অনিশ্চয়তা কাটিয়ে চীন ও জাপানের বিনিয়োগ আসছে

চুক্তি অনুযায়ী চীন ও জাপানের বিনিয়োগ আসা শুরু হয়েছে। দেশ দুটির বেসরকারী খাতের উদ্যোক্তারাও বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। হলি আর্টিজান ইস্যুতে সরকারী পদক্ষেপে সন্তুষ্ট বিদেশীরা। বিশেষ করে জাপান বিগ-বি ইনিশিয়েটিভের আওতায় বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব’ গড়ার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল তা এগিয়ে নিতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এক্ষেত্রে চীন জাপানের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার। চলতি অর্থবছরের মধ্যে যাতে জাপানের প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসতে পারে সে লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও নিয়মিত মনিটরিং করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

এদিকে, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ওয়ানস্টপ সার্ভিস আইন প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এই আইন অনুযায়ী একজন বিনিয়োগকারীর প্রয়োজনীয় আন্তঃমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সকল সেবা কর্তৃপক্ষ নিজেই সম্পাদন করবে। এভাবে একটি বিনিয়োগ প্রস্তাব নয় মাসের মধ্যে কার্যকর করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, বর্তমান ডুয়িং বিজনেসে বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে ১৭৬। বিডা আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই অবস্থান ১০০-এর মধ্যে রাখার কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। বিনিয়োগ বাড়াতে দ্রুত ১২টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের উৎপাদন শুরু করা হবে। এসব অঞ্চলে ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ও সেবা উৎপাদিত হবে এবং কর্মসংস্থান হবে ২ লাখ মানুষের।

জানা গেছে, সরকারী এসব উদ্যোগের ফলে চীন ও জাপানের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এছাড়া এই দু’দেশের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকালে যেসব চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও আলোচনা হয়েছে তা দ্রুত ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে চীন ও জাপানের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। বিদেশী বিনিয়োগের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আবুল কালাম আজাদ জনকণ্ঠকে বলেন, বিনিয়োগ তো বাড়ছে। সরকারী বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে বিদেশীরা বাংলাদেশের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তিনি বলেন, চীন ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরকালে যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর করেছেন তা দ্রুত বাস্তবায়নে সরকার কাজ শুরু করেছে। আশা করছি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে।

জানা গেছে, এদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জাপানী কোম্পানিগুলোর আগ্রহ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। জাপানী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ ও বাড়াতে চায়। ওই দেশের কোম্পানিগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে যে ২০ দেশকে তালিকার শীর্ষে রেখেছে, তার মধ্যে প্রথমবারের মতো উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। জাপান সরকারের বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থা জাপান এক্সটারনাল ট্রেডের (জেট্রো) এক জরিপে সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রতি তাদের আগ্রহের এই চিত্র উঠে এসেছে। গুলশানে জঙ্গী হামলায় সাত জাপানী নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশটির বিনিয়োগকারীদের আগ্রহে ভাটা পড়েনি। চীন ও জাপান থেকে কারখানা সরিয়ে জাপানের কোম্পানিগুলো কোন দেশে যেতে চায়, তার একটি প্রবণতাও উল্লেখ করা হয়েছে জেট্রোর প্রতিবেদনে। এতে দেখা যায়, চীন ও জাপান ছেড়ে জাপানী কোম্পানিগুলো ১৩ দেশ ও পশ্চিম ইউরোপে যাওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। ওই ১৩ দেশের মধ্যে বাংলাদেশও আছে।

বিদেশী বিনিয়োগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন জনকণ্ঠকে বলেন, চলতি বাজেটেও বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন পদক্ষেপ রয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়েছে সরকার। এসব কারণে চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ আসছে। তিনি বলেন, হলি আর্টিজানের পর সরকারী পদক্ষেপে বিদেশীরা সন্তুষ্ট। জঙ্গী হামলায় নিহতদের পরিবারকে সরকারী তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। এসব কারণে বিদেশীদের আস্থা ফিরে এসেছে। তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। শুধু তাই নয়, আমরা এখন জাপানী পরামর্শকদের সঙ্গেও দেশে বৈঠক করতে পারছি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী জাপান ও চীন। তাদের প্রকল্পগুলো এখন দ্রুত এগিয়ে চলছে।

জানা গেছে, গুলশানে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার পর জাপানী নাগরিকেরা বাংলাদেশে আসছিলেন না। এ নিয়ে আলোচনার জন্য গত নবেম্বরে তখনকার অর্থ সচিবের নেতৃত্বে চার সদস্যের বাংলাদেশী প্রতিনিধিদল জাপানে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে পরামর্শ এবং সঙ্কট উত্তরণে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও জাপান সফর করেছিলেন। সেই সময় জাপানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের বিসয়ে তাদের ইতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়ে দেয়া হয়। এখন চুক্তি ও সমঝোতা অনুযায়ী জাপানী প্রকল্পগুলোর কাজ এগিয়ে চলছে।

এ প্রসঙ্গে জাপানিজ কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এ্যাসোসিয়েশনের (ঢাকা) বিশেষ উপদেষ্টা আব্দুল হক জনকণ্ঠকে বলেন, হলি আর্টিজানের ঘটনা তাদের মারাত্মকভাবে আঘাত করেছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারী বিভিন্ন উদ্যোগে জাপানীদের আস্থা ফিরে আসায় তাদের প্রকল্পগুলো এগিয়ে যাচ্ছে।

চীন ও জাপানের সঙ্গে

যেসব চুক্তি

চীনের প্রেসিডেন্ট শিং জিন পিংয়ের বাংলাদেশ সফর দেশের ৭ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারের ব্যবসায়িক চুক্তি করে বাংলাদেশের ১৩টি কোম্পানি, টাকার অঙ্কে যা প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এ চুক্তির আওতায় মূলত বাংলাদেশী কোম্পানিগুলো মূলত চীনে পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও হিমায়িত খাদ্য রফতানি করতে পারবে।

এছাড়া অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ সফরকালে কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মিটার গেজ রেলপথ ডুয়াল গেজে রূপান্তর, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী রেলপথ ডুয়াল গেজে রূপান্তর, সীতাকু–চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ এক্সপ্রেসওয়ে, আখাউড়া-সিলেট মিটার গেজ রেলপথ ডুয়াল গেজে উন্নীতকরণের মতো প্রকল্পে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্পে চীন ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায় বাংলাদেশে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরে বাংলাদেশকে জাপান বড় ধরনের ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এ ঋণের অর্থে বিভিন্ন প্রকল্পে বাস্তবায়ন হবে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের প্রস্তাব আছে বাংলাদেশের। এর মধ্যে আছে গঙ্গা ব্যারাজ, যমুনা নদীর নিচে টানেল, যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুর মতো শুধু রেলের জন্য আরেকটি সেতু, বহুমুখী ঢাকা ইস্টার্ন বাইপাস ও ঢাকার চারপাশে থাকা চার নদীর জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনার মতো বৃহৎ অর্থায়নের প্রকল্প। এ প্রকল্পগুলোই বাছাই, সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা ও তদারকির জন্য যৌথ কাঠামো চাইছে জাপান। একই সঙ্গে কক্সবাজারের মাতারবাড়িতে দেশের সবচেয়ে বড় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প ও রাজধানীতে মেট্রোরেল প্রকল্পেও অর্থায়ন করছে জাপান। এছাড়া সেরা মানের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণেও জাপান তাদের সহযোগিতা করার কথা জানিয়ে দিয়েছে।