কর্মমুখর রূপগঞ্জের জামদানি পল্লী

ঈদ সামনে রেখে কর্মব্যস্ততা বেড়েছে রূপগঞ্জের জামদানি পল্লীতে। ঈদে বাড়তি আকর্ষণে কারিগররা জামদানির নকশায় এনেছেন নতুনত্ব। কাকডাকা ভোর থেকে মধ্যরাত অবধি অভিজাত এ বস্ত্র বুননে ব্যস্ত হাজারো শ্রমিক। তাছাড়া সপ্তাহের দুইটি জামদানি হাটেও রয়েছে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। চলতি ঈদ মৌসুমে দেশের বাইরেও রফতানি হয়েছে প্রত্যাশা অনুসারে। তাঁতিরা খুশি কাক্সিক্ষত বিক্রিবাট্টায়। খুশি মহাজন আর জামদানি সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশের বয়সটা খুব বেশি না হলেও এ বয়ন শিল্পের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। মহাভারতের আমলে পান্ডুপুত্র যুধিষ্ঠিরের কাছে বঙ্গ থেকে ভ্যাট গিয়েছিল মসলিন। দেশলাই বাক্সে এঁটে যাওয়া বারো হাতি এ নমনীয় মসলিন এক সময় হারিয়ে গেল। তার জায়গা পূরণে এলো জামদানি। রূপগঞ্জের শীতলক্ষ্যা পাড়ের নোয়াপাড়া গ্রাম হলো তার সূতিকাগার। অনেক নিয়ম আর নিষ্ঠার সমন্বয়ে তাঁতিরা তৈরি করেন এ জামদানি। জামদানি শিল্পের নান্দনিক মর্যাদাময় বয়ন নকশা এবং অসাধারণ কারিগরি নিপুণতা সবসময় বাংলাদেশের তাঁতশিল্পের এক উজ্জ্বলতম উদাহরণ। এ কারণে বঙ্গনারীদের আভিজাত্যের নিদর্শন হয়ে উঠেছে রূপগঞ্জের জামদানি। দেশ ছেড়ে বিশ্ব ললনাদের অঙ্গ শোভিত করতে বর্তমানে এশিয়াসহ বিশে^র বহু দেশে রফতানি হচ্ছে জামদানি শাড়ি। রূপগঞ্জ বিসিকের হিসাব মতে, ঈদকে সামনে রেখে দেশের বাইরে রফতানি হয়েছে অন্তত ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার জামদানি শাড়ি।
সরজমিনে দেখা গেছে, ঈদকে সামনে রেখে কর্মমূখর হয়ে পড়েছে নোয়াপাড়ার জামদানি পল্লী। এছাড়া পার্শ্ববর্তী কাজীপাড়া, দক্ষিণ রূপসী, বরাব, খালপাড়, পবনকূল, মোগরাকূল, সাদিপুর, বেহাকুর, মৈকুলী, নাওরা ভিটা, খাদুন, রূপসী, গন্ধর্বপুর, মুড়াপাড়া, ব্রাহ্মণগাঁও, গঙ্গানগরসহ আশপাশের গ্রামগুলোতেও চলছে তাঁতিদের কর্মব্যস্ততা। শরীর ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে তাঁতিরা তাদের মাকু কান্ডুল আর ঝাঁপিকে জীবন্ত করে বের করে আনছেন হরেক ডিজাইনের একেকটি জামদানি শাড়ি। নাওয়া-খাওয়া ভুলে সমানে কাপড় বুনে যাচ্ছেন তারা। এবারের ঈদে দেশের বিভিন্ন বিপণিবিতান ও বিদেশে আগের তুলনায় দ্বিগুণ কাপড় যাচ্ছে তাদের। ফুরসত নেই কারও কথা বলার। একেকটি কাপড় শেষ করার পরই হাতে আসছে নতুন অর্ডার। যত কাজ তত উপার্জন নীতিতে কাজ করে যাচ্ছে কারিগররা। ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পের স্থানীয় দফতর সূত্রে জানা গেছে, ঈদে বাড়তি আকর্ষণে কারিগররা জামদানির ডিজাইনে এনেছেন নতুনত্ব। তৈরি হচ্ছে চোখ জুড়ানো ফুল তেরছি, ছিটার তেরছি, ছিটার জাল, সুই জাল, হাঁটু ভাঙ্গা তেরছি, ডালিম তেরছি, পার্টির জাল, পান তেরছি, গোলাপ ফুল, জুঁই ফুল, পোনা ফুল, শাপলা ফুল, গুটি ফুল, মদন পাইরসহ প্রায় শতাধিক নকশার জামদানি। এগুলোর মধ্যে ছিটার জাল, সুই জাল ও পার্টি জাল জামদানির মূল্য সবচেয়ে বেশি। এসব জামদানি শাড়ির দাম পড়ে ৩০ থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত। এবারের ঈদে দেশের বাজারের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, সৌদি আরব, লন্ডনসহ বিভিন্ন দেশে জামদানি শাড়ি রফতানি হয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে জামদানির মেলা বসেছে ভারতসহ ৩-৪টি দেশে। এছাড়া নোয়াপাড়া জামদানি প্রজেক্টের ভেতরের এবং ডেমরা বাজারের সাপ্তাহিক দুইটি হাটেও ক্রেতাদের রয়েছে উপচেপড়া ভিড়। এসব হাটে কমপক্ষে আরও ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার বিক্রিবাট্টা হবে বলে ধারণা বিসিক ও জামদানি ব্যবসায়ীদের। হাট দুইটি প্রতি শুক্রবার মধ্য রাতে শুরু হয়ে শেষ হয় সূর্যোদয়ের আগেই। ভোর ৪টা থেকে পুরো জমজমাট হয়ে ওঠে হাট। লেনদেন হয় কোটি টাকার উপরে। অন্যদিকে নোয়াপাড়া বিসিকের প্রজেক্টে নির্ধারিত হাটের জায়গায়ও একই সময়ে একই কায়দায় হাট বসে। সেখানেও ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় রয়েছে।
কাউসার জামদানি উইভিংয়ের মালিক হামিদুল্লাহ মিয়া জানান, এবারের ঈদের বেচাকেনায় সন্তুষ্ট তিনিসহ স্থানীয় জামদানি ব্যবসায়ীরা। কিন্তু জামদানি তার অতীতের গৌরব অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। জামদানিতে সরকারি নজরদারি বাড়িয়ে তাঁতি এবং ব্যবসায়ীদের সুযোগ-সুবিধা দিলে এ শিল্পটি আবার স্বরূপে ফিরে আসবে।
জামদানি রফতানির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী কবির হোসেন বলেন, দেশের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের বিকাশে আমরা যারা দেশের বাইরে মেলায় অংশগ্রহণ করি তাদের কাস্টমসে অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়। এ কারণে ব্যবসায়ীরা বিদেশে গিয়ে মেলা করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। আরেক ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এখন জামদানির আদলে তৈরি হচ্ছে নকল জামদানি। আমাদের একটি সস্তা শাড়ি তৈরি করতে যেখানে সপ্তাহ খানেক সময় লেগে যায়, সেখানে ভারত থেকে আমদানি করা সস্তামানের সুতোয় আর মেশিনে একটি নকল জামদানি তৈরি হয়ে যায় মাত্র কয়েক ঘণ্টায়। এতে করে বদনাম হচ্ছে জামদানি শাড়ির। এ ব্যাপারে কথা হয় জামদানি শিল্প নগরী বিসিকের ব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, জামদানি এ দেশের ঐতিহ্য। এ শিল্পকে বাঁচাতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা কারিগরদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জামদানিতে এনেছি নতুনত্ব। এ কারণে দেশে-বিদেশে চাহিদা বাড়বে জামদানির।