বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আমের অবদান

আম ফলের রাজা। একটি উত্কৃষ্ট সুস্বাদু ফল হিসেবে আমের বাণিজ্যিক গুরুত্ব অপরিসীম। তথ্যমতে, আম উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশে আমের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। তবে রাজশাহী বিভাগের চারটি জেলায় আম অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিগণিত। এসব জেলার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জকেই বলা হয় আমের রাজধানী। কারণ এখানকার নয়নাভিরাম আমবাগান দেখলে যে কেউ মুগ্ধ না হয়ে পারেন না। আমের মৌসুমে আমবাগানের যে প্রান্তে দৃষ্টি দেওয়া যায়, চারদিকেই দেখা যায় শুধু থোকা থোকা আম। এ দৃশ্য দেখে তখন মানুষের মন ভরে যায়, হৃদয় জুড়িয়ে যায়।

রাজশাহী বিভাগের আমের ফলন সর্বাধিক। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জেই দেশের সবচেয়ে বেশি আম উত্পন্ন হয়। একই সঙ্গে রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোরও আমের জন্য বিখ্যাত। উল্লেখ্য, এসব জেলায় পরিকল্পিতভাবে বাগান তৈরি করা চাষিদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। মাটি ও প্রকৃতির অনুকূল পরিবেশের কারণে এসব অঞ্চলে আমের চাষ হয়ে আসছে। যে কারণে আমের বাগান করা এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান আকর্ষণ। আর এতে কম-বেশি সবাই লাভবান হচ্ছে। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে রাজশাহীর এ চার জেলায় তিন লাখ ৮৬ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়। সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আমের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ছয় লাখ ৩৮ হাজার ৮৮৮ মেট্রিন টন। অর্থাৎ পাঁচ বছরে এ অঞ্চলে আমের উৎপাদন বাড়ে প্রায় দ্বিগুণ। চলতি অর্থবছরে আমের ফলন ভালো হয়েছে। আরো এক তথ্য থেকে জানা যায়, দেশে প্রতিবছর প্রায় এক মিলিয়ন বা ১০ লাখ টন আম উৎপাদন হয়। ২০১৬ সালে দেশ থেকে ৩০০ টন আম রপ্তানি হয়েছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আম উৎপাদনে দেশে নীরব বিপ্লব ঘটছে। উৎপাদন বৃদ্ধিতে নিত্যনতুন প্রযুক্তির প্রভাবে এমন বিপ্লব ঘটেছে বলে তাঁরা মনে করেন।

এ ছাড়া আরো এক তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে আমের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার। শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমকে কেন্দ্র করে বছরে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই বছরে বিক্রি হয় প্রায় ছয় কোটি টাকার আমের চারা। এখানে নতুন নতুন আমবাগান বৃদ্ধির পাশাপাশি এর সঙ্গে মানুষের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ বাড়ছে। আমের মৌসুমে এখানে আট থেকে ১০ লাখ লোক আমগাছ পরিচর্যা, বাগান পরিষ্কার রাখা, আম সংগ্রহ, বিক্রি ও পরিবহন ইত্যাদি কাজ করে এবং প্রাপ্ত আয় দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে।

বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে আমকে কেন্দ্র করে তখন নানা রকমের কর্মচঞ্চলতা বেড়ে যায়। আর এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, আমবাগান কেনাবেচা, বাগান লিজ দেওয়া, বাগান পরিচর্যা, বাগান পাহারা দেওয়া, আম বহন করা, আড়তদারি, ঝরা আমের কারবার, আমের ঝুড়ি তৈরি ও প্যাকিং করা ও অস্থায়ী হোটেল ব্যবসা। সেখানকার শুধু পুরুষরাই নয়, নারী থেকে শিশুরাও তখন আমকেন্দ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। আরো উল্লেখ্য, আম কেটে শুকিয়ে তৈরি করা আমচুর কিংবা আমস্বত্বেরও রয়েছে কোটি টাকার বাজার। দেশে আমের জুস তৈরি করছে কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান। এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রতিবছরই উৎপাদিত আমের ১৫-২০ শতাংশ সংগ্রহ করছে, যা ক্রমেই দেশীয় বাজারকে শক্তিশালী করে তুলছে। শুধু তা-ই নয়, তারা দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে এসব জুস। জুস রপ্তানি হচ্ছে মূলত সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, দুবাই, আরব আমিরাত, আবুধাবি, বাইরাইন, ওমান, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের বাজারে।

