টেকসই উন্নয়নে প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়াতে হবে

নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও জ্ঞান বিনিময়ের মধ্য দিয়ে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ‘সায়েন্স ডিপ্লোম্যাসি’ বা বিজ্ঞানভিত্তিক কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি কমিশনের (আইএইএ) অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে চায়। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে বৃহত্তর সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করতেও আগ্রহী। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সহায়তায়

আইএইএর প্রয়াস জোরদারে গুরুত্ব আরোপ করে তিনি আরও বলেন, এসডিজি অর্জনে সক্ষমতা গড়ে তোলা ও প্রযুক্তি স্থানান্তর খুবই

প্রয়োজন।

অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকালে ‘আইএইএ কারিগরি সহযোগিতা কর্মসূচির ৬০ বছর পেরিয়ে :উন্নয়নে অবদান’ শীর্ষক সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। আইএইএ প্রতিষ্ঠার ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দু’দিনের এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পরে শেখ হাসিনা অস্ট্রিয়ার ফেডারেল চ্যান্সেলর ক্রিস্টিয়ান কের্নের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। এতে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারে আলোচনা হয়। সফরের শেষ কর্মসূচিতে অস্ট্রিয়ার ফেডারেল প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ফন ডের ব্যালেনের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। খবর বাসস, ইউএনবি, বিডিনিউজ ও বাংলানিউজের।

স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে আইএইএর সদস্যপদ পায় বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত পরমাণু বিজ্ঞানী এম এ ওয়াজেদ মিয়া সে সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যের শুরুতেই আণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিতে নিরলস কাজ করে যাওয়ায় আইএইএর মহাপরিচালক ইউকিয়া আমানোর নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশকে ৪৫ বছর বিভিন্নভাবে সহযোগিতা দিয়ে আসায় আইএইএকেও ধন্যবাদ জানান। বাংলাদেশের ৭ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন আমাদের এ অর্জনে মুখ্য ভূমিকা রাখছে। আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন মডেল হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃত। শেখ হাসিনা পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথাও বলেন। পারমাণবিক বিদ্যুৎ বাংলাদেশের উন্নয়নের দ্বার খুলে দেবে এবং উন্নয়ন সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করবে_ এমন আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ১৬ কোটি মানুষের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নিউক্লিয়ার এনার্জি সোর্স ব্যবহার করবে।

আইএইএর কারিগরি কর্মসূচিতে পর্যাপ্ত সহযোগিতা নিশ্চিত করতে উন্নত দেশগুলোর প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আইএইএর সক্ষমতা বাড়ানো উচিত। পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও এর বিস্তার রোধে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে বাংলাদেশ আইএইএ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে এবং পাশে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ অর্জনে আমাদের লক্ষ্য বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের পুরোপুরি ব্যবহার করা। জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতিমালা এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যা চিহ্নিত করা এবং তা সমাধানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগের বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিছু নাগরিক সেবার ডিজিটাইজেশন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গ্রামীণ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ইতিবাচক ফল দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

আইএইএ কারিগরি সহযোগিতা কর্মসূচির অধীনে বাংলাদেশ নিউক্লিয়ার শিক্ষা, গবেষণা, খাদ্য নিরাপত্তা, মানব স্বাস্থ্য উন্নয়ন, শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োগ, ফসল ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়নে, পোকামাকড় দমনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা পেয়ে আসার কথাও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ এরই মধ্যে ১৩টি ফসলে ৯২টি বৈচিত্র্য এনেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পন্ন। এমনকি অতিরিক্ত খাদ্যশস্য রফতানিও করা হচ্ছে। দেশে চিকিৎসাসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিউক্লিয়ার সায়েন্সের সুফল তুলে ধরেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। তিনি বাংলাদেশে পরমাণু বিজ্ঞানের বিকাশে বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী এম এ ওয়াজেদ মিয়ার কথাও স্মরণ করেন।

সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আইএইএর মহাপরিচালক ইউকিয়া আমানো, মরিশাসের প্রেসিডেন্ট আমেনাহ গারিব-ফাকিম ও উরুগুয়ের প্রেসিডেন্ট তাবেরে ভাজকুয়েজ বক্তব্য রাখেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে ইউকিয়া আমানোর সঙ্গে শেখ হাসিনার বৈঠকও হয়।

সহযোগিতা জোরদারের ক্ষেত্র চিহ্নিত :বাংলাদেশের পুরনো বন্ধু অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারে দুই দেশ যৌথভাবে নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে বলে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আজ আমরা দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারে কৃষি, প্রাণিসম্পদ, সংযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ খাত চিহ্নিত করেছি। সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের মতো বৈশ্বিক বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। শেখ হাসিনা গতকাল দুপুরের পর ফেডারেল চ্যান্সেলারিতে পেঁৗছলে ক্রিস্টিয়ান কের্ন তাকে স্বাগত জানান। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে তার সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠক শেষে নিয়মিত কূটনৈতিক আলোচনার আয়োজন করতে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়।

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার হয়েছে জানিয়ে উদাহরণ হিসেবে ২০১৪ সালে ভিয়েনায় আবাসিক মিশন খোলার কথাও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি_ আমার এ সফরে সম্পর্ক জোরদারে নতুন মাত্রা যোগ হবে। বিশ্বজুড়ে চলমান অভিবাসন ও শরণার্থী সমস্যার বিষয়ে তিনি বলেন, সামরিকভাবে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে না; আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে পথ খুঁজতে হবে। এ ক্ষেত্রে অস্ট্রিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে অস্ট্রিয়ার ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ করতে চ্যান্সেলর কের্নের প্রতি তিনি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তাকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান, মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, এসডিজি বাস্তবায়নের মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক ও অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. আবু জাফর এ বৈঠকে অংশ নেন।

প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধান হিসেবে অস্ট্রিয়া সফরে গেছেন শেখ হাসিনা। গতকাল সন্ধ্যায় ভিয়েনা থেকে রওনা হয়ে আজ বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর দেশে পেঁৗছানোর কথা।