শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অনন্য অবদান

জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস আজ। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত অবস্থায় জীবন উত্সর্গকারী শান্তিরক্ষীদের স্মরণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হবে দিবসটি। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী বিশ্বের সব দেশের শান্তিরক্ষীদের অসামান্য অবদানকে এদিন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সর্বাধিক শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা, নিষ্ঠা ও সততার ফলেই এ অর্জন সম্ভব হয়েছে।

১৯৮৮ সাল থেকে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা জাতিসংঘের অধীনে বিভিন্ন দেশে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখে চলেছে। ১৯৮৮ সালে ইরাক-ইরান শান্তি মিশনে যোগদানের মধ্য দিয়ে এদেশের সেনাবাহিনীর ১৫ জন সদস্য জাতিসংঘের পতাকাতলে একত্রিত হয়। বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী শান্তি মিশনে যোগ দেয় ১৯৯৩ সালে। বাংলাদেশ পুলিশ ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ পরিবারের সদস্য হয় নামিবিয়া মিশনের মাধ্যমে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষীরা মিশন এলাকায় বিবাদমান দলকে নিরস্ত্রীকরণ, মাইন অপসারণ, সুষ্ঠু নির্বাচনে সহায়তা প্রদান, সড়ক ও জনপথ এবং স্থাপনা তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। সিয়েরালিয়ন, কঙ্গো, নামিবিয়া, কম্বোডিয়া, সোমালিয়া, উগান্ডা, লাইবেরিয়া, হাইতি, তাজিকিস্তান, কসোভো, জর্জিয়া, পূর্ব তিমুর প্রভৃতি স্থানে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ একটি উজ্জ্বল নাম।

বিশ্বের অস্থিতিশীল ও সংঘাতময় এলাকায় শান্তি স্থাপনে বাংলাদেশ আজ এক আস্থার প্রতীক। আর এই সুনাম অর্জন করেছেন বাংলাদেশের ১ লাখ ৪৯ হাজার ৫৮৫ জন শান্তিরক্ষী কর্মী। এদের মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর ১ লাখ ৩২ হাজার ৬১৮ জন এবং পুলিশের ১৬ হাজার ৯৬৭ জন সদস্য রয়েছেন।

৪০টি দেশের ৫৪টি শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ থেকে শান্তিরক্ষীরা অংশগ্রহণ করেছে। এদের মধ্যে জীবন উত্সর্গ করেছেন ১৩২ জন। এদের মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর ১১২ জন এবং পুলিশের ২০ জন সদস্য রয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন ২১১ জন। আহতদের মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর ২০১ জন এবং পুলিশের ১০ জন সদস্য রয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের ৬ হাজার ৯২৭ জন শান্তিরক্ষী জাতিসংঘ সদর দপ্তর ও ১২টি দেশে নিয়োজিত রয়েছেন।

জাতিসংঘ শান্তি মিশনে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা, বিশেষ করে নারী সদস্যরা অন্য দেশের সদস্যদের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন। বিভিন্ন প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা নিষ্ঠার সঙ্গে অনেক চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব পালন করছেন। শান্তি মিশনে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ১ হাজার ২৪২ নারী সদস্য অংশ নিয়েছেন। এদের মধ্যে সমস্ত্র বাহিনীর ২৯৬ জন এবং পুলিশের ৯৪৬ জন সদস্য রয়েছেন। এছাড়া বর্তমানে নিয়োজিত রয়েছেন ২০০ জন নারী সদস্য।

সিয়েরালিয়নে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশিদের বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সেদেশে আজ বাংলাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রাস্তাঘাটের নামকরণ করা হয়েছে বাংলাদেশের নামে। সিয়েরা লিয়নসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাস, সংঘাত ও দাঙ্গা দমন করে শান্তি স্থাপন তথা সে সব দেশ পুনর্গঠনে শান্তিরক্ষা মিশনের বাংলাদেশি সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

এদিকে দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। সকালে ‘পিসকীপার্স রান’ এর মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচি শুরু হবে এবং বিকেলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শহীদ শান্তিরক্ষীদের নিকট-আত্মীয় এবং আহত শান্তিরক্ষীদের জন্য সংবর্ধনা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ওপর বিশেষ উপস্থাপনার আয়োজন করা হয়েছে। ‘পিসকীপার্স রান’ অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শহীদ শান্তিরক্ষীদের নিকট-আত্মীয় এবং আহত শান্তিরক্ষীদের জন্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এক বাণীতে বলেন, বাংলাদেশ আজ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত। পেশাদারিত্বের পাশাপাশি অর্পিত দায়িত্বের প্রতি একনিষ্ঠতা বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের এই সাফল্য অর্জনে ভূমিকা রেখেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বাণীতে বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে সৈন্য প্রেরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমানে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ। শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশের সদস্যরা বিপদসঙ্কুল এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নিয়োজিত থাকেন। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের দৃষ্টান্তমূলক সেবা, কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ, নিঃস্তার্থ মনোভাব ও সাহসিকতা আজ বিশ্ব দরবারে প্রশংসিত।