অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য

দেশে সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও আগের চেয়ে বেড়েছে। সব মিলিয়ে রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রাণ ফিরে এসেছে
রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে সারা দেশের অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য এসেছে। ব্যবসায় বিনিয়োগেও চাঙাভাব। দীর্ঘ ১১ মাস অপেক্ষার পর এবার দোরগোড়ায় হাজির রমজান মাস। আর মাস শেষে মুসলিম ধর্মাম্বলীদের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদ। ব্যবসায়ীদের হিসেবে এ সময়টি হচ্ছে ব্যবসার সেরা মৌসুম। সারা বছর যেনতেনভাবে পার করলেও রোজা এবং ঈদকে কেন্দ্র করে তারা বড় অংকের বিনিয়োগ করেন। দোকানে পণ্যের মজুদ গড়ে তোলেন। খুচরা থেকে পাইকার সব পর্যায়েই থাকে আগাম প্রস্তুতি। ব্যবসায়ীদের আশা এবারও রোজা এবং ঈদের বাজারে তেজিভাব থাকবে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আগাম বিনিয়োগের বড় অংশই খরচ হবে ঈদ ও রোজানির্ভর পণ্য উৎপাদন এবং বেচাকেনায়। দ্রুত মুনাফা তুলে আনার লক্ষ্য নিয়েই ব্যবসায়ীরা স্বল্পমেয়াদি এ বিনিয়োগ করছেন। বিশেষ করে পোশাক, জুতা, স্যান্ডেল, চামড়াজাত পণ্য, ইলেকট্রুনিক পণ্য, কুটির শিল্প পণ্য উৎপাদক ও আমদানিকারক, পাইকার এবং খুচরা বিক্রেতাই বড় অংশ বিনিয়োগ করেছেন। এছাড়া নিত্য ও ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ীরা নিজ প্রতিষ্ঠানে নতুন করে বিনিয়োগ খাটিয়েছেন।

জানা গেছে, ইতিমধ্যেই রাজধানীর ইসলামপুর, নবাবপুর, চকবাজার, উর্দুরোড, সদরঘাট, গুলিস্তান ও বঙ্গবাজার এলাকার পাইকারি মার্কেটগুলো তাদের সাধ্যমতো বিনিয়োগ খাটিয়েছেন। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটের মার্কেটগুলোতে একইরকম প্রস্তুতি আছে। এছাড়া বিদেশি পণ্যের পাইকারি বাজার হিসেবে খ্যাত পলওয়েল মার্কেট, বিসাভী, গাজী ভবন, বসুন্ধারা শপিং মলের ব্যবসায়ীরাও বড় বিনিয়োগ নিয়ে নামছেন। এছাড়া দেশি-বিদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় অত্যাধুনিক মার্কেট হচ্ছে রাজধানীর বারিধারার যমুনা ফিউচার পার্ক। এখানে রয়েছে বিশ্বের নামকরা সব ব্র্যান্ডের পোশাক, জুতা, কসমেটিক্স, ইলেকট্রুনিক্স কিংবা খাদ্যপণ্যের মহাসমারোহ। এখানকার সব শো-রুমগুলোতেই রয়েছে বড় বিনিয়োগ। বছরজুড়েই এ মার্কেটে অভিজাত, আধুনিক ও রুচিশীল ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর থাকে। উচ্চবিত্তের এসব ক্রেতার ঈদকেন্দ্রিক চাহিদা পূরণে ব্র্যান্ডনির্ভর শো-রুমগুলোও বসে নেই। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সূত্রমতে, সারা দেশে প্রায় ২৫ লাখ দোকান রয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগরীতেই রয়েছে প্রায় ৫ লাখ। ঢাকার বড় ও বিলাসবহুল দোকানগুলোতে সাধারণত ২০ থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত পুঁজি খাটানো হয়। বড় বড় পাইকারি দোকানগুলোয়ও একই ধরনের বিনিয়োগ হচ্ছে। এছাড়া মাঝারি দোকানগুলোয় এটি ন্যূনতম ৪০ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা। আর ঢাকার বাইরের জেলা শহরের বড় দোকানগুলো ন্যূনতম ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত পুঁজি বিনিয়োগ করা হয়। মফস্বলের বিনিয়োগের এ হার সাধারণত ২ থেকে ১০ লাখ টাকায় ওঠানামা করে। যাদের সম্ভব হয় না, তারাও এ রমজানে ধার-দেনা করে হলেও লাখ টাকার বিনিয়োগ খাটান।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি রেজাউল ইসলাম মন্টু যুগান্তরকে বলেন, এবার দেশে কোনো সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। সার্বিক পরিবেশও ভালো। মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও আগের চেয়ে বেড়েছে। সব মিলে রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোয় একটা প্রাণ ফিরে এসেছে। দোকান সাজানো হচ্ছে। নতুন কর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির মহাসচিব মো. শাহ আলম খন্দকার বলেন, এ একটা মাসই (রমজান) হচ্ছে ব্যবসার জন্য টার্নিং পয়েন্ট। কোনো ব্যবসায়ীই এ সময়টি হেলায় নষ্ট করতে চান না। ফলে তাদের আগাম প্রস্তুতিরও ন্যূনতম ঘাটতি থাকে না। ব্যাংকের সঞ্চিত অর্থ, ঘরের জমানো টাকা ব্যয় করা ছাড়াও ঋণ করে, ধার করে কিংবা জমি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধকী রেখে যা-ই পাচ্ছেন, তার সবই ঈদকেন্দ্রিক বাণিজ্যে খাটাচ্ছেন।

সরেজমিন ঢাকার পাইকারি কয়েকটি মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি ক্রেতারা এসব মার্কেট থেকে ইতিমধ্যে এক দফা চালান নিয়ে গেছেন। দ্বিতীয় পর্যায়ের চালানের অপেক্ষায় তারা মার্কেটে আসছেন। এর বাইরে গুলশান, বনানী, উত্তরা, বারিধারার বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসগুলোতে ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ব্র্যান্ডের পণ্যগুলো আমদানি হয়েছে। এছাড়া নিন্ম আয়ের মানুষের বঙ্গবাজার এবং ফুটপাথেও ঈদের জন্য বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে। পুরান ঢাকার বংশাল, নাজিরা বাজার এলাকার শত শত জুতার কারখানাগুলোয় দিন-রাত কাজ চলছে ঈদ বাজারে জুতা সরবরাহের জন্য। ঈদকেন্দ্রিক প্রায় কোটি মানুষের তৈরি পোশাকের সরবরাহ করা হয় পুরান ঢাকার উর্দুরোড থেকে। যখন দেশের বিভিন্ন এলাকার মার্কেট ও বিপণিবিতানগুলোতে প্রস্তুতি শুরু হয়, তখন উর্দুরোডের পাইকারি ব্যবসায়ীদের প্রায় ৬০ শতাংশ বেচাবিক্রি রমজান শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়। এ মার্কেটের ব্যবসায়ী হাজী রমজান গাজী জানান, এখানে ২৫টির বেশি মার্কেটে রয়েছে প্রায় ৫০০ পাইকারি দোকান। ঈদ বাণিজ্যে এদের কারোরই বিনিয়োগে ঘাটতি থাকে না। এসব দোকানে গড়ে ২ কোটি টাকা করে বিনিয়োগ হয়েছে বলে দাবি তার।