‘জনগণের উপকারই আমার নৈতিক দীক্ষা’

গল্পটা অনেকটাই সিনেমার মতো। রাজধানীর নিকুঞ্জের বাসিন্দা শরীফ আহমেদ সিএনজি অটোরিকশায় গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কেরানীগঞ্জ থেকে বাবুবাজার ব্রিজে এসে নামেন। নামার সময় হয়তো ভুলে অথবা ভাড়া দিয়ে নেবেন মনে করে তার সঙ্গে থাকা ব্যাগ অটোরিকশায় রাখেন। তারপর ভাড়া দেওয়ার জন্য পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করার ফাঁকেই ভাড়া না নিয়ে সিএনজি অটোরিকশা দ্রুত ঘুরে উল্টো দিকে চলতে শুরু করে।
ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েন শরীফ। কারণ ব্যাগে রয়েছে তার বাড়ি নির্মাণের নগদ ৫ লাখ টাকা ও ল্যাপটপ। এমন পরিস্থিতিতে কী করা যায় তা মাথায় আসে না তার। সামনে কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দৌড়ে তাদের শরণাপন্ন হন। পুলিশের অনেক নেতিবাচক খবর আছে চারপাশে। হয়তো তিনি পুলিশকে বলে কতটুকু উপকার পাবেন তা নিয়েও দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু ঘটনা ঘটল উল্টো।
সেখানে থাকা পুলিশ সার্জেন্ট আহসান হাবিব প্রামাণিক সঙ্গে সঙ্গেই তার মোটরসাইকেল নিয়ে রওনা হয়ে যান অটোরিকশার পেছনে। অন্য পুলিশ সদস্যরা তাকে সান্ত¡না দিচ্ছিলেন। এ সময় প্রতিটি মিনিট যেন শরীফের কাছে কয়েক যুগ বলে মনে হচ্ছিল।
তার অপেক্ষার পালা আর শেষ হচ্ছে না। আর কী করা যায় বুঝতেও পারছে না তিনি। প্রায় ১৫ মিনিট পর পুলিশ সার্জেন্ট আহসান হাবিব হারিয়ে যাওয়া ব্যাগ ও অটোরিকশাচালককে নিয়ে হাজির। শরীফ বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার সামনে সেই ব্যাগ। তখনো তার মনে টাকা ফিরে পাওয়ার সন্দেহ। ব্যাগ খুলে দেখেন সব কিছু ঠিকঠাক আছে।
পুলিশ এ সময় আইনগত ব্যবস্থা নিতে চালক কালামকে থানায় নিয়ে যেতে চাইলে শরীফ তার অর্থ ও মালামালসহ ব্যাগ ফিরে পাওয়ায় এবং চালক ক্ষমা চাওয়ায় তাকে ছেড়ে দিতে পুলিশকে অনুরোধ করেন। শরীফ এবার ভালো করে সার্জেন্টের দিকে তাকান। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। খুশি হয়ে বলেন, ভাই আমার টাকা উদ্ধার করেছেন। এখান থেকে আপনার যা খুশি টাকা নেন।
পুলিশ সার্জেন্ট সেই টাকা নামিয়ে বরং ব্যাগ বন্ধ করে বলেন, আপনার হারিয়ে যাওয়া টাকা ও ব্যাগ উদ্ধার করা পুলিশের নৈতিক দায়িত্ব। আমি তা পালন করেছি মাত্র। এর জন্য আমি কোনো অতিরিক্ত সুযোগ নিতে পারি না। উল্টো তাকে চা পান করান এবং পরে অন্য একটি গাড়িতে তুলে নিরাপদে যাত্রার ব্যবস্থা করেন।
এই হচ্ছে পুলিশ সার্জেন্ট আহসান হাবিব প্রামাণিক, যিনি ডিএমপির কোতোয়ালি জোনে কর্মরত। এ ব্যাপারে সার্জেন্ট আহসান হাবিবের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, তিনি ২০১১ সালে পুলিশে যোগ দেন। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ থানার উত্তর দলগ্রাম পাটেয়ারীটারী গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা স্কুল শিক্ষক। এর আগেও তিনি সংবাদ পেয়ে জীবনবাজি রেখে রাজধানীর কাকরাইল এলাকা থেকে তাৎক্ষণিক অটোরিকশা ছিনতাইকারীদের আটক করেন।
আহসান হাবিব বলেন, ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল মানুষের উপকার করার। একজন পুলিশ সদস্য হিসেবে বাকি জীবনেও মানুষের উপকার করে যেতে চাই। মানুষের উপকার করার এ দীক্ষা আমি আমার বাবার কাছ থেকে পেয়েছি।