সম্ভাবনাময় পর্যটন স্থান ‘বঙ্গবন্ধু দ্বীপ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপকূলীয় গবেষণা ইউনিটের গবেষকরা সুন্দরবনের কাছে দুবালার চর উপকূল থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ৭ দশমিক ৮৪ কিলোমিটার আয়তনের ‘বঙ্গবন্ধু’ দ্বীপকে নতুন রূপে আবিষ্কার করেছেন। তাদের চালানো গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭০ সালে প্রথম এই দ্বীপটি দৃশ্যমান হয়। এরপর কয়েকবার অদৃশ্য হয়ে যায় দ্বীপটি। ১৯৯২ সালের পর থেকে দীর্ঘদিন এর কোনো ক্রমবৃদ্ধি না হলেও ২০০৪ সালের পর থেকে দ্বীপটি দ্রুত বাড়তে থাকে এবং ২০১৩ সালের দিকে এসে বর্তমান অবয়ব লাভ করে।
গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের উপস্থিতিতে তার কার্যালয়সংলগ্ন পুরাতন সিনেট কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য উপস্থাপন করেন গবেষণা দলের প্রধান ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম।
অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম বলেন, দ্বীপটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। দ্বীপটির চারিদিকে গড়ে উঠেছে প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৫০০ মিটার প্রশস্ত বালুকাভূমি। যার পেছনেই রয়েছে নয়নাভিরাম ছোট ছোট বালুর ঢিবি। ১৪ মিটার গভীর থেকে মৃত্তিকা সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করে দেখা যায় সমুদ্র তলদেশ থেকে চারটি পর্যায়ে দ্বীপটি গঠিত হয়েছে এবং বর্তমানে তা পূর্ণতা লাভ করেছে। ডিসিপি জরিপের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে দ্বীপটির কোথাও কোনো চোরাবালি নেই। ভিজিবিলিটি বিশ্লেষণ করে দেখেছি দ্বীপটির চারদিকের পানি অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং পানির গুণগত মানও আদর্শিক পর্যায়ের।
তিনি বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ সবুজ শ্যামল বনাঞ্চল, প্রশস্ত বালুকাভূমি, স্বচ্ছ পানি, সাঁতারের জন্য উপযোগী স্থান সবই আছে বঙ্গবন্ধু দ্বীপে। সামনে দক্ষিণমুখী প্রশস্ত সাগর পর্যটকদের যেমন প্রশান্তি দেবে তেমনি স্বচ্ছ পানিতে সাঁতারের পরিবেশ তাদের আন্দোলিত করবে। পেছনের সবুজ বনাঞ্চল ইকো-পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু দ্বীপের আশপাশের আরো বেশ কয়েকটি পরিচিত পর্যটন কেন্দ্র কটকা ও দুবলার চর রয়েছে। তবে এই স্থানগুলোর তুলনায় বঙ্গবন্ধু দ্বীপে ট্যুরিজম বিকাশের সম্ভাবনা বহুগুণ বেশি। এছাড়া নিকটবর্তী পুতনির চরেও প্রশস্ত সমুদ্র সৈকত রয়েছে। ফলে এই সম্ভাবনাময় সৈকতসমূহকে একটি মাস্টার প্লানের আওতায় এনে এই অঞ্চলে ইকো-পর্যটন বিকাশের কার্যকর ভূমিকা নেয়া যেতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণালব্ধ ফলাফল বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ, উপকূলীয় অঞ্চলের সম্পদ ব্যবহার, সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনীতির সম্ভাবনা সৃষ্টি হলো। এটা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন বিভাগে অনেক মূল্যবান প্রযুক্তি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সেগুলো আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করতে পারলে আরো বড় বড় গবেষণা সম্পন্ন হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা প্রচারবিমুখ উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় তার আর্থিক সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, গবেষণাগারের অপ্রতুলতার মধ্য দিয়েও অত্যন্ত নীরবে নানা বিষয়ে বহুমাত্রিক মূল্যবান গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। তবে এখানকার গবেষকরা প্রচারবিমুখ হওয়ায় ও গণমাধ্যমের অনাগ্রহের কারণে সেগুলো ভালোভাবে প্রকাশ পাচ্ছে না।
অধ্যাপক শহীদুল ইসলামের নেতৃত্বে ২৮ সদস্যের একটি অনুসন্ধানী দল ১১ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা বঙ্গবন্ধু দ্বীপে সর্বপ্রথম বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করেন। সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা দলের সদস্যদের মধ্যে প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নিয়ামুল নাসের, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার এবং গবেষণার আর্থিক সহযোগী অ্যাম্বিয়ান্স বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিদ্যা বরণ সরকার (শিমুল) উপস্থিত ছিলেন।