সৌদি খেজুরের বাংলা জয়

খেজুর, আরবিতে বলা হয় তুমুর। রোজার মাসে ইফতারের অন্যতম উপকরণ খেজুর। বলা যায় ইফতারের এক অপরিহার্য উপাদান। এটা ছাড়া যেন ইফতার পূর্ণ হয় না। হজরত মুহাম্মদ (স.) ইফতার শুরু করতেন খেজুর মুখে দিয়ে। তারই সুন্নত পালন করতে ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করেন। রোজার মাসে প্রায় ৩০ হাজার টন খেজুরের চাহিদা আছে দেশে। যার প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। আজওয়া, আনবারা, সাগি, সাফাওয়ি, মুসকানি, খালাস, ওয়াসালি, বেরহি, শালাবি, ডেইরি, মাবরুম, ওয়ান্নাহ, সেফরি, সুক্কারি, খুদরি, বারহি ও মরিয়মসহ বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫ হাজার জাতের খেজুর রয়েছে। স্বল্প বিস্তারে দেশে কিছু জাতের খেজুর আবাদ শুরু হলেও এখনো বৃহদাকারে তা সম্প্রসারণ ঘটেনি। কৃষি উদ্যোক্তাদের আশা যথাযথ সরকারি সহযোগিতা ও প্রণোদনা পেলে একসময় দেশে উৎপাদিত খেজুরেই চাহিদা পূরণ করা যাবে।
কৃষিবিদ এম আব্দুল মোমিন
খেজুরের চাষের পুরোধা ভালুকার মোতালেবভালুকার খেজুর মোতালেব
বাংলাদেশের মাটিতে সৌদি খেজুরের চাষ একসময় কল্পনার ব্যাপার ছিল। কেননা খেজুর আবাদে মরুভূমির চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশের আবহাওয়া সমভাবাপন্ন। খেজুর চাষের জন্য দিনে গরম আর রাতে শীত এমন আবহাওয়ার প্রয়োজন। তাই বাংলাদেশে খেজুর চাষ করার চিন্তাটি ছিল অনেকটা কাল্পনিক। কিন্তু সেই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন ময়মনসিংহের ভালুকার আবদুল মোতালেব। ২০০১ সালে নিজ উদ্যোগে দেশে সর্বপ্রথম সৌদি খেজুরের চাষ শুরু করেন তিনি। মোতালেব আজ সফল এক সৌদি খেজুর বাগানের মালিক। এ বাগান সামাজিক পরিচিতির পাশাপাশি তাকে দিয়েছে আর্থিক সচ্ছলতাও। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সিডস্টোর বাজার থেকে পশ্চিমে ১৫-২০ মিনিটের পথ গেলেই গতিয়ার বাজার সংলগ্ন এলাকায় চোখে পড়বে মোতালেবের ‘মোফাজ্জল-মিজান সৌদি খেজুর বাগান’-এর সাইনবোর্ড।
মোতালেব জানান, অষ্টম শ্রেণি পাসের পর আর লেখাপড়ার পাঠ চুকে বাবার সঙ্গে কৃষি কাজে লেগে যান তিনি। ১৯৯৬ সালে চারটি পুকুরে আফ্রিকান মাগুরের চাষ করে ব্যর্থ হন তিনি। পরের বছর মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেও বিফল হন। পরের বছর পাড়ি জমান সৌদি আরবের আল কাসিমে। সেখানকার এক সৌদি খেজুর বাগানে কাজ নেন মোতালেব। আর মনে মনে বাংলাদেশের মাটিতে খেজুর ফলানোর স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। দুই বছর কাজ করার পর তিনি সৌদি মালিকের কাছে তার ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেন। ছয় মাসের পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মালিকের কাছ থেকে ৩৫ কেজি পাকা খেজুর নিয়ে দেশে ফেরেন মোতালেব।
সচরাচর প্রবাসীরা টাকাকড়ি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে দেশে ফিরলেও মোতালেবের খেজুর নিয়ে দেশে ফেরাটা ভালোভাবে নেয়নি পরিবারের সদস্যরা। বাড়ি ফিরে মোতালেব পিতার কাছে খেজুর বাগান গড়ার স্বপ্ন জানালে তিনি তাকে নিরুৎসাহিত করেন। প্রতিবেশীদের খেজুর খাইয়ে বীজ কুড়ানো শুরু করলে সবাই রীতিমতো মোতালেবকে পাগল ভাবতে শুরু করেন। মনের কষ্টে অভিমানে কাউকে কিছু না বলে বস্তাবন্দি খেজুর বীজ বাড়ির পেছনে ফেলে রেখে বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হন মোতালেব। কিছুদিন পর সেসব বীজ থেকে অঙ্কুর গজালে তার পিতা ছেলেকে খুঁজে বের করে বাড়ি এনে ৭০ শতাংশ জমি দেন বাগান করতে। সেই থেকে যাত্রা শুরু। তা পর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মোতালেবকে। সৌদি খেজুরের বাগান করে তিনি এখন রীতিমতো কোটিপতি। বাগানের খেজুর, চারা ও গাছ বিক্রি করে এক সময় বাবার দেয়া একটি মাটির ঘরে স্থলে চারদিকে প্রাচীরসহ ইটের দ্বিতল বাড়ি করেছেন। এখন তার ৫ বিঘা করে ১০ বিঘা আয়তনের দুটি বাগান। এসব বাগানে মোট গাছের সংখ্যা ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১২০০টি। বিক্রির জন্য বীজ ও গাছের দেহ থেকে গজানো চাকার মজুদ করেছেন কয়েক হাজার। আশা করছেন এ বছর প্রায় ১৫০০ কেজি খেজুর তিনি বিক্রি করতে পারবেন। ঢাকার ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন দর্শনার্থীর কাছে গাছ থেকে নামিয়ে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা কেজি ধরে বিক্রি করেছেন। এ ছাড়া বীজ থেকে করা চারা বিক্রি করেন প্রতিটি ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা আর চাকার আকৃতি ও প্রকৃতি ভেদে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা দরে বিক্রি করছেন। বিশেষ করে ফলবতী গাছের দেহ থেকে বের হওয়া কলম বা চাকার চারার মূল্য অনেক বেশি। আবদুল মোতালেব জানান, তার কাছ থেকে চারা নিয়ে পুলিশের সাবেক আইজি নুর মোহাম্মদসহ অনেকেই সৌদি খেজুরের বাগান সৃজন করেছেন।

