বিশ্বের সুখী অর্থনীতির অন্যতম বাংলাদেশ

বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি, যা ফ্রান্স, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের মোট জনসংখ্যার সমান। বিশ্বের জনবহুল ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে দরিদ্র। আবার এত বিশাল জনগোষ্ঠী ও সম্পদের অপ্রতুলতা সত্ত্বেও সম্প্রতি দেশটি যে প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে, তাতে এ মুহূর্তে বাংলাদেশ অবশ্যই বিশ্বের সবচেয়ে সুখী অর্থনীতির গল্পগুলোর একটি। কোয়ার্টজ ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদনে এ রকম চিত্রই তুলে ধরা হয়েছে বাংলাদেশের।

যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা মিডিয়ার মালিকানার ব্যবসা-অর্থনীতি বিষয়ক সংবাদমাধ্যম কোয়ার্টজের ভারতীয় সংস্করণে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.১ শতাংশ, যা ৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। টানা ছয় বছর জিডিপি বেড়েছে ৬ শতাংশের বেশি হারে। বেশি বিশ্লেষকের মতে, অর্থনীতির এ গতি চলমান থাকবে। ঋণমান সংস্থা মুডিসও বলছে, বাংলাদেশে অর্থনীতি এমনই শক্তিশালী থাকবে।

তবে এই দ্রুত অগ্রগতি মোটেও উৎসাহব্যঞ্জক হবে না, যদি এর সুফল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে না পৌঁছায়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে দেশের সার্বিক আয়ের তুলনায় দরিদ্রতম ৪০ শতাংশ পরিবারের গড় আয় বেড়েছে ০.৫ শতাংশ বেশি হারে। অথচ একই সময়ে ভারতের ৪০ শতাংশ দরিদ্র ঘরের আয়ের প্রবৃদ্ধি জাতীয় গড় আয়ের প্রবৃদ্ধির চেয়ে কম ছিল।

বাংলা বুম : ওয়ান অব দ্য ওয়ার্ল্ডস হ্যাপিয়েস্ট ইকোনমিক স্টোরিজ কামস ফ্রম সাউথ এশিয়া, নাট নট ইন্ডিয়া (বাংলা সমৃদ্ধি : বিশ্বের সবচেয়ে সুখী অর্থনৈতিক গল্পগুলোর একটি দক্ষিণ এশিয়ার, তবে তা ভারত নয়) শিরোনামের এ প্রতিবেদনের মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমেছে। ১৯৯১ সালে জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ ছিল চরম দারিদ্র্যে। এখন তা ১৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। অর্থাৎ অর্থনীতির অগ্রগতির ফলে এখন চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে পাঁচ কোটি।

ইয়েলের অর্থনীতিবিদ আহমেদ মুশফিকের মতে, বাংলাদেশের এই সাম্প্রতিক সফলতার পেছনে বিকাশমান পোশাকশিল্প ও শক্তিশালী এনজিও (নন-গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন)—এ দুই খাতের ভূমিকা ব্যাপক। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ দুই হাজার ৬০০ কোটি (২৬ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এ বাজারে চীনের পরই দ্বিতীয় স্থানে বাংলাদেশ। পোশাক রপ্তানি আয় বাংলাদেশের জিডিপির ১৪ শতাংশ ও মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশ। ২০১৬ সালে পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশের পোশাক খাতের বিকাশের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কোটাব্যবস্থা সহায়ক ছিল বলে উল্লেখ করেন মুশফিক।

দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় এনজিওগুলোর কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে মুশফিক বলেছেন, বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও বাংলাদেশের ব্র্যাক, যে সংস্থাটি এ দেশের ছয় কোটি মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেটের ব্যবস্থা করেছে।

এতসবের মধ্যেও বর্তমানে দেশের গণতন্ত্র হুমকিতে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগের অভাব উন্নয়নের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। দেড় কোটি মানুষের রাজধানী ঢাকা বিশ্বের বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পথে।

২০১৩ সালে ঢাকার অদূরে সাভারের রানা প্লাজা গার্মেন্ট ভবন ধসে এক হাজার ১০০ কর্মী মারা যায়। এ রকম দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে কি না—অর্থনীতিবিদ মুশফিকের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এ নিয়ে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে পোশাকশিল্পকে বাঁচাতে হলে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি সবার আগে ভাবতে হবে সরকারকে।