নিষিদ্ধ স্থানে পার্কিং ও উল্টো পথে গাড়ি চললে নোটিশ যাবে মালিকের ঠিকানায়

‘পার্কিং নিষেধ’ অথবা ‘ইউটার্ন নিষেধ’ লেখা অমান্য করে যেখানে সেখানে পার্কিং ও উল্টো পথে চলা ঠেকাতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। রং পার্কিং বা উল্টো পথে চললেই নোটিশ যাবে মালিকের ঠিকানায়। মালিককে একটা নির্দ্দিষ্ট তারিখে ট্রাফিক অফিসে ডেকে ভিডিওতে দেখানো হবে কিভাবে তার গাড়ি আইন না মেনে ‘রং পার্কিং’ অথবা ‘উল্টো পথে’ চলেছে। এরপর আইন অনুযায়ি জরিমনা করা হবে। ট্রাফিক বিভাগের নতুন সংযোজন এ পদ্ধতির নাম দেয়া হয়েছে ভিডিও কেস বা সচিত্র মামলা। এ বিষয়ে ডিএমপি ট্রাফিকের উত্তর জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) প্রবীর কুমার রায়, পিপিএম ইনকিলাবকে বলেন, অনেক সময় চালকরা নিষিদ্ধ স্থানে গাড়ি পার্কিং করে বা উল্টো পথে চলে। কিন্তু মালিক তা জানে না। আবার ব্যস্ত সময়ে ট্রাফিক পুলিশেরও সব কিছু দেখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এক্ষেত্রে আমরা সে সব স্থানের ভিডিও চিত্র ধারণ করে রাখার ব্যবস্থা করেছি। ভিডিওতে দেখে যেসব গাড়ি ট্রাফিক আইন অমান্য করবে সে সব গাড়ির মালিককে নোটিশ পাঠিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়। ডিসি (ট্রাফিক) প্রবীর কুমার রায় বলেন, ডকুমেন্টারি বলে এই পদ্ধতি খুবই কার্যকর। নতুন এ সেবা বেশ কাজে দিচ্ছে। এ সেবা চালুর পর থেকে ডিএমপির সবগুলো জোনে এখন গাড়িচালকদের মধ্যে এক ধরনের ভীতির সঞ্চার হয়েছে। আর এ ভীতির কারণেই চালকদের মধ্যে আইন ভঙ্গ করার প্রবণতা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।
রাজধানীতে যানজটের অন্যতম প্রধান কারন ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করা। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে ট্রাফিক আইন না মেনে উল্টো পথে গাড়ি চালানোর কারনে যানজট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এ নিয়মবহির্ভূত প্রবণতা রোধ করতে এর আগে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কেউ যাতে উল্টো পথে গাড়ি চালাতে না পারে, চালালেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার জন্য ‘প্রতিরোধ› নামের একটি আধুনিক যন্ত্র রাজধানীর রাস্তায় বসানো হয়েছিল। এ যন্ত্র উল্টো রাস্তায় চলাচলকারী গাড়িকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিরোধে সক্ষম ছিল। কেউ উল্টো পথে গাড়ি চালাতে গেলেই গাড়ির চাকা ছিদ্র হয়ে যেতো। রাজধানীর মন্ত্রী পাড়ার হেয়ার রোডের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধার পাশে যন্ত্রটির পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই পদ্ধতির খুব একটা সুফল মেলেনি।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে উল্টো পথে চলাচল, সিগনাল অমান্য ও যত্রতত্রভাবে পার্কিং করা থেকে চালকদের বিরত রাখতে ‘ভিডিও কেস’ পদ্ধতি চালু করেছে ট্রাফিক বিভাগ। এ সেবার আওতায় প্রতিটি ট্রাফিক জোনে একটি করে টিম রয়েছে। টিমে একজন অফিসার এবং তার সহযোগী হিসেবে রয়েছেন আরো ছয়জন ট্রাফিক সদস্য। রুটিন করে ভিডিও টিমগুলো একেক দিন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করে। এসব টিম উল্টো পথে চলাচল, সিগনাল অমান্য এবং যত্রতত্র পার্কিং করে রাখা গাড়ির ভিডিও চিত্র ধারণ করে। পরে ওই ভিডিও চিত্র থেকে গাড়ির নম্বর সংগ্রহ করে পাঠানো হয় বিআরটিএতে। সেখান থেকে গাড়ির মালিকের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করা হয়। পরে গাড়ির মালিকের বাসায় একটি নোটিস পাঠিয়ে তাকে এক সপ্তাহের মধ্যে ট্রাফিকের সংশ্লিষ্ট উপ-কমিশনারের (ডিসি) কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়। এ বিষয়ে ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, উন্নত দেশগুলোয় সড়কের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইন ভঙ্গ করা গাড়ির ভিডিও চিত্র ধারণ করা হয়। পরে ওইসব গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগও একই ফর্মুলাতে কাজ করছে। কিন্তু কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে প্রাথমিকভাবে ম্যানুয়ালি ভিডিও চিত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরবর্তীতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে স্বয়ংক্রিয় ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।
ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নতুন এ সেবার কারণে সড়কে চালকদের আইন ভঙ্গ করার প্রবণতা অনেকটা কমে এসেছে। পরীক্ষামূলকভাবে গত বছরের প্রথম দিকে ট্রাফিকের পশ্চিম ও উত্তর জোনে এ সেবা চালু করা হয়। ওই বছর ৬ হাজার ৭৪৯টি গাড়ির মালিককে জরিমানা করা হয়। চলতি বছরের শুরুতেই ট্রাফিকের দক্ষিণ ও পূর্ব জোনে এ সেবা চালুর মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে ভিডিও কেস কার্যক্রম শুরু করেছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। ট্রাফিক বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে মামলার সংখ্যা, জরিমানার পরিমাণ ও রেকারিংয়ের সংখ্যা বেড়েছে। ট্রাফিক বিভাগ ২০১৬ সালে ১ লাখ ৭০ হাজার ৮২৩টি গাড়ি রেকারিং করে। একই সময়ে ১০ লাখ ৫১ হাজার ৩৯৫টি গাড়ি মালিকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে জরিমানা আদায় করেছে ৩৭ কোটি ১০ লাখ ২০ হাজার ২২৬ টাকা। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা ছিল অর্ধেকেরও কম। ওই বছর ৫ লাখ ৬ হাজার ৬৬৩টি গাড়ি মালিকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে ১৮ কোটি ২৮ লাখ ৯৫ হাজার ৯৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।