পিরুজালীর বাদল
গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা জিল্লুর রহমানের ছেলে নজরুল ইসলাম বাদল খেজুর চাষাবাদকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছেন। মোতালেবের পর তিনিই বৃহদাকারে খেজুর বাগানের পাশাপাশি খেজুর চারা তৈরির নার্সারি করেছেন। যেখানে চারা বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। যারা খেজুর চাষাবাদে আগ্রহীদের কাছে চারা বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দিচ্ছেন তিনি। শুধু চারা বিক্রির জন্য নয়, মানুষ যাতে খেজুরবাগান করার নিয়ম সম্পর্কে জানতে পারে সে জন্য তিনি ‘সৌদি ডেটপাম ট্রিস ইন বাংলাদেশ’ নামের নার্সারিটি গড়েছেন। বাদল জানান, ২০১৪ সালে ১৮টি চারাগাছ সংগ্রহ করে ১০ কাঠা জমি নিয়ে প্রথমে বাগান শুরু করেন। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে তিনটি, দুবাই থেকে ১০টি, ভারত থেকে দুটি ও কুয়েত থেকে দুই বছর বয়সী তিনটি চারা সংগ্রহ করেন। ১৮টি চারা ক্রয় করতে ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা লেগেছিল তার। বর্তমানে আড়াই একর জমিতে ১০০ বড় গাছসহ মোট ছয় হাজার গাছ রয়েছে। বিভিন্ন উপায়ে দুই হাজার চারাগাছ সংগ্রহ করেছেন। বাকি চার হাজার গাছ বিদেশ থেকে উন্নতমানের খেজুর এনে এর বীজ থেকে নিজস্ব নার্সারিতে পলিব্যাগে রোপণ করে তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে তার বাগানে বড় ১১টি ও মাঝারি সাইজের মোট ৩০০টি গাছে খেজুর ধরেছে এবং ছয় জাতের খেজুর চারা রয়েছে। বাজার সম্প্রসারণের বিষয়ে নজরুল জানান, তার হাত দিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় খেজুর গাছের বাগান হচ্ছে। যেসব গাছ রোপণ করা হয়েছে, তার বৃদ্ধিও ভালো। তিনি জানান, চারা সঠিক নিয়মে রোপণ করে যত্ন নিলে আগামী ৫-৬ বছরের মধ্যে ফলন আসে।

খেজুর গ্রাম নারায়ণকান্দি
ঝিনাইদহের হরিণাকু-ুর নারায়ণকান্দি এখন জেলাবাসির কাছে সৌদি খেজুরের গ্রাম বলে পরিচিত। বাণিজ্যিকভাবে খেজুর উৎপাদন না হলেও মাঠের পর মাঠ বালুময় জমিতে সৌদি খেজুরের গাছ শোভা পাচ্ছে। ঝিনাইদহ বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে সরকারের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় জেলার হরিণাকু-ু উপজেলার নারায়ণকান্দি গ্রামে সৌদি খেজুরের চারা রোপণ করা হয়। সদর উপজেলার মির্জাপুর ও কুলবাড়িয়া গ্রামের মাঠেও এই প্রকল্পের আওতায় সৌদি খেজুরের চারা রোপণ করা হয়। সরকারিভাবে দুই বছর পরিচর্চা শেষে কৃষকদের কাছে খেজুর বাগান হস্তান্তর করে বনবিভাগ। ঝিনাইদহ বনবিভাগের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় জেলার পরিত্যক্ত ও বালু জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে সৌদি খেজুরের চারা রোপণ করে ভালো ফল পাওয়া গেছে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলা ও হরিণাকু-ু এলাকার পরিত্যক্ত জমিতে তিন লাখেরও বেশি সৌদি ও দেশি খেজুরের চারা রোপণ করা হয়। এর মধ্যে হরিণাকু-ু উপজেলার তাহেরহুদা ইউনিয়নের নারায়ণকান্দি গ্রামের বেলের মাঠে সব থেকে বড় সৌদি খেজুরের বাগান করা হয়েছে। নারায়ণকান্দি গ্রামের এলাকার ৪৮ জন কৃষকের ৫০ বিঘা জমিতে সৌদি খেজুরের বাগান করা হয়।
সৌদি খেজুরের সবচেয়ে বড় বাগানের মালিক নারায়ণকান্দি গ্রামের দবির উদ্দীন জানান, গাছ রোপণের ১৩ বছর পর ২০১৪ সালে গাছে চুরমি (স্থানীয় ভাষায় চোমর বলে) আসে। তিনি শুষ্ক মৌসুমে নিয়মিত সেচ দিয়ে খেজুর গাছগুলো তরতাজা করে তুলেছেন বলেও জানান। সৌদি আরবে খেজুর গাছ থেকে রস আহরণ না করা হলেও বাংলাদেশে রোপিত গাছ থেকে খেজুরের পাশাপাশি রস ও গুড় উৎপাদন করা যাবে বলে বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান।

