এক জায়গা থেকে বিনামূল্যে বিশ্বমানের সব চিকিত্সা পাবে গরিব রোগীরা

সাধারণ মানুষের পরম ভরসাস্থল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। চাহিদার তুলনায় শয্যা সঙ্কট ও জনবল সঙ্কটের পরও এই হাসপাতাল সাধারণ মানুষের আস্থার স্থান। জটিল ও দূরারোগ্য নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত বিভিন্ন রোগী প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তাই ছুটে আসেন এ হাসপাতালে। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা চিকিত্সা সেবায় ব্যস্ত সময় পার করেন প্রতিষ্ঠানটির চিকিত্সক-নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এখানে চিকিত্সা নিতে আসা ৮৫ ভাগ রোগীই দরিদ্র। এদের পক্ষে বাইরে চিকিত্সা করানো সম্ভব নয়।

এসব দরিদ্র রোগীর চিকিত্সা সেবার করুণ চিত্র ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। দরিদ্র রোগীদের চিকিত্সা সেবার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে ৫ হাজার শয্যায় উন্নীত করার নির্দেশ দেন। এই হাসপাতালে থাকবে সব ধরনের অত্যাধুনিক চিকিত্সা সেবা ব্যবস্থা। হূদরোগীদের সব ধরনের অপারেশনসহ চিকিত্সা, কিডনি সংযোজনসহ সকল সর্বাধুনিক চিকিত্সা ব্যবস্থা এই হাসপাতালে থাকবে। বিনামূল্যে পাবে দরিদ্র রোগীরা।

দেশের সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলা থেকে শুরু করে রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোও রোগীদের এই হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। ঢাকা মেডিক্যাল সাধারণত কাউকে ফিরিয়ে দেয় না। বেডে না হোক, ফ্লোরে হলেও রোগীর ঠাঁই হয়। এছাড়া সারাদেশ থেকে ঘটনা-দুর্ঘটনায় আহতদের এই হাসপাতালে চিকিত্সার জন্য প্রেরণ করা হয়। তবে ৮শ’ শয্যার জনবল দিয়ে ২৬শ’ শয্যার দেশের সর্ববৃহত্ এই চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানে চলছে দিনরাত চিকিত্সা সেবা।

সারাদেশ থেকে এই হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে আসেন রোগী। ময়মনসিংহের দোবাউড়া উপজেলার ইফতেখার দশম শ্রেণির ছাত্র। গত ২৭ মে মাথায় আঘাত পেয়ে বিভিন্ন জায়গায় চিকিত্সা নেয়। তবে সেরে না উঠায় অবশেষে ঢাকা মেডিক্যালে চিকিত্সা নিতে আসে। এখন মেঝেতে চিকিত্সা চলছে। ইফতেখার বলল, হাসপাতালে এসে বেড পাইনি, তবে চিকিত্সা সেবা পাচ্ছি। আমি খুশি।

মেহেরপুরের ভোলা (৪০) পেশায় কাঠমিস্ত্রী। স্ট্রোকের এই রোগীর মাথায় রক্ত জমাট বেধেছে। অনেক জায়গায় গেছেন চিকিত্সার জন্য। পরে এসেছেন এই হাসপাতালে। নিউরো সার্জারির মেঝেতে গিয়ে কথা হয় ভোলার স্ত্রী আর্জিনা বেগমের সঙ্গে। জানালেন, বেশ ভালো চিকিত্সা সেবা পাচ্ছেন।

বাবুর্চি খলিলুর রহমানের ছেলে শাওন (১৯) গার্মেন্টস শ্রমিক। মাথায় আঘাত পেয়ে হাসপাতালে এসেছে চিকিত্সা নিতে। খলিল বলেন, অপারেশন না হলে আমার ছেলেকে বাঁচাতে পারতাম না। একেবারে বিনামূল্যে চিকিত্সা পাচ্ছি।

শিশু ওয়ার্ডে সন্তান নিয়ে এসেছেন কুমিল্লার লিপি। সাত বছরের ছেলে আসিফের ডেঙ্গুু জ্বর হয়েছে। চার দিন যাবত্ হাসপাতালে ভর্তি। এক বেডে দুইজনকে রেখে চিকিত্সা দিচ্ছে। তবে বেশ ভালো চিকিত্সা সেবা পাচ্ছেন বলে জানালেন লিপি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, দরিদ্রদের পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সা ব্যবস্থার মডেল হাসপাতাল এটি। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দিতে কাজ করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী এই হাসপাতালকে বিশ্বমানের করতে কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান বলেন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালকে ধারণ ক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত রোগীর চিকিত্সা দিতে হয়। এটি দেশের চিকিত্সা শিক্ষায় একটি মডেল। এই হাসপাতালসহ দেশের অনেক হাসপাতালে অত্যাধুনিক চিকিত্সা ব্যবস্থা করেছে সরকার। এই হাসপাতালকে ৫ হাজার শয্যার করার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল প্রত্যেক দিন ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা প্রদান করা হয়। চিকিত্সার জন্য রোগীকে ফেরত প্রদান করা হয় না। জনগণের সুচিকিত্সার জন্য প্রতিষ্ঠানটি আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আউটডোর ও জরুরি বিভাগে অপারেশনসহ পুরো হাসপাতালে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার রোগীর চিকিত্সা প্রদান করা হয়। হাসপাতালে প্রতিদিন দর্শনার্থীসহ প্রায় ৪০-৪৫ হাজার লোকের সমাগম ঘটে। প্রতিদিন চিকিত্সাধীন থাকে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার রোগী। আগত রোগীদের মধ্যে গড়ে ১ হাজারের বেশি রোগীকে স্থানাভাবে অতিরিক্ত বিছানা, মেঝে, করিডোর এমনকি লবিতে রেখেও চিকিত্সা প্রদান করা হয়।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্যাথোলজি বিভাগটি দুইবেলা খোলা থাকে। চিকিত্সাধীন রোগীরা সবধরনের পরীক্ষা বিনামূল্যে এই বিভাগ থেকে করার সুযোগ পাচ্ছেন। বর্তমান সরকার পরীক্ষা-নিরীক্ষার আধুনিক যন্ত্রপাতি দ্বিগুণ বাড়িয়েছেন।

ক্যাথল্যাবে রোগীদের করোনারী এ্যানজিওগ্রাম, পেস মেকার সংযোজন এবং স্টেন্টিংসহ অন্যান্য ইনভেসিভ কার্ডিয়াক প্রসিডিউর করা সম্ভব হচ্ছে। খুব শিঘ্রই কার্ডিয়াক সার্জারি ও ভাসকুলার সার্জারি বিভাগ চালু করা হবে। এই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয় প্রক্রিয়া চলমান ও অবকাঠামো সংস্কার প্রক্রিয়াধীন আছে। আইসিইউ শয্যা ২০ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শয্যায় উন্নীত করা হচ্ছে। এছাড়া নতুন চারটি অপারেশন থিয়েটার চালুর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। প্রতিদিন অনেক দরিদ্র রোগী এই ব্যয়বহুল চিকিত্সা বিনামূল্যে পাচ্ছে।

হাসপাতালে রোগীদের জন্য ২২৩ প্রকারের প্রয়োজনীয় ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ১৯৪৬ সালে চালু হওয়া ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শুরুতে ছিল ২৫০ শয্যা। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার ১ হাজার ৫০ শয্যায় উন্নীত করেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক ২০১৩ সালে ১০ তলা বিশিষ্ট একটি নতুন ভবন উদ্বোধন করে হাসপাতালের শয্যা ১ হাজার ৮০০ থেকে বাড়িয়ে ২৬ শ’ করেন। ২০১৭ সালের মধ্যে ৫ হাজার শয্যা করতে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দেশে একমাত্র এই হাসপাতালে এখন পর্যন্ত বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২৭ জন রোগীর সফল বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সম্পন্ন হয়েছে।