে। আশা করি, শিগগিরই এর বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।’

তথ্যমতে, চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন প্রকল্পের আওতায় অঘোষিত ও বিস্ফোরক জাতীয় পণ্য আমদানির পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে ২০০৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে স্ক্যানিং বাধ্যতামূলক করা হয়। বাধ্যতামূলক হলেও শুরু থেকেই স্ক্যানার সংকটের অজুহাতে রফতানি পণ্যবাহী কনটেইনারগুলোকে স্ক্যানিংয়ের আওতায় আনা হয়নি। এছাড়া কমলাপুর আইসিডি, বেনাপোল ও খুলনা কাস্টমস স্টেশনে কোনো স্ক্যানার মেশিন না থাকায় সেখানেও পণ্যবাহী কনটেইনারের স্ক্যানিং সম্ভব হচ্ছে না। চট্টগ্রাম বন্দর, কমলাপুর আইসিডি, বেনাপোল ও খুলনায় শুল্কস্টেশনের জন্য সাত মাস আগে চারটি স্ক্যানার আনা হলেও তা এখনো বসানো হয়নি। স্ক্যানিং সংকট নিরসনে গত নভেম্বরে চীনের ৬৪ কোটি টাকার অনুদানে অত্যধুনিক এসব স্ক্যানার মেশিন আনা হয়।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের একটি প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, গত নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি হওয়া ৯ লাখ ২ হাজার ৪৭০টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। পর্যাপ্ত স্ক্যানার না থাকায় স্ক্যানিংয়ের আওতায় আনা গেছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৮৯ কনটেইনার। বাকি ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৭৮১টি কনটেইনার স্ক্যানিং করা যায়নি, যা মোট আমদানি-রফতানি কনটেইনারের ৫৫ শতাংশ। এসব কনটেইনার স্ক্যানিং বাবদ কাস্টমস আয় করেছে ২৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।

সাড়ে পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু স্ক্যানিং সংকটের কারণে কোনো ধরনের স্ক্যানিং বা তদারকি ছাড়াই ছাড়করণ এবং জাহাজীকরণ হয়েছে ৩৭ লাখ ৮১ হাজার রফতানি পণ্যভর্তি কনটেইনার, যা মোট হ্যান্ডলিং হওয়া কনটেইনারের প্রায় অর্ধেক।

চট্টগ্রাম বন্দরের স্ক্যানিংয়ের দায়িত্বে থাকা সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান এসজিএসের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মোট ১২ লাখ ১ হাজার ৫৯৪টি কনটেইনার স্ক্যানিং করা হয়েছে।

এর মধ্যে সন্দেহজনক পণ্য আনার অভিযোগে আটক হয়েছে ৭ হাজার ৪৪৮টি কনটেইনার।

এসব কনটেইনারে ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আনার পাশাপাশি বিস্ফোরক দ্রব্য, মাদক ও আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য থাকার প্রমাণ পাওয়ায় মামলাসহ জরিমানা আদায় করেছেন কাস্টম কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চেম্বারের চেয়ারম্যান মাহফুজুল হক শাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই চট্টগ্রাম বন্দরের ১২টি গেটের মধ্যে মাত্র চারটি দিয়ে পণ্যবাহী কনটেইনার স্ক্যানিং করা হচ্ছে। ফলে সঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ নেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিটি গেটে স্ক্যানার বসানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সম্প্রতি স্ক্যানিং বিভাগ চালুর যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা যত দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব ততই ভালো। এতে বন্দর ও দেশের নিরাপত্তা বাড়ার পাশাপাশি অবৈধ বা বিস্ফোরক পদার্থ প্রবেশ প্রতিরোধ সম্ভব হবে।