আলোড়ন সৃষ্টি করছেন আলাউদ্দিন
সৌদি আরবের খেজুরের বাগান গড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করছেন মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার আলাউদ্দিন হোসেন। ২০০৭ সালে স্থানীয় বন বিভাগ থেকে ১ হাজার সৌদি খেজুরের চারা সংগ্রহ করে পরীক্ষামূলকভাবে আলাউদ্দিন হোসেন নিজের এক একর জমিতে বাগান গড়ে তোলেন। সেই সময় থেকেই তিনি নিজের মতো করে গাছের পরিচর্যা করতে থাকেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শে খেজুর গাছের যত্ন নিয়ে এক বিশাল বাগান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। বর্তমানে তার বাগানে এখন প্রায় ৯০০। দীর্ঘ ৯ বছর পরিচর্যার ফলে তার বাগানের খেজুর গাছগুলো এখন খেজুর ধরার উপযোগী। পাশাপাশি ঘন সবুজ বাগনটিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে দর্শনার্থীদের। এ বছর গাছগুলোয় খেজুরের মোচা আসবে এবং খেজুর উৎপাদিত হবে বলে আশা করছেন আলাউদ্দিন। আলাউদ্দিনের মতে মানুষের প্রচ- ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। বদলে দেয়া যায় নিজের ভাগ্য যার উদাহরণ তিনি নিজেই। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা আমাকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছেন। আর আমাকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছেন মাগুরা নিউজ পত্রিকার সম্পাদক রাজীব মিত্র। শালিখার আলাউদ্দিন হোসেনের লাগানো খেজুর বাগানের জমিটি খেজুর চাষের উপযোগী হওয়ায় এখানে খেজুরের ফলন ভালো হবে বলে আশা করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।

বগুড়ার খেজুর হিরো
অদম্য উৎসাহ নিয়ে বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার বড়ুইল ইউনিয়নের তুলাসন গ্রামে সৌদি আরবের নানা জাতের খেজুরের বাগান গড়ে তুলেছেন আবদুর রউফ হিরো। প্রায় তিন বিঘা জমিতে গড়ে তোলা বাগানটিতে বর্তমানে গাছের সংখ্যা প্রায় ৪৫০টি। অনেক গাছে খেজুর আসতে শুরু করেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৬ সালে চারুকলা বিভাগ থেকে বিএফএ পাস হিরো বেকার জীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ১৯৯৯ সালে সৌদি আরবের একটি বেসরকারি কোম্পানিতে ডিজাইনার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। সেখানে মরুভূমিতে খেজুরের চাষ দেখে তিনি মনে মনে পরিকল্পনা করেন বাংলাদেশের মাটিতে খেজুরের চাষ করার। এ ক্ষেত্রে ময়মনসিংহের ভালুকার মোতালেব হোসেনের হাতে গড়া খেজুর বাগান তাকে অনুপ্রাণিত করে। ২০০৮ সালে দেশে ফেরার সময় সৌদি আরবের উন্নতজাতের খেজুর সঙ্গে নিয়ে এসে তার বীজ থেকে শুরু করেন সৌদি আরবের খেজুরের বাগান। নাম দেন মা সৌদি খেজুরের বাগান ও নার্সারি। এবার সৌদি খেজুর বাগানে বেশকিছু গাছে খেজুর ধরেছে। বর্তমানে বাগানে শাখাই, মগরুম ও সুপ্রি নামে তিন জাতের ছোট-বড় খেজুরের চাষ হচ্ছে। জাতভেদে খেজুরের আকার, মিষ্টতা ও বীজের আকার কম-বেশি হয়। হিরো জানান, বর্তমানে যে জমিতে খেজুর চাষ হচ্ছে সেখানে এর আগে ধান চাষ হতো। জমিতে বেলে মাটি ফেলে হিরো শুরু করেন খেজুরের বাগান। এ কাজে তাকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেন স্ত্রী আসমা খানম।