উন্নত বিশ্বে পাটের ব্যাগ রফতানির অপার সম্ভাবনা

পাট বাংলাদেশের সোনালি আঁশ এ কথা সর্বজনবিদিত। আমরা সেই ছোটবেলা থেকে এই কথাটি শুনে আসছি। এমনকি আমাদের পরীক্ষার সম্ভাব্য রচনা হিসেবে এই বিষয়টি সবসময়ই অন্তর্ভুক্ত থাকত। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অর্থকরী ফসল ছিল এই পাট। বাংলার কৃষকরা অনেক কষ্ট করে পাট উৎপাদন করত কিছু নগদ অর্থ হাতে পাবার আশায়। দরিদ্র কৃষক তার ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, মেয়ের বিয়ে, কাপড়চোপড় ক্রয়, চিকিৎসা ব্যয়সহ অনেক খরচই নির্বাহ করত তার উৎপাদিত পাট বিক্রি করা অর্থ দিয়ে। একইভাবে দেশও এই পাট বিদেশে রফতানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত। কিন্তু স্বাধীনতার বেশ কয়েক বছর পর বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর পাট সংক্রান্ত যথাযথ নীতি প্রণয়ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় পাট তার সেই সোনালি আঁশের গৌরব হারায়। এমনকি পরিস্থিতি এমন নাজুক অবস্থায় চলে যায় যে, এক সময়ের সোনালি আঁশ কৃষকের গলার ফাঁস হওয়ার উপক্রম হয়। বিদেশে রফতানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দেশীয় ব্যবহারও আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পায়। ফলে কৃষকরা আর তাদের উৎপাদিত পাটের ন্যায্য মূল্য তো পায়ই নাই, বরং অনেক ক্ষেত্রে পাট বিক্রি করাই কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এহেন প্রতিকূল পরিবেশেও দেশে পাট চাষ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। অনেক ত্যাগ স্বীকার করে হলেও আমাদের দরিদ্র কৃষক বাংলাদেশের এই প্রধান অর্থকরী ফসল উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। আর এই কারণেই আজ পাট তার হৃত গৌরব ফিরে পেয়েছে। পাটকে নিয়ে এখন নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। পাটের জীনতত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে এবং এর বহুমুখী ব্যবহারও নিশ্চিত হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। তাই তো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজে পাটের সেই সোনালি আঁশের গৌরব ফিরে পাবার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। পাটের নবজাগরণের পেছনে আমাদের দেশের কৃষি বিজ্ঞানীদের অবদান অনস্বীকার্য এবং তারাই এই কৃতিত্বের দাবিদার। তবে এর কিছুটা কৃতিত্ব আমাদের দরিদ্র কৃষকদেরও প্রাপ্য। কেননা, তারা অসময়ে অনেক ত্যাগ স্বীকার করে এই পাটের উৎপাদন ধরে রেখেছিলেন যা কৃষিবিদদের এই কাজটা অনেক সহজ করে দিয়েছে।

এই যে মাঝখানে পাটের খুবই খারাপ অবস্থা গেল তার জন্য পাটের বিকল্প হিসেবে পলিথিন বা সিনথেটিকের ব্যবহার যত না বেশি দায়ী, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী পাট সংক্রান্ত আমাদের ভ্রান্তনীতি। জীবন পরিবর্তনশীল এবং সেই সঙ্গে দ্রুত পরিবর্তন হয় ব্যবহৃত প্রযুক্তি এবং মানুষের চাহিদা। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পজাত পণ্যের উপযোগিতা সৃষ্টিতেও পরিবর্তন আনতে হয়। তা না হলে সময়ের আবর্তে অনেক ভাল শিল্পও হারিয়ে যায়। পাটের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। পলিথিন বা সিনথেটিক ব্যবহার শুরু“হওয়ার ফলে পাটজাত পণ্যের উৎপাদন এবং বাজারজাতের ক্ষেত্রে উৎকর্ষতা ও সামঞ্জস্য এনে পাটনীতি পরিবর্তন করে যুগোপযোগী করা হয়নি। উপরন্তু আদমজীসহ অনেক বড় বড় পাটকল বন্ধ করে দেয়া হয়। এমনকি তথাকথিত বেসরকারীকরণের মাধ্যমে জলের দামে অনেক