আম যে শুধু আমাদের পুষ্টি চাহিদাই পূরণ করছে তা নয়, এখন বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনেও সহায়ক ভূমিকা রাখছে। যে কারণে আম উৎপাদনে চাষিদের মনোযোগ বাড়ছে। পাশাপাশি এটাও জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতিবছর উৎপাদিত আমের ৩৩ শতাংশ নষ্ট হয়ে যায়। এর অন্যতম কারণ পরিবহন, প্রক্রিয়াকরণ ও হিমাগারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকা। বর্তমানে দেশে আমের যথেষ্ট বাজার রয়েছে। তাই ৩৩ শতাংশ আম নষ্ট না হলে ও রপ্তানির সুযোগ আরো বেশি কাজে লাগানো গেলে এ বাজারের আর্থিক মূল্য অনেক বেড়ে যাবে, এতে কোনো সন্দেই নেই।

কাজেই আম সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এর পাশাপাশি এ ফল সংরক্ষণে কেমিক্যালের ব্যবহারের ব্যাপারেও সর্তক থাকতে হবে। কারণ ফল সংরক্ষণে ফরমালিন ব্যবহারের কারণে দেশে মানুষের মধ্যে অনেক ভুল-বোঝাবুঝি রয়েছে। কিন্তু সারা দুনিয়াতেই ফল ও শাকসবজি সংরক্ষণে কিছু পরিমাণ প্রিজারভেটিভ বা রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হয়। যেমন—আমে প্রকৃতিগতভাবেই ১.২২ থেকে ৩.০৮ পিপিএম পর্যন্ত ফরমালিন রয়েছে। এটি মানব শরীরের জন্য মোটেও ক্ষতিকর নয়। তেমনি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রিজারভেটিভও শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে এ রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন, যার ভিত্তিতে সেটি ব্যবহার করা যাবে। আর তা না হলে এ ধরনের ঢালাও প্রচারণায় উভয় দিকেই ক্ষতি হবে। বস্তুত এসব নেতিবাচক প্রচারণার কারণে মানুষ ফলে খেতে ভয় পায়, ফল খাওয়া কমিয়ে দেয়। অথচ সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রত্যেকের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ফল খাওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে এ নেতিবাচক প্রচারণার কারণে ফল চাষি বা ফল ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতি।

প্রসঙ্গত আরো উল্লেখ করতেই হয়, আমাদের দেশে কাঁচামাল দীর্ঘদিন রাখার জন্য হিমাগার খুবই জরুরি। কারণ দেশে আম সংরক্ষণের জন্য এখনো তেমন কোনো হিমাগার গড়ে ওঠেনি। আমের বাম্পার ফলনের বছর আম সংরক্ষণের অভাবে পরিবহনের অনিয়মের জন্য প্রচুর আম নষ্ট হয়। কম দামে তখন আম বিক্রি ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে, সাধারণ পরিবহন ও হিমায়িত পরিবহন এক কথা নয়। সাধারণভাবে পরিবহনের ক্ষেত্রে আমাদের যোগাযোগের অসুবিধার জন্য প্রচুর পরিমাণে আম নষ্ট হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আম ও আমজাত পণ্য পরিবহনের জন্য হিমায়িত পরিবহনের ব্যবস্থা রয়েছে। তাই আমকে শিল্প হিসেবে গণ্য করে তাকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিপণন করতে পারলে এটা লাভজনক শিল্প হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এমনকি আম গার্মেন্টশিল্পের মতো প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে বিশেষ অবদান রাখবে।