কৈ চাষে স্বপ্ন দেখেন হামিদা বেগম

হামিদা বেগমের গল্পটা ভিন্ন। জন্মবর্ধিষ্ণু পরিবার। আর বিয়ে হয় গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর ইউনিয়নের দাওপাড়া গ্রামে অবস্থাসম্পন্ন তালুকদার বাড়িতে। উচ্চ মাধ্যমিকে এক বিষয়ে কম্পার্টমেন্টাল পাওয়া স্বামীর পরিবারের অনাগ্রহে আর এগোয়নি পড়ালেখা। তাই বলে থেমে থাকেননি তিনি। পরিবার অথবা সমাজের জন্য কিছু একটা করার চিন্তা-ভাবনা সব সময়ই তাকে তাড়িয়ে বেড়াত। এ ভাবনা থেকে এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে পিছিয়ে পড়া নারীদের উন্নয়নে একাধিক কার্যক্রমে অংশ নেন; কিন্তু ২০০৭ সালে তার স্বামী বাবুল হোসেন তালুকদার লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে যেন আকাশ ভেঙে পড়ে মাথার ওপর। স্বামীর শোক কাটিয়ে নেমে পড়েন মাছ চাষে। ওয়ার্ল্ড ফিশ নামে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কৈ মাছের চাষ করে ঋণ পরিশোধ করেন। এ অক্লান্ত পরিশ্রমের স্বীকৃতিও মেলে তার। কৈ চাষে ২০১৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার রৌপ্য পদক পান তিনি। ওই বছর গৌরনদী উপজেলায় জয়িতা পুরস্কারও পান।

কৈ চাষে এ সাফল্য প্রসঙ্গে হামিদা বেগম বলেন, পারিবারিকভাবেই আমার শ্বশুরের সাড়ে তিন একরের পাঁচটি পুকুর রয়েছে। আমার স্বামী পুকুরে রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প আর তেলাপিয়া মাছের চাষ করতেন। সনাতন পদ্ধতিতে চাষ করায় নিজেদের খাবারের পর প্রতি বছরে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করা যেত। পানের বরজ ও অন্য ফলনের আয়ে সংসার ভালো চলত বলে মাছের দিকে তেমন নজর ছিল না। এছাড়া আমার স্বামী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ছিলেন। এজন্য সংসারে বেশি সময় দিতে পারতেন না। সন্তান, সংসার আমাকেই সামলাতে হতো। স্বামী মারা যাওয়া পর তিন সন্তান নিয়ে যেন অথৈ পানিতে পড়লাম; কিন্তু নিজেকে সামলে নিলাম। টাকা না থাকলেও সম্পত্তি আছে। এটাকেই কাজে লাগাতে চাইলাম। কারণ স্বামীর চিকিৎসায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তারপরও তাকে বাঁচাতে পারিনি। সন্তানদের পড়ালেখা আর সংসার চালাতে গিয়ে ধারদেনা হয়েছে। এসবও পরিশোধ করতে হবে। তাই শ্বশুরের সম্পত্তি দিয়েই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। পুকুরে নিজেই মাছ চাষের উদ্যোগ নিই; কিন্তু লাভ তেমন হয় না। ২০১৩ সালে ওয়ার্ল্ড ফিশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রশিক্ষণ নিই কৈ মাছ চাষের ওপর। এখানে এআইএন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ গ্রহণকালে ভিয়েতনামী কৈ সম্পর্কে জানতে পারি। বিদেশ ফেরত দেবর হারুন তালুকদার মাছ চাষ বাবদ আমাকে ১০ লাখ আর ভাই সান্টু সিকদারের কাছ থেকে ধার নিই ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এক একর ৩০ শতকের পুকুরে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকার কৈ মাছের পোনা ছাড়ি। ওয়ার্ল্ড ফিশের কর্মকর্তারা ময়মনসিংহের হ্যাচারি থেকে পোনা সংগ্রহ করে দেন আমাকে। মাছে খাবারের জন্য কোয়ালিটি ফিশ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করি। কৈ মাছ চাষ বাবদ প্রথম বছর সব মিলিয়ে ১১ লাখ ৬৩ হাজার টাকা খরচ হয়; কিন্তু বিক্রি করি ২১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। প্রথমবার খাবারে একটু বাড়তি খরচ করে ফেললেও কৈ মাছের দাম পেয়েছিলাম কেজি প্রতি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। ২০১৫ সালে সমপরিমাণ কৈ পোনা চাষ করতে ব্যয় হয় ৯ লাখ ২১ হাজার টাকা। লাভ করি ১০ লাখ ৭১ হাজার টাকা। আর ২০১৬ সালে একই পরিমাণ কৈ মাছের পোনা চাষ করতে ৭ লাখ ২২ হাজার টাকা খরচ হয়। মাছের দাম কমে যাওয়ায় ৮ লাখ টাকার বেশি বিক্রি করি। পুকুরে সাড়ে ৩ লাখ টাকার মাছ রেখে দিই। বড় হলে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে বিক্রি করব।

জ্যেষ্ঠ মাসের শুরুতে কৈ মাছের পোনা পুকুরে ছাড়লে ঠিকমতো পরিচর্যা করলে ৫০ থেকে ৬০ দিন পর অর্থাৎ ভাদ্র মাসে বিক্রি করা যায়। ওয়ার্ল্ড ফিশ থেকে প্রশিক্ষণ নিলেও ২০১৫ সালে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাছ চাষের ওপর চার দিনের প্রশিক্ষণ নিই। মাছ চাষের পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড ফিশের লোকাল সার্ভিস প্রোভাইডার (এলএসপি) হওয়ায় এলাকার নারী-পুরুষকে মাছ চাষে প্রশিক্ষণ দিই।

হামিদা বেগমের বড় মেয়ে সোনিয়া আক্তার স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, ছেলে শাকিল তালুকদার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছে, আর ছোট ছেলে সৈকত তালুকদার পড়ছে ষষ্ঠ শ্রেণীতে। কৈ চাষেই আগামীর স্বপ্ন দেখেন হামিদা বেগম। ইচ্ছা আছে জনসেবার জন্য জনপ্রতিনিধি হওয়ার।