পাটকল বিক্রি করে দেয়া হয়েছিল এবং যারা এগুলো ক্রয় করেছিলেন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পাটকলের পরিবর্তে এর স্থাপনা, বিশেষ করে মিলের বিস্তৃত জায়গা হাতিয়ে নেয়া। এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমান সরকার অত্যন্ত কৃষিবান্ধব। কৃষিকে প্রাধান্য দিয়ে অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং এখনও নিয়ে চলছে। ফলে কৃষি উৎপাদনে যেমন অভাবনীয় সফলতা এসেছে, তেমনি কৃষকরাও বেশ সচ্ছলতা পেয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় পাট ফিরে পায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার। এখন প্রয়োজন এই সফলতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো। পাটজাত পণ্যে বৈচিত্র্য এনে তা বিদেশে রফতানি করতে পারলে দেশ বিলিয়ন বিলিয়ন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে। পাটের সবচেয়ে বড় সুবিধা এই পণ্য প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত এবং খুবই পরিবেশবান্ধব। বিশ্বে বাংলাদেশ পাট উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকা একটি দেশ। তাই সঠিক উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা হাতে নিতে পারলে এই পাটই হবে দেশের সবচেয়ে বৃহৎ রফতানিকারক খাত।

পাট দিয়ে তৈরি অনেক বিচিত্র পণ্যের মধ্যে পাটের ব্যাগের বিপুল চাহিদা রয়েছে উন্নত দেশগুলোতে। বিশেষ করে আমেরিকা কানাডাতে পাট দিয়ে তৈরি ব্যাগের এক বিশাল বাজার আছে। যে কারণে এক সময় পাটের বাজার হারিয়ে গিয়েছিল, সেই একই কারণে এই পাট আজ হতে পারে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও দারুণ চাহিদার এক পণ্য। অর্থাৎ সস্তা পলিথিন ও সিনথেটিকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারা পাট প্রধান অর্থকরী ফসলের মর্যাদা ধরে রাখতে পারেনি। এখন উন্নত বিশ্ব হারে হারে বুঝতে পেরেছে যে, পরিবেশের জন্য এই পলিথিন ও সিনথেটিক কতটা ক্ষতিকর। এদিকে সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় এসব দেশের মানুষ এই ব্যাগ ব্যবহারে এতটাই অভ্যস্ত ও নির্ভরশীল হয়ে গেছে যে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটা কাজে ব্যাগের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। অবস্থা এমন যে ব্যাগের ব্যবহার বন্ধ করে দিলে গ্রোসারি থেকে শুরু করে খাবারের দোকানের বেচাকেনা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাবে। বলা যায়, মানুষের জীবনযাত্রাই থেমে যাবে। পরিবেশের ক্ষতি যাতে কম হয় সেই প্রচেষ্টা থেকে অনেক উন্নত ধরনের পলিথিন ও সিনথেটিক ব্যাগ আবিষ্কৃত হলেও এটা পরিবেশের ক্ষতিকর বস্তু হিসেবেই রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পলিথিনের ব্যবহার এই মুহূর্তে বন্ধ করা না হলে এটা পরিবেশের জন্য এক বিপর্যয় ডেকে আনবে। এই সতর্কবাণী বিবেচনায় নিয়েই টরন্টোসহ অনেক শহর এই পলিথিনের ব্যাগ নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু বিকল্প তেমন কোন শপিংব্যাগ না পাওয়ায় মানুষের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে এই পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। অথচ এই ক্ষতিকর পলিথিন ব্যাগের সুন্দর বিকল্প হতে পারে পাটের তৈরি ব্যাগ। মানুষ এখন খুবই পরিবেশ সচেতন এবং পরিবেশবান্ধব নিত্যদিনের ব্যবহার্য ব্যাগ পেলে তারা তা সাদরে গ্রহণ করবে। তাই পাটের তৈরি ব্যাগের বিশাল বাজার প্রস্তুত আছে। প্রয়োজন শুধু ভোক্তাদের চাহিদা মোতাবেক পণ্য তৈরি করে বাজারে সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া। এ রকম উন্নত মানের কিছু কিছু পাটের ব্যাগ এখানকার নামীদামী ব্র্যান্ডের দোকানগুলো বাংলাদেশ থেকে আমদানি করে ব্যবহার করছে। তবে এগুলো বেশ ব্যয়বহুল এবং অভিজাত শ্রেণীর গ্রাহকদের জন্য। তাই এর বাজার খুবই সীমিত। এখানে সাধারণ মানুষের যে বাজার রয়েছে সেখানে এই পাটের তৈরি ব্যাগের ব্যবহার শুরুই হয়নি। কেননা, এই বাজার ধরতে হলে পাটের ব্যাগের মূল্য একটি বড় বিবেচ্য বিষয়। এসব ব্যাগ যে খুব টেকসই এবং আকর্ষণীয় ডিজাইনের হতে হবে তেমন নয়। একবার ব্যবহার করে ফেলে দেয়া যাকে ডিসপোজিবল ব্যাগ বলা হয়ে থাকে অথবা বার কয়েক ব্যবহার করেই ফেলে দেয়া হবে এমন মানসম্পন্ন ব্যাগেরই সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে এই গণমানুষের বাজারে। কিন্তু এর মূল্য হতে হবে সর্বনিম্ন এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ। এটা অবশ্য শুধু যে পাটের ব্যাগের বেলায় প্রযোজ্য তাই নয়, বরং যে কোন দ্রব্যসামগ্রীর বেলায়ও এটা সমানভাবে প্রযোজ্য। বর্তমান যুগে মূল্যই হচ্ছে বিপণনের মোক্ষম উপায়। যে যত সস্তায় দ্রব্যসামগ্রী দিতে পারবে তাদের বিক্রির পরিমাণও সবচেয়ে বেশি হবে। এই যে ওয়ালমার্ট এবং কেমার্টের মতো দোকান এত রমরমা ব্যবসা করছে তার একমাত্র কারণ যে এসব স্টোর সবচেয়ে কম মূল্যে দ্রব্যসামগ্রী বিক্রি করে থাকে গুণগত মান যাই হোক না কেন। এমনকি চীন যে বিশ্বের বৃহৎ পণ্য রফতানিকারক দেশ তারও কারণ একটিই, তা হলো খুব কম দেশই চীনের থেকে সস্তায় পণ্য সরবরাহ করতে পারে। তাই যে সকল পলিথিন বা সিনথেটিক ব্যাগের বিকল্প হিসেবে এই পাটের ব্যাগ ব্যবহৃত হবে, তার মূল্যও সেসব ব্যাগের মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিযোগিতাপূর্ণ অবস্থায় নির্ধারণ করতে হবে। আর এটা তখনই সম্ভব হবে যখন পাটের ব্যাগের উৎপাদন ব্যয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যাবে। এজন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে খুবই নামমাত্র খরচে এই ধরনের ব্যাগ উৎপন্ন করতে হবে। মেশিন ইনটেনসিভ অত্যাধুনিক ফ্যাক্টরি স্থাপন করে বা বর্তমান পাটকলগুলোর কোন কোনটির বিএমআরই সম্পন্ন করে খুব সহজেই এই ধরনের স্বল্পমূল্যে পাটের ব্যাগ উৎপাদন করা যেতে পারে। বর্তমানে উচ্চ মাত্রার এমন সব অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয়েছে, যার মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ ব্যাগের উৎপাদন সম্পন্ন করা যায়। এ কাজের জন্য অবশ্য সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন আছে এবং বর্তমান সরকার তা প্রদান করতে প্রস্তুতও আছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন যে, পাটের সোনালি দিন ফিরে এসেছে এবং তিনি উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বানও জানিয়েছেন।

এসব উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে যদি স্বল্পমূল্যে পাটের তৈরি ব্যাগ রফতানির উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়, তাহলে উন্নত বিশ্বে বিশেষ করে আমেরিকা ও কানাডায় বিশাল এক বাজার সৃষ্টি হবে। এই বাজারটি এতই বৃহৎ যে এখানে পাটের ব্যাগ রফতানি শুরু করতে পারলে বাংলাদেশ তা সরবরাহ করে শেষ করতে পারবে না। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে একরকম একচেটিয়া রফতানি সুবিধা ভোগ করতে পারবে। তাই পাটের সোনালি দিন ফেরার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারলে উন্নত বিশ্বে পাটের তৈরি ব্যাগ রফতানির অপার সম্ভাবনা রয়েছে।