হ্যালোর যাত্রা শুরু ১ জুলাই ॥ পরিবহন হাতের মুঠোয়

সরকার অনুমোদিত এ্যাপসভিত্তিক যাত্রীসেবা চালু করতে যাচ্ছে ‘টপ আই আই’ নামে একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান। মাইক্রো, প্রাইভেটকার ও রেন্ট-এ কারের সকল গাড়ির সমন্বয়ে গড়ে তোলা নতুন এই কোম্পানির সার্ভিসের নাম হবে ‘হ্যালো’। আগামী এক জুলাই থেকে রাজধানীতে এই সেবা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক শুরুর কথা রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে মোটরসাইকেল ও সিএনজি চালিত অটোরিক্সা সেবাও। যে কেউ যে কোন সময় স্বল্প ভাড়ায় কোম্পানির গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। এর আগে ঢাকা মহানগরীতে বিদেশী প্রতিষ্ঠান ‘উবার’ ট্যাক্সি সেবা চালু করলেও তা সরকারীভাবে অনুমোদিত নয়। বিআরটিএ’র পক্ষ থেকে অনুমোদনহীন ট্যাক্সি সেবা কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বলা হলেও উবার তা মানছে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীতে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অতিমাত্রায় ব্যক্তিগত গাড়ি বাড়ায় যানজটের মাত্রাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। উন্নত বিশ্বে ইন্টারনেট ভিত্তিক সফটওয়্যার এপ্লিকেশনের মাধ্যমে রাইডশেয়ারিং সার্ভিস চালু করে ব্যক্তিগত গাড়ি হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, স্মার্টফোনভিত্তিক এ্যাপস নাগরিক পরিবহন সেবা বদলে দেবে। বাংলাদেশে এই ধারণা একেবারেই নতুন। এখন থেকে ঘরে বসেই আপনি ডেকে নিতে পারবেন আপনার পরিবহন। আর একবার কল করলে স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই গাড়ি চলে আসবে ঘরের দরজায়। শুরুতে কোম্পানির এই পরিবহন সেবা রাজধানী ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। পরবর্তীতে বিভাগীয় শহরসহ জেলা শহরগুলোতে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ্যাপসভিত্তিক ট্যাক্সি সেবা রয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পরিবহন সেবার ক্ষেত্রে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। জীবন মানও উন্নত হয়েছে। তাছাড়া গাড়ি চালকদের বাড়তি আয়ের সুযোগও বেড়েছে। তাছাড়া অল্প টাকায় গাড়ি ব্যবহারের সুযোগও মিলছে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাইডশেয়ারিং সার্ভিস অর্থ একটি পরিবহন সেবা ব্যবস্থা- যেখানে নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে মোবাইল/স্মার্টফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট ভিত্তিক অনলাইন এ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে ব্যক্তিগত মোটরযানকে ভাড়ায় পরিচালনা করা যায়। ভাড়ার বিনিময়ে যে কেউ গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারেন। এটি একটি নিরাপদ, নির্বিঘœ, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত ডোর টু ডোর পরিবহন সার্ভিস।

যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে করা টপ আই আই এর আবেদনে বলা হয়েছে, দেশে রোড ট্রান্সপোর্ট সেক্টরকে ডিজিটাল করার লক্ষ্যে দু’বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। বিআরটিএ-এর তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে এবং বিভিন্ন দেশের অনুকরণে প্রতিষ্ঠানটি বেশকিছু সফটওয়্যার তৈরি করেছে। যা দেশের সড়ক পরিবহন সেক্টরকে আরও একধাপ এগিয়ে নেবে। আবেদনে আরও বলা হয়, দেশে আনুমানিক অর্ধ লক্ষাধিক রেন্ট-এ কার অনুমোদনহীন যাত্রী পরিবহন করে আসছে। এ সেক্টরকে বিআরটিএ-এর রেজিস্টেশনের আওতায় এনে সফটওয়্যার ও ডিভাইস সংযোজনের মাধ্যমে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনলে ট্রন্সপোর্ট সেক্টরে নতুন মাত্রা যোগ হবে। এতে রেন্ট-এ কার ও যানবাহনের নিরাপত্তা, যাত্রী নিরাপত্তাসহ বিআরটিএ বছরব্যাপী বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় করতে পারবে।

টপ আই আই এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক শামস খান হিমু জনকণ্ঠ’কে বলেন, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আমরা সরকারের অনুমোদন নিয়ে বৈধভাবে এ্যাপস ভিত্তিক পরিবহন সার্ভিস চালু করতে যাচ্ছি। কোম্পানির এই সার্ভিসটির নাম হবে ‘হ্যালো’। তিনি বলেন, কোম্পানির অনুমোদন পেয়েছি। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) আমাদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এ্যাপস ভিত্তিক ট্যাক্সি সার্ভিসের নীতিমালাও চূড়ান্ত করেছে। বিদেশী ট্যাক্সি সার্ভিস প্রতিষ্ঠান ‘উবার’ যেহেতু অবৈধ তাই আমরাই বাংলাদেশে প্রথম বৈধভাবে ট্যাক্সি সেবায় মাঠে নামছি। তিনি জানান, প্রায় দু’বছর ধরে আমাদের পরিবহন সার্ভিস চালুর প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে এ্যাপসসহ সার্বিক কাজ শেষ হয়েছে। আশা করি এক জুলাই থেকে ‘হ্যালো’-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে।

তিনি বলেন, যাত্রী চাহিদা তুলনায় রাজধানীতে যানবাহনের সংখ্যা খুবই কম। বিশেষ করে গণপরিবহন ব্যবস্থা একেবারেই বেহাল। সুশৃঙ্খল পরিবেশের অভাব নিরাপত্তাহীনতা ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ বিভিন্ন কারণে যাত্রীরা নিরুৎসাহিত হয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি যেমন- মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছে। আমাদের এই সেবা চালু হলে ব্যক্তিগত গাড়ির প্রতি মানুষের আগ্রহ কমবে। নতুন নতুন গাড়ি নামানোর কারণে যানজট বাড়ছে। সে সমস্যাও রাজধানীতে কমে আসবে বলে জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের সবচেয়ে যানজটপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা একটি। কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য বিশ্বস্ত, কার্যকর ও সহজলভ্য আরও বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার চাহিদা রয়েছে এই শহরে। বিশেষ করে যেসব রুটে গণপরিবহন ব্যবস্থা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল, সেই সব জায়গায় রাইড-শেয়ারিং জরুরী। যে কোন গাড়ির মালিকও ‘হ্যালো’ তে রেজিস্ট্রেন করে গাড়ি চালানোর সুযোগ পাবেন।

টপ আই আই কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাইভেট কারের পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও থ্রি হুইলার সিএনজি চলাচল করবে। এই পদ্ধতিতে যাত্রীরা সহজেই মুঠোফোনের মাধ্যমে তার পছন্দের যানবাহন নির্ধারণ করে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে। বর্তমানে রাজধানীতে উবার, পাঠাও ও যাত্রী নামে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অনুমোদনহীন ট্যাক্সি ও মোটরসাইকেল সেবা দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিআরটিএ-এর অনুমোদন না থাকা ও পুলিশকে বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় রাইডশেয়ারিং ব্যবহারকারী যাত্রীরা প্রায়ই হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিআরটিএ’র অনুমোদনপ্রাপ্ত হ্যালো ট্যাক্সি সার্ভিসের যাত্রা শুরু হলে যাত্রীরা এ্যাপস ভিত্তিক পরিবহন সেবা পাবেন একেবারেই হয়রানিমুক্ত। প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বৈধ কাগজপত্র নিয়ে কম ভাড়ায় ঢাকা মহানগরীতে আমাদের সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। যেন সব ধরনের যাত্রীর এই সেবার প্রতি আগ্রহ জন্ম নেয়।

গত বছরের ২২ নবেম্বর ঢাকা শহরে যাত্রা শুরু করেছিল উবার। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর আগে উবারকে বেআইনী আখ্যা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেছে। নতুন ও উদ্ভাবনী উপায়ে যাত্রী ও চালকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে হ্যালোর প্রযুক্তিগত পরিবহন সেবায়। যখন হ্যালো-এর কেউ গাড়ি ডাকবেন, তখন চালক অনুরোধে সাড়া দেয়ামাত্রই তাঁর নাম, ছবি, গাড়ির লাইন্সেস, নম্বর প্লেট ও রেটিং যাত্রীর কাছে পৌঁছাবে। এছাড়া চালকও যাত্রীর নাম ও রেটিং দেখতে পারেন। গাড়ি ডাকার পর ঠিকানা বুঝতে সমস্যা হলে চালক ও যাত্রী একে অপরের সঙ্গে অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারবেন। এছাড়া কোন পথে যাচ্ছেন, যাত্রায় আনুমানিক কতটা সময় লাগবে এসব তথ্য সহজেই জানতে পারছেন যাত্রীরা।

হ্যালো এমন একটি সেবা, যা ট্যাক্সিচালক ও যাত্রী উভয়েই ব্যবহার করতে পারেন। কোম্পানির নিজস্ব কোন ট্যাক্সিক্যাব বা প্রাইভেটকার নেই। অনলাইন থেকে ‘হ্যালো’ এ্যাপস ডাউনলোড করা যাবে। এরপর ই-মেইল ও ফোন নম্বর দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে চালক ও যাত্রীকে। তারপরই তাঁরা এর সেবা নিতে পারেন।

মুঠোফোন ব্যবহার করে যাত্রীরা সহজেই ‘হ্যালো’র চালককে সময় মতো নিজের অবস্থান জানাতে পারবেন। চালকদের যাত্রীর জন্য অযথা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। ট্র্যাকিং বা মনিটরিং সিস্টেমের আওতায় থাকায় যাত্রী ও চালকের নিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকবে। যানবাহনের বিশেষ জায়গায় ডিভাইস প্রতিস্থাপনের সুযোগ থাকায় চুরি হওয়া যানবাহনের অবস্থান সহজেই জানা যাবে। মনিটরিংয়ের আওতায় থাকায় বাণিজ্যিকভাবে চলাচলকৃত গাড়িগুলোর মাধ্যমে সংগঠিত অপরাধ প্রবণতা দূর হবে। একজন যাত্রীকে তার গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ডিভাইসের মাধ্যমে পরবর্তী যাত্রী নিশ্চিত হওয়ায় চালকদের আয়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে। প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক প্রাইভেটকারগুলোতে বিশেষ রং ও নাম্বার প্লেট সংযোজন থাকবে। এ্যাপস বাইকের পেছনের যাত্রীর জন্য বিশেষ রংয়ের হেলমেট এবং নাম্বার সংযোজন থাকবে।

অনলাইনভিত্তিক ট্যাক্সি সার্ভিসের জন্য একটি নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এটি যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত করা হবে। সোমবার তেজগাঁওয়ে বিআরটিএর কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় সেতুমন্ত্রী এ তথ্য